সে নির্জন দালানে স্তিমিত হয়ে বসে রইল। বর্তমান থেকে সরে যাওয়ার কোনো উপায় আর তার নেই। স্মৃতি, সে ভেবেছিল কমে গেছে। এই একটা জিনিস চেষ্টা করলেও তার হ্রাস—বৃদ্ধি ঘটানো যায় না। যত পিছিয়ে যাবে ততই খুঁটিনাটিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। মিতাকে তাদের অন্ধকার বাইরের ঘরে দেয়ালে চেপে ধরে সারা শরীর দিয়ে পিষে চুমু খাওয়ার সময় ওর মুখে পেঁয়াজের গন্ধ পায়। মিতাকে সে ঝালমুড়ি খেতে দেখেছিল হনুমান পার্কে। বহুদিন ঝালমুড়ি খাইনি, ঘুগনি খাইনি…টেলিফোন বেজে উঠল। দ্বিধা না করে সে রিসিভার তুলে নিল।
‘হ্যালো।’
‘কে বলছেন আপনি?’ নারীকণ্ঠ, একটু ভারী স্বর, বয়স্ক, মার্জিত উচ্চচারণ।
ফোন ধরেই কথার আগে নিজের পরিচয় দাখিল করতে হবে, এতে মনে হয় যেন তাকে দাবিয়ে দেওয়া হল। কর্কশ স্বরে সে বলল, ‘রাঘবেন্দ্র দত্ত। আপনার কাকে চাই?’
‘জাহ্নবীকে চাই, আছে কি?’
‘বেরিয়েছে। কিছু জানাবার থাকলে বলতে পারেন, আমি ওর স্বামী।’
‘স্বামী!’ মহিলা যেন ছ্যাঁকা খেলেন, ‘আপনি ওর স্বামী?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বিবাহিত বৈধ স্বামী!’
‘জাহ্নবী আবার কবে বিয়ে করল? ওকে তো ডিভোর্সি বলেই জানি, সেই কথাই তো আমাদের বলেছে।’
‘আপনি কে বলছেন?’
‘আমি ওর কলিগ, রমা ঘোষ।’
ফোন সে রেখে দিল। এই কথোপকথন নিশ্চয় বিবি জানবে। সে কোনো মিথ্যা কথা বলেনি। কিন্তু বিবি নিজেকে কেন ডিভোর্সি বলে বাইরে জাহির করল! এতে ওর কোনো সুবিধা হয়েছে কি? ‘আবার কবে বিয়ে করল?’ বিয়ে করার বয়স ওর এখনও রয়েছে, পুরুষদের উত্তেজিত করার মতো উপাদানভরা ওর শরীর। বিবি তাকে ডিভোর্স করতে পারত, হয়তো ছেলেমেয়ের কথা ভেবেই করেনি।
‘অমিয়ার মা, অমিয়ার মা, ওপরে এসো তো একবার।’
বউদির গলা বোধহয়, ঝিকে ডাকছে। সে উঠে জানালার পাশে গিয়ে একটা চোখ দিয়ে তাকাল। বউদি তাদের খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে সরে গেল।
মেজোঘরের দরজার সামনে সে দাঁড়াল। গোরা জন্মাবার পর, বিছানার জায়গা কমে যাওয়ায় সে এই ঘরে একা শুতো। ঘরটা এখন কীরকম রয়েছে, সেটা দেখার প্রবল ইচ্ছায় দরজার হুড়কোটা টেনে সে একটা পাল্লা খুলল। বারান্দার দিকের দরজা আর জানালাটা খোলা রয়েছে, ঘরে যথেষ্ট আলো। তার মনে হল, সে যেন অন্য একটা জগতের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘরের চারদিকে সে চোখ বোলাল।
দেয়ালে সাঁটা রঙিন পোস্টারে ফুটবলার, ক্রিকেটার, আর গিটার হাতে মাইকের সামনে যেসব বিদেশি মুখ, তাদের একজনকেও সে চেনে না। কয়েকটি পোস্টারে বুক, কোমর, পাছা দেখাবার জন্য উৎকট ভঙ্গিতে মেয়েরা। এইসব ছবি বিবি নিশ্চয়ই দেখেছে, তবুও রাখতে দিয়েছে! এই ঘরেই রয়েছে টিভি সেট। এটা বাইরের দালানে থাকা উচিত ছিল, সবাই তাহলে দেখতে পেত। বিছানার উপর টেপরেকর্ডার আর একটা ইংরেজি ম্যাগাজিন। তার মলাটে একজোড়া মেয়ে—পুরুষ, বোধহয় ফিল্মের। পুরনো কাঠের র্যাকটায় গোটা চল্লিশ অডিও ক্যাসেট আর কিছু বই। ওয়ার্ডরোবটা যেখানে ছিল সেখানেই রয়েছে। পাল্লাটা টানতেই খুলে গেল। হ্যাঙারে ঝুলছে ট্রাউজার্স আর নানা রঙের টি—শার্ট। তলার তাকে বাতিল পুরনো ট্রাউজার্স, জামা। তার নীচে ড্রয়ার। সেটা টেনে আধখানা বার করেই সে চমকে উঠল। একটা হুইস্কির পাঁইট, তার অর্ধেক খালি।
