পোষাচ্ছে না বলে বছরখানেক পর কার্তিকের মা কাজ ছেড়ে দেয়। এরপর শ্রীগোপাল পাড়ার বাইরে সন্ধ্যাবেলার পারুলের সঙ্গে দেখা করত, এইটুকু মাত্র সে জানে। এই প্রসঙ্গে নিয়ে শ্রীগোপালের সঙ্গে কথা বলাকে মর্যাদার পক্ষে যথেষ্ট নয় বলে সে মনে করত। তার সঙ্গে পারুলের মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হয়েছে। পাড়ার বস্তিবাসী ঝিয়ের মেয়ে, সুতরাং কথা বলার প্রশ্নই নেই। হয়তো সে পরিচিতের ফিকে হাসি হেসে থাকবে, তখন পারুলের বড়ো বড়ো চোখ মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখে সে মজাই হয়তো পেয়েছে। একদিন সে হনুমান পার্কের ফটকে যদুপতির কাছে ঘুগনি কেনার সময় একটি মেয়ের সঙ্গে পারুলকে শাড়ি পরে যেতে দেখেছিল। শালপাতার টুকরো দিয়ে খানিকটা ঘুগনি তুলে মুখে দিতে দিতে সে আড়চোখে দেখেছিল, পারুলকে আরও লম্বা, আরও রোগা লাগছে শাড়ি পরার জন্য। আর দেখেছিল পারুলের মুখ সোজা সামনের দিকে, কিন্তু চোখদুটো ডানদিকে ঘুরিয়ে নজর তার মুখে রেখে কথা বলতে বলতে পাশ দিয়ে চলে গেল। খানিকটা গিয়েই ওরা দুজন ফিরে এল যদুপতির কাছে। ‘এক আনা—এক আনা করে দু—জায়গায় ঘুগনি দাও তো।’ সে সেখান থেকে তখন সরে গেছিল।
এখন খালপাড় দিয়ে সেই পারুলই হাতে একটা প্লাস্টিকের জারিকেন নিয়ে চলেছে। অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে ওর চেহারাটা। তিন বছর আগে যখন সে এসেছিল, তখন দেখা সেই রোগা মেয়ের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না ওর শরীরে। তিল তিল করে কবে যে ও ভরাট হয়ে উঠল তা সে জানে না। তিন বছর আগে শ্রীগোপাল এসে যখন বলল, ‘রোঘো, বিয়ে করে ফেললুম মেয়েটাকে, একদিন গোকুলানন্দে আয় বউভাত খাওয়াব।’ তখন সে অবাক হয়ে বলেছিল, ‘কাকে, পারুলকে?’ ‘তবে না তো কাকে? বউদি, আপনি তো এখনও একবারও যাননি গোকুলানন্দে, এবার একদিন রঘুর সঙ্গে আসুন।’ বিবি হেসে ‘যাব’ বলেছিল। পরে বিবি জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘পারুল কে? মনে হল তুমি যেন চেনো।’ ‘চিনি বলতে মেয়েটার মা আমাদের ঠিকে ঝি ছিল, মায়ের সঙ্গে ও আসত, এই পর্যন্ত। শ্রীগোপাল তখন থেকেই প্রেম চালিয়েছে। সিড়িঙ্গে একটা মেয়ে, ড্যাবাড্যাবা চোখ, এইটুকু শুধু মনে আছে।’ কার্তিকের মা—র সঙ্গে নন্দকাকার সম্পর্কের কথাটা সে আর বলেনি।
গোকুলানন্দর বাড়িটা ষাট সত্তর বছরের, চুন—সুরকির গাঁথনিতে তৈরি। জমিজমার সঙ্গে বাড়িটাও তার ঠাকুরদা কিনেছিল গায়েনদের কাছ থেকে। পলেস্তরা খসে পড়েছে, জানলার কাঠের গরাদ ভাঙা, পাল্লার কাঠ ক্ষয়ে যাওয়ায় দরজা বন্ধ করলেও বৃষ্টির ছাট কি কনকনে বাতাস ঘরে ঢোকে। ঘরের মেঝের সান চটে যাওয়ায় ঝাঁট দিলেই ধুলোর মতো সুরকি উঠে আসে।
বছরে দু—তিনবারের বেশি কেউ না আসায়, বাড়িটাকে সংস্কার করার গরজ কেউ দেখায়নি। তার আগে দত্তবাড়ির কেউ এখানে রাত কাটায়নি। শ্রীগোপাল দু—তিনবার বলেছিল বাড়িটা সারাইয়ের জন্য। ‘হাজার দশেক ঢাললেই নতুন হয়ে যাবে।’ কিন্তু হচ্ছে—হবে করে সেও মাসের পর মাস পার করে দিয়েছে।
বিবি একবার বলেছিল, ‘বাড়িটা সারিয়ে নিলেই তো হয়।’ সে বলেছিল, ‘সারাতে গেলে তো রোজ আমাকে কলকাতা থেকে গিয়ে কাজ দেখতে হবে। শ্রীগোপালকে ভার দিলে ও বেটা তো অর্ধেক টাকা আগে নিজের পকেটে পুরবে। দেখ না, প্রত্যেকবারই একটা—না—একটা অজুহাত দিয়ে টাকা কম দিচ্ছে, হয় বর্ষা হয়নি বলে বীজতলার চারা নষ্ট হয়েছে; নয়তো কালবোশেখিতে ধানের মোহর ঝরে গেছে কী পোকা লেগে ধান নষ্ট হয়েছে। বাঁশ, নারকোল বেচে দিয়ে কত টাকা যে মেরেছে, তার হিসেব করা যাবে না। ওকে ছোটোবেলা থেকেই জানি তো!’
