‘কেন? মা কিন্তু কারুর সঙ্গে দেখা করাটা পছন্দ করবে না।’
সে স্থির চোখে গুলুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মার পছন্দ—অপছন্দ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এই ধারণা মেয়েটার হল কী করে! স্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী স্বামী চলবে, সেটা এ বাড়ির ধারা নয়।
‘তুই মাকে ভয় পাস?’
‘ভয় পাব কেন!’
‘মা অপছন্দ করবে, এটা জানলি কী করে?’
গুলুর মুখ ম্লান হয়ে গেল। চোখ নামিয়ে ইতস্তত করে শুকনো হাসল। ‘আমি জানি। অ্যালবাম থেকে তোমার সব ছবি খুলে নিয়ে টুকরো টুকরো করে পুড়িয়ে দিয়েছে আমাদের সামনে। পরশুদিন বলল, তোমাদের বাবা আসছে, কেউ কিন্তু যেচে একটি কথাও বলবে না, বাইরের কাউকেও কথা বলতে দেবে না।’
‘আর কিছু বলেছে?’
‘আর কী বলবে।’ গুলু এমনভাবে তাকাল যেন এরপরও আর কিছু বলার থাকে কি?
বাইরের আলো আরও কমে এসেছে। ঘরের আলো জ্বলতে যাচ্ছিল গুলু, সে বারণ করল। ‘থাক, আলোটা চোখে লাগে।…হ্যাঁ রে, গোরা লেখাপড়া করে?’
‘এবার হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছে।’
‘বোধ হয় পাশ করবে না।’
গুল চুপ করে রইল।
‘তোর মা ওকে খুব ভালোবাসে।’
গুলু অস্ফুটে কী যেন বলল।
‘গোরার বন্ধুবান্ধব কারা, জানিস? কেমন ধরনের তারা?’
‘ওর নানা রকমের বন্ধু, তবে অ্যাকাডেমিক দিক থেকে কেউ তেমন ভালো নয়। বাড়িতে যারা আসে তাদের কথাবার্তা ব্যবহার তো ভালোই। খুব হইচই করে, ক্যাসেটে পপ গান শোনে…বাইরে কে কেমন তা জানি না।’
‘তোর মা গোরাকে পড়তে বসায় না, শাসন—টাসন করে না?’
‘ও মাকে খুব একটা গ্রাহ্য করে না। ছোটো থেকেই কেমন যেন একগুঁয়ে, জেদি, রাফ। মা বলে তোমার জন্যই নাকি গোরা এমন হয়ে গেছে।’
‘আমার জন্য!’ সে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। ‘কেন, কীভাবে? আমি কী করলাম!’
‘জানি না। …মা আমাদের বলত, ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে একজনকে মেরে ফেলেছিলে, তাই জেলে গেছ। একদিন গোরা মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, রেপ মানে কী? তখন ও ক্লাস ফোর—এ পড়ে। বিকেলে হনুমান পার্কে খেলতে গিয়ে কী নিয়ে যেন ঝগড়া হয়, তখন কেউ ওকে বলে, তোর বাবাতো…।’
ঘরে এখন আঁধার। গুলু কথাটা সম্পূর্ণ করল না। বড়ো হয়েছে, বাবাকে লজ্জায় ফেলতে চাইল না, নিজেরও লজ্জা করবে। ওর মুখটা এখন কেমন দেখাচ্ছে, সেটা দেখার ইচ্ছে তার হল, কিন্তু আলো জ্বেলে নয়।
কোর্ট বলেছে, তোদের বাবা শুধু মার্ডারারই নয় রেপিস্টও। কিন্তু রেপ আমি করিনি। অনেকবার কোর্টে এই কথা বলেছি, আজও কথাটা তোকে বলছি। গুলু তুই বড়ো হয়েছিস, লেখাপড়া করছিস, তোর বিচারবুদ্ধি তৈরি হচ্ছে, পাঁচটা অশিক্ষিত লোকের মতো তোর বিবেচনা—বোধ নয়। গোকুলানন্দর দারোগা আর শ্রীগোপালের বউ সড় করে…।’ কথাগুলো সে বলল মনে মনে।
গুলু ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। ওর মুখটা আর দেখা হল না। গুলুও কি তাহলে বিশ্বাস করে, কোর্ট ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল!
