চামড়াটা সাপের বলেই বিবি আপত্তি করেছিল। ‘এটাকে দেখেই তো গা শিরশির করছে, বরং অন্য একটা, ওই সাদাটা নাও।’ আঙুল দিয়ে বিবি একটা ব্যাগ দেখিয়েছিল। ‘আরে বাবা, এটা সাড়ে চারশো টাকার ব্যাগ, কোনটে তা হলে নেওয়া উচিত?’ বিবি বলেছিল, ‘শুধু দাম দিয়েই কি জিনিসের ভালোমন্দ বিচার হয়! রুচি বলেও তো একটা ব্যাপার আছে।’ বলার সময় ওর চোখের কোণ কুঁচকে গেছল। সে বুঝতে পেরেছিল বিবি কী বলতে চেয়েছে। সে তখন বলেছিল, ‘চেহারা দিয়ে বিচার করলে আমিও তো ওই সাদা ব্যাগ, কম দামি কিন্তু বগলে নিয়ে ঘোরা যায়।’ বিবির মুখ রাগে থমথম করে ওঠায় তার হাসি পেয়েছিল। সে দুটো ব্যাগই কিনেছিল।
ব্যাগের টেপা বোতামটা খোলার সময় ‘কট’ শব্দ হল। ভিতরে কয়েকটা পুরনো কাগজের টুকরো, খবরের কাগজ থেকে কাঁচি দিয়ে কাটা। একটা টুকরো তুলে তাকিয়ে সে যেন সাপের ছোবল খেল। এক কলাম তিন লাইন হেডিংয়ে: বাল্যবন্ধুকে খুন, বন্ধুর স্ত্রীকে ধর্ষণ। শব্দগুলো বুলেটের মতো তার মাথায় আঘাত করল। তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল গুঁড়িয়ে যাওয়া খুলিটার টুকরোগুলো জড়ো করতে।
‘নিজস্ব সংবাদদাতা : খালেদনগর, ১৫ জুন—গত শনিবার রাতে খালেদনগর থানার গোকুলানন্দ গ্রামে বাল্যবন্ধু শ্রীগোপাল বিশ্বাসকে দা দিয়ে কুপিয়ে খুন করে তার স্ত্রী পারুলবালাকে ধর্ষণ করার দায়ে পুলিশ রাঘবেন্দ্রনারায়ণ দত্তকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামীর জামিনের আবেদন অগ্রাহ্য করে মহকুমা আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট তাকে ১৪ দিন পুলিশ হাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। পারুলবালাকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
তার নামের নীচে কালির দাগ, নিশ্চয় বিবির করা। খবরের কাগজ থেকে কেটে রেখেছে বিবিই, সে না হলে এ কাজ এ বাড়িতে কে করবে! কেন কেটে রেখেছিল, ছেলেমেয়েদের দেখাবে বলে? কিন্তু ওরা তো একদিন জানবেই, জেনে গেছেও। কিন্তু সবটা জানে কী?
খবরের দ্বিতীয় প্যারায় সে চোখ রাখল—’রসপুর মৌজার অন্তর্গত কলকাতাবাসী সম্পন্ন রায়ত রাঘবেন্দ্রর জমিজমা ও সম্পত্তির দেখাশোনার কাজ করতেন শ্রীগোপাল। তিনি স্থানীয় কৃষক আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এক সময় রাঘবেন্দ্রর বহু বিঘা জমি আন্দোলনকারী কৃষকরা দখল করে নেবার চেষ্টা করেছিল। তাঁর সন্দেহ হয়, আন্দোলনকারীদের পিছনে শ্রীগোপালের মদত আছে। শনিবার সন্ধ্যায় এই নিয়ে তার সঙ্গে শ্রীগোপালের কথা কাটাকাটি ও বচসা হয়। এরপরই রাঘবেন্দ্র দা নিয়ে শ্রীগোপালকে আঘাত করে। পারুলবালা স্বামীকে রক্ষার জন্য ছুটে এলে রাঘবেন্দ্র তাকে ঘরের মধ্যে টেনে এনে ধর্ষণ করে। গোকুলানন্দ গ্রামে সেদিন রাত্রে যাত্রাপালা হবে বলে আসরের তোড়জোড় চলছিল। পারুলবালার চিৎকার শুনে যাত্রার উদ্যোক্তা গ্রামের লোকরা ছুটে এসে রাঘবেন্দ্রনারায়ণকে ধরে ফেলে, তখন তিনি মদের নেশায় আচ্ছন্ন ছিলেন।’
