গোরাও কি কোনো ‘শ্রীগোপাল’ পেয়েছে? ওর সঙ্গে কী সে একবার কথা বলবে? কিন্তু কী কথা বলবে? ছেলেটাকে মনে হল না নম্র, বিনীত ধরনের। যদি মুখের উপর বলে ‘আপনি কে?’
বাইরে দালানের দরজা খোলার শব্দ হল। অরুণা এসেছে। দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে গেছিল। টেবিলে পড়ে থাকা এঁটো থালা—বাটি তুলে নেবার জন্য এলে বলতে হবে ‘এ বাড়িতে দরজায় তালা দিয়ে কেউ বেরোয় না, কাজের লোকেরা তো নয়ই।’ অরুণার জন্য সে অপেক্ষায় রইল।
‘বাবা, আপনি কি চা খাবেন?’
মাথার মধ্যে কথাগুলো তৎক্ষণাৎ বসল না। তবে সে মুখটা ফেরাল। দরজায় গুলু দাঁড়িয়ে। ধীরে ধীরে সে উঠে বসল। নিজের অজান্তেই সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো একটা হাত বাড়িয়ে দিল, ‘গুলু’!
গুলু পায়ে পায়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। ওর বাঁ হাতটা নিজের হাত তুলে মেয়ের মুখের দিকে সে নির্নিমেষে তাকিয়ে রইল। অপ্রতিভ গুলু মুখ নামিয়ে নিয়েছে। এখন তার হাতের মধ্যে একটা টলটলে দিঘি। তার সারা শরীরের কম্পনের আঘাতে ছোটো ছোটো তরঙ্গ উঠছে। তিরতির করে সেই তরঙ্গ তার করপুটে ভেঙে পড়ছে। ওর নরম আঙুলগুলো নিজের মুঠোয় চেপে থেকে সে নাকের পাশে সুড়সুড়ি অনুভব করল। চোখ দিয়ে জল নামছে তো নামুক। সেই চার বছরের গুলু, মাঝরাত্রে বিছানায় উঠে বসে কান্না জুড়ত। কেন কে জানে, বোধহয় কৃমির জন্য। কিছুতেই কান্না থামত না। বিরক্ত বিবি চড় কষালে আরও জোরে কেঁদে উঠত। তখন সে মেয়েকে নিয়ে দালানে পায়চারি করত। পিঠে চাপড় দিতে দিতে কত রকমের কথা বলত গুলুর কান্না থামাতে।
এখন ঝাপসা চোখে সে কুড়ি বছরের গুলুর মুখের দিকে তাকিয়ে ঘড়ঘড়ে স্বরে একটা শব্দ বার করল, ‘মা।’
এবার গুলু কি অনেক কথা বলবে না তার বাবার কান্না থামাতে!’
‘চা খাবেন?’
কী স্নিগ্ধ, মিষ্টি স্বর। বিবির গলার সঙ্গে কোনো মিল নেই। ওর ঠাকুমার এমন স্বর ছিল। ‘তুই এখন আমার সামনে বোস।’
গুলু খাটের উপর তার পাশে বসামাত্র সে ওর দু—কাঁধ ধরে বুকের উপর টেনে নিল: ‘আমার গুলু….আমার মেয়ে…আমার মেয়ে, তোর বাবাকে মাপ করে দে….আমি সবার সঙ্গে অন্যায় করেছি…গুলু আমি তোদের ক্ষতি করেছি…।’
‘আপনি অমন করছেন কেন, শান্ত হয়ে বসুন।’
‘আমাকে ‘আপনি’ বলছিস কেন, আমাদের বাড়িতে বাবাকে ‘তুমি’ বলে। তুই কি এই বাড়ির মেয়ে নোস?’