চার
শুধু বাড়িটা নয়, সারা উত্তর কলকাতা, পশ্চিমবাংলা, ভারতবর্ষ এখন ঘুমের মধ্যে। পৃথিবীর নানান জায়গা এখন কর্মব্যস্ত, কোথাও বা স্টেডিয়ামে খেলা, ডিস্কো থেকে হই—হুল্লোড়, কোথাও বা শীর্ষ সম্মেলন কী গুলিগোলা চলছে। ছাব্বিশ নম্বর সূর্য গাঙ্গুলি স্ট্রিটের বাড়িটা এখন অন্ধকার, ঘুমন্ত। কিন্তু একটা ঘরে আলো জ্বলছে। সে জেগে রয়েছে, টেবিলে তার খাবার থালা দিয়ে ঢাকা।
সে তার ঘর থেকেই জেনেছে কখন অরুণা, কখন বিবি, কখন গোরা ফিরল। খাওয়ার টেবিলে বিবির সঙ্গে গুলুর কথাবার্তার টুকরো তার কানে এসেছে।
‘কেমন আছেন দেখলে?’
‘জ্বর নেমে এসেছে। ওর বউই দেখেছে। তবে বড়ো ধরনের কিছু নয়, একটা গাইনির পক্ষে যতটা সামাল দেওয়া…..কলকাতাটা যে কী হয়ে উঠেছে, হেন কুচ্ছিত রোগ নেই যে হচ্ছে না। আমরা ছোটোবেলায় শুনেছি ম্যালেরিয়া নাকি শুধু গ্রামেই হয়!’
গোরা ফিরল। দরজা খুলে দিল বিবি।
‘এত রাত হল যে!’
‘কত আর, এগারোটা।…খাবার রেখেছ নাকি? আমি সুজিতদের বাড়িতে খেয়ে এসেছি। রোজ সেই একঘেঁয়ে রান্না আর খাবার, ধ্যাৎ…..তুমি তো অনেক কিছু রাঁধতে জান, তাহলে পরীক্ষার চোতা অ্যানসার পেপারগুলো না দেখে রান্নাঘরে যাও না কেন?’
এরপর দড়াম করে মেজোঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
এই শব্দটাই তাকে বলে দিল গোরা যথেষ্টভাবে প্রকৃতিস্থ নেই। এখন তার বিবির মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছে। বলতে ইচ্ছে করছে, তোমারই হাতে মানুষ হয়েছে গোরা। তুমি ভালো করেই জানো, এখন ও কোথায় পৌঁছেছে। বাবা রেপ করে জেলে গেছে বলেই ওর মানসিক সর্বনাশ ঘটে গেছে, এই মিথ্যা ধারণাটা ছড়িয়ে কোনো লাভ নেই, ছেলেমেয়েরা তৈরি হয় মায়ের হাতে, বাবার হাতে নয়। আর এই ছেলে তুমিই তৈরি করেছ!
সে উত্তেজিতভাবে ঘরে পায়চারি করতে করতে একসময় থামল। এভাবে একা ঝগড়া চালিয়ে কোনো লাভ নেই। বরং মুখোমুখি সে বিবির সঙ্গে কথা বলবে। এখন ঘুম আসবে না। মাথাটা ঠান্ডা হোক আগে। পরদার কাপড়ে ঢাকা র্যাকটার সামনে দাঁড়িয়ে কাপড়টা সে তুলতেই দেখল, তার চোখের সামনে গাদা হয়ে রয়েছে বাল্যকালের গ্রামোফোন রেকর্ড, পাঁজি, বাড়ির ট্যাক্সের, ইলেকট্রিকের, সর্বজনীন দুর্গোপুজোর বিল, বাজারের হিসেবের খাতা, স্কুলের ছেঁড়া বই, গীতা। উপরের তাকে একটা ছাতার বাঁট দেখা যাচ্ছে, তার পাশে একটা সাপের চামড়ার হাতব্যাগ। ব্যাগটাকে সে চিনল, বিবিকে কিনে দিয়েছিল চর্মশিল্পের মেলায়। হাত তুলে ব্যাগটা টেনে নামাতেই ধুলো পড়ল তার মুখে। ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝেড়ে ব্যাগটা পরদার কাপড়ে মুছল।