হ্যাঁ, তখন তার নেশা হয়েছিল, কিন্তু আচ্ছন্ন সে ছিল না। সেদিন শনিবার সকাল দশটায় সে গোকুলানন্দে পৌঁছেছিল। রথতলার মোড়ে বাসরাস্তার দু—ধারে বাজার তখন জমজমাট। আনাজ বিক্রির একটা মাঝারি পাইকারি হাট প্রতি শনিবার এখানে বসে। স্তূপাকার কুমড়ো, ঝুড়িভরা বেগুন, পটল, কাঁচালংকা, ঢ্যাঁড়স তার সঙ্গে রবারের জুতো, চুটি, তেলেভাজা, রেডিমেড পোশাক, লুঙ্গির পশরা আর ক্রেতাদের ভিড় রাস্তাটাকে সরু করে দিয়েছে। এরই মধ্যে দিয়ে মোটরবাইক চালিয়ে যাওয়ার সময় সামনে থেকে একটা ট্রাক এসে পড়ে। সে বাইকটা দ্রুত সরাতে গিয়ে কাঁধে একটা গোরুর গাড়ির জোয়ালের খোঁচা খায়। জায়গাটা চিনচিন করে ওঠে।
রথতলা থেকে আধমাইল এগিয়ে বাঁ দিকে নেমে গেলে গোকুলানন্দে যাবার মাটির রাস্তা। হাঁটাপথে দশ মিনিট। রাস্তাটা খালপাড় ধরে গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে ভাতারিয়া, রাইহাটা হয়ে সখিবাড়ি। খালপাড় দিয়ে যাবার সময় বরাবরই সে বাইকটা মন্থর করে। সাত—আটটা টালির চালের দরমার ঘরে বেশ্যারা থাকে। শনিবার হাটের দিনেই এদের বড়ো রোজগার। সস্তার রঙিন সিল্কের শাড়ি, ছোটোখাটো চেহারা হলে ফ্রক পড়ে, মুখে রঙ মেখে এরা সকাল দশটা থেকেই নিজেদের বিজ্ঞাপন শুরু করে। খদ্দের আসবে দুপুর থেকে। এদের দেখতে তার মজাই লাগে। মোটরবাইকে চড়া লোক মানেই পয়সাওয়ালা, যদি খদ্দের হয়। এই আশায় ওরা যেভাবে চোখ বড়ো করে তাকায়, সেটা দেখার জন্যই সে মন্থর হয়। এরা বিবির নখের যুগ্যি নয় বটে। কিন্তু এরা তার বাসনার জানালাগুলো খুলে দেয়, যেটা তার বউ পারে না।
সেদিনও সে মন্থর হয়ে তাকিয়েছিল। একজনকে দেখে তার কেন যেন মনে হল, অনেকটা শ্রীগোপালের বউয়ের মতো!
খামারবাড়িতে পৌঁছবার আগেই পিছন থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে পারুলকে দেখতে পায়, রাস্তা দিয়ে জারিকেন হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পারুলের বয়স যখন তেরো—চোদ্দো সেই সময়ই ওকে সে প্রথম দেখেছে। তাদের বাসনমাজা ঠিকে ঝি কার্তিকের মা—র ছোটোমেয়ে, থাকত কচুবাগান বস্তিতে। বহু পরে বউদির কাছে সে শুনেছে নন্দকাকা নাকি ওর ঘরে প্রায়ই যেত। শ্রীগোপাল তা জানত নিশ্চয়। ঘরে বসেই নির্ভুল খবর সংগ্রহে বউদির দক্ষতার কথা বাড়ির সবাই জানে। পারুল মা—র সঙ্গে আসত কাজে সাহায্য করার জন্য। মাঝেমধ্যে তখন তার চোখে পড়েছে হাইজাম্পারদের মতো লম্বা দুটো পা, শীর্ণ দেহ, দুটো বিনুনি, মাজা গায়ের রঙ আর বড়ো চোখ। তাকে দেখলেই চোখ নামিয়ে নিত। তখন সে ক্লাস টেন—এ পড়ত, মিতার সঙ্গে প্রণয় চলছে। একতলার ঘরে শ্রীগোপাল থাকত দুলালের সঙ্গে। ঘরের সামনেই উঠোন, যেখানে বসে কার্তিকের মা বাসন মাজত মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। শ্রীগোপালের বয়স তখন উনিশ, তার প্রথমবার মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে। ঘরে বসে দুপুরে লেখাপড়া চর্চা করে। সেই সময়ই একদিন দোতলার জানালা থেকে তার চোখে পড়েছিল ঘর থেকে শ্রীগোপাল চোখের ইশারায় কার্তিকের বোনের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদান চালাচ্ছে। সেই দিনই সে শ্রীগোপালকে বলেছিল, ‘কদ্দূর এগোলি’? ‘দারুণ মেয়ে মাইরি।’ ‘নাম কী রে?’ ‘পারুল’। ‘দেখিস ধরা পড়ে যাসনি।’ সামনের লম্বা দাঁত দুটো বার করে শ্রীগোপাল হেসেছিল, ‘ধরা অতই সোজা যেন!’