গ্রাম থেকে খানিকটা বাইরে একটা পুকুর, দুটো ফলের বাগান আর একটা বিঘে চারেকের সবজি খেত পেরিয়ে তাদের বাড়িটা। নিকটতম প্রতিবেশী কম করে চারশো মিটার দূরের শরৎ বসাক। টাকাওয়ালা লোক। পাটের ব্যবসায়ী, একটা ট্রাক আছে, তেজারত করে। একান্নবর্তী পরিবার ছেড়ে, জমি কিনে একতলা নতুন বাড়ি করে বছরখানেক হল বাস করছে। শরৎ বসাক ছাড়া গোকুলানন্দর আর কারুর সঙ্গে তার আলাপ নেই।
বাড়ির একতলায় একটি বড়ো ঘর আর সেপটিক ট্যাঙ্কের পায়খানা, তার উপরে দোতলায়ও একটি ছোটো ঘর আর সেই মাপেরই ছাদ। পায়খানাটা শ্রীগোপাল ব্যবহার করে। বাড়ির লাগোয়া একটা ইঁদারা। নীচের ঘরে ধানের বস্তা, খড়, সার, চাষের জন্য দরকারি সরঞ্জাম রাখা হয়। এরই পাশ দিয়ে দোতলায় ওঠার সরু দু—হাত চওড়া সিঁড়ি। সিঁড়ির মাথায় বাঁদিকে ঘর, ডানদিকে ছাদ। ঘরটা তালা দেওয়া থাকে, চাবি থাকে শ্রীগোপালের কাছে।
তার ঠাকুরদা দ্বারিক দত্ত বেলজিয়াম থেকে নানা ধরনের কাচ, ঝাড়বাতি আর আয়না আমদানি করে পূর্ব ভারতে একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করে বিশ শতকের প্রথম দিকে। গোকুলানন্দে চাষের জমি, ফলের বাগান, পুকুর সব মিলিয়ে নব্বই বিঘের সম্পত্তি আর বাড়িটা তার আমলেই হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তার কাচ আমদানির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধ থামার পর হাঁপানির রোগী আটাত্তর বছরের বৃদ্ধের পক্ষে আবার নতুন করে ব্যবসা পাতার মানসিক ও দৈহিক সার্মথ্য আর ছিল না।
দ্বারিকের একমাত্র ছেলে অমিয় বাবার বিষয়সম্পত্তি ও ব্যাঙ্কের পাসবই দেখে স্থির করে, যে বিশ্রামটা বাবার নেওয়া উচিত ছিল, সেটাই সে নেবে বাবার তরফে। চারটে ওষুধ কোম্পানির হোলসেল ডিলার হয়ে অমিয় বাগরি মার্কেটে ঘর নিয়ে বড়োছেলে গোপেন্দ্রনারায়ণকে বসিয়ে দিল ব্যবসায়। আর নিজে ব্যস্ত রইল তার ক্লাব মোহনবাগানকে নিয়ে। ধবধবে ধুতি—পাঞ্জাবিতে শোভিত হয়ে, হুডখোলা অস্টিনে চড়ে অমিয় নিয়মিত বিকেলে ময়দানে যেত, ক্লাব লনের বেঞ্চে বসে বনেদি লোকেদের সঙ্গে গল্প করত। হাজার হাজার টাকা চাওয়া মাত্র ক্লাবকে দিয়েছে এবং কখনো ফেরত চায়নি, কার্যনির্বাহী সমিতিতেও সদস্য হয়েছে।