‘আমি চা করে আনি। অরুণাদি তার ভাইয়ের বাড়ি গেছে, সন্ধের মধ্যেই আসবে। আমি ডুপ্লিকেট চাবিটা নিয়ে বেরিয়েছিলাম।’
ঘর থেকে গুলু চলে যাওয়ার পরই সে বিছানায় ভেঙে পড়ল। বালিশটা মুখের উপর চেপে সে হিক্কা তোলার মতো শব্দ করল। মিনিট দুয়েকের মধ্যে শান্ত হয়ে সে উঠে বসল। পুবের জানলা দিয়ে কয়েকটা বাড়ি দেখা দেয়। বিকেল শেষের স্তিমিত আলো পুরোনো দেওয়ালগুলোয় সন্ধ্যার ছায়া ফুটিয়েছে। তারে ভিজে কাপড় নাচিয়ে নাচিয়ে ঝোলাচ্ছে একটি স্ত্রীলোক। সিঁড়ি দিয়ে একটি বালক দুড়মুড়িয়ে নেমে গেল। চড়াই পাখিদের কিচিরমিচির কৃষ্ণচূড়া গাছে। দূরে কোথাও পটকা ফাটার আওয়াজ হল।
চা আর চারখানা বিস্কিট নিয়ে এল গুলু।
‘মা কোথায় গেছে?’
‘বলতে পারব না। মনে হয় সল্টলেকে অপূর্ব মামার ফ্ল্যাটে গেছে। ওঁর ম্যালেরিয়া হয়েছে শুনেছি।’
‘কে অপূর্ব মামা?’
গুলু একটু অবাক হল যেন। ‘অপূর্ব মামাকে জান না! মা—র ছোটোবেলার বন্ধু, চন্দননগরে একই পাড়ায় বাড়ি ছিল, ওরা একই সঙ্গে যাদবপুরে পড়েছে, তবে মা—র থেকে দু—বছরের সিনিয়ার।’
‘না, আমি এর কথা বিবির কাছে কখনো শুনিনি। বেশি কথা তো বলত না। পড়াশুনোর কথা তো একদমই নয়।’
‘অপূর্বমামা ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলেন। ফুলব্রাইট ফেলোশিপে রচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন, সাত—আট বছর আমেরিকায় ছিলেন। এখন আছেন সায়ান্স কলেজে।’
গুলুর চোখেমুখে কেমন যেন উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠল কথাগুলো বলার সময়, কথার সুরে শ্রদ্ধা আর সমীহ। এই উজ্জ্বলতা বাবার কথা বলার সময় কখনোই ফুটবে না। তার ভিতরটা ধসে পড়ছে। ক্ষীণভাবে হঠাৎই তার মনে হল, এই অপূর্বর সঙ্গে বিবির কোন ধরনের একটা সম্পর্ক বোধ হয় আছে।
‘উনি এ বাড়িতে আসেন না?’
‘কেন আসবেন না? অপূর্ব মামার কাছে পড়েই তো মা এমএসসি পাশ করল, মাকে কলেজে ঢুকিয়ে দিলেন তো উনিই।’
‘অপূর্বমামা বিয়ে করেছেন?’
গুলু থতমত হল। প্রশ্নটা এই মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত।
‘হ্যাঁ।’
‘তাঁকে দেখেছিস? তোর মায়ের মতো সুন্দরী?’
‘মোটামুটি, তবে মায়ের মতো নয়। অপূর্বমামার বউ ডাক্তার, গায়নোকোলজিস্ট। ….একি, বিস্কুটগুলো পড়ে রইল কেন?’
‘বিস্কুট খেতে আমার ভালো লাগে না। তুই বরং খা।’
‘আমারও ভালো লাগে না।’
‘আচ্ছা গুলু, আমি এতকাল না থাকার জন্য তোর মনে কি কষ্ট হত? এখন তুই কি খুশি হয়েছিস?’
গুলুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ‘কষ্ট তো হতই। তোমার চেহারাটা আমি মনে করে রেখে দিয়েছিলাম। কী সুন্দর দেখতে ছিলে। চার বছর বয়সে দেখেছি, ভুলে যাবার কথা নয়। রণোর অবশ্য একদমই মনে নেই। একবার তুমি মোটরবাইকে সামনে বসিয়ে আমাকে পরেশনাথ মন্দির দেখাতে নিয়ে গেছিলে, তাও মনে আছে।’
‘সেদিন পেছনে একজন বসে ছিল, কে বল তো?’
‘মনে নেই।’
‘শিবু বর্ধন লেনে থাকে সন্তু, আমার স্কুলের বন্ধু। ও মানিকতলা যাবে বলে চড়েছিল। সনতের সঙ্গে একবার দেখা করব।’