পিছন থেকে হঠাৎ কেউ যেন তার মাথায় ডান্ডা বসিয়ে দিল। থরথর করছে শরীরের ভিতরটা, চোখে কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্ধকার নেমে এল। বোতলটা কেঁপে উঠল তার হাতে। সেটা রেখে দিয়ে ড্রয়ারটা ঠেলে বন্ধ করে কিছুক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকল। অসাড় হয়ে গেছে তার স্নায়ু।
গোরা তাহলে গোল্লায় গেছে! কী করে এটা সম্ভব হল? বিবির মতো মানুষের হাতে লালিত হয়ে তার নিজেরই ছেলের এমন দশা হল কী করে? ও কি অন্ধ হয়ে গেছে? ও কি একবারও এই ঘরে আসেনি, উঁকি দিয়েও দেখেনি? তার মদ খাওয়ায় বিবির প্রবল আপত্তি ছিল আর আজ নিজের ছেলের ঘরেই মদের বোতল, দেয়ালে নোংরা ছবি। নিশ্চয়ই জানে। বিবি জেনেশুনে ছেলেকে নষ্ট হতে দিচ্ছে!’
ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে সে দুটো হাত আড়াআড়ি কপালের উপর রাখল। ঘুম থেকে উঠে যে তাজা ভাবটা বোধ করেছিল সেটা উবে গেছে। আবার তার ক্লান্তি লাগছে। তার একমাত্র বংশধর নষ্ট হয়ে গেছে এটা মেনে নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। গোরা কাদের সঙ্গে মেশে, কারা ওর বন্ধু, টাকা পায় কোত্থেকে? বিবি কি কোনো খবর রাখেনি? ষোলোটা বছর সে বাড়িতে থাকলে এটা ঘটতে পারত না। মাথার উপর বাবা আছে, এই অনুভূতিটাই তো ছেলেমেয়েদের রক্ষাকবচ। শ্রীগোপাল তাকে একঢোঁক মদ খাইয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার পরের সাত বছর সে একফোঁটাও জিভে ছোঁয়ায়নি। বাবা দালানে বসে রেডিয়ো শুনত, তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে গন্ধ পেতই। মাস্টারমশায়ের কাছে পড়তে হত দাদার সঙ্গে, সুতরাং মদ খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না!
গোকুলানন্দেই সে টাকা দিয়ে মদ আনিয়ে শ্রীগোপালের ঘরে বসে প্রথমবার খায়, রাতে ওর বিছানাতেই ঘুমোয়, সোমবার সকালে মোটরবাইকে কলকাতায় ফিরে আসে। বাড়িতে ঢোকার আগে সে এলাচ লবঙ্গ দিয়ে মিঠে পাতার পান খেয়েছিল। তখন তাদের দুজনেরই বিয়ে হয়নি। রাত্রে শ্রীগোপাল বলেছিল, ‘রোঘো, মেয়েমানুষ আনব? খালপাড়ে পাওয়া যায়!’ ‘না’। ‘না কেনরে, বড়োলোকের ছেলে না তুই?’ শ্রীগোপাল তার দাঁত দুটো বার করে নাক দিয়ে হাসির মতো শব্দ করেছিল। ‘বাবার কাছে শুনেছি তোর ঠাকুরদার গরাণহাটায় কেপ্ট ছিল, তুইও একটা রাখ না। তোর বংশের সামন্ততান্ত্রিক ধারাটা তাহলে বজায় থাকবে।’ অ্যালকোহল তার মাথার কোষগুলোতে সবেমাত্র চেপে ধরেছে, দৃষ্টি তখনও ঝাপসা হতে আরম্ভ করেনি, সে অবাক হয়েছিল ‘সামন্ততান্ত্রিক’ শব্দটায় নয়, শ্রীগোপালের উচ্চচারণে। এমন একটা খটমট বানানের শব্দ মদ খেয়ে স্পষ্ট উচ্চচারণ করতে পারবে সে ভাবেনি।’ বলার অভ্যাস আছে বলেই পেরেছে। একদিন ও বলেছিল ‘আমি সোশালিস্ট’ নির্ভুল উচ্চচারণে। ‘ঘোড়ামুখো, রাখতে হলে তোর বউকে কেপ্ট রাখব, আগে তুই বিয়েটা কর তো।’ শ্রীগোপাল তাই শুনে বলেছিল, ‘পনেরোটা টাকা দে, খালপাড়টা ঘুরে আসি।’ সে টাকা দিয়েছিল। শ্রীগোপাল তার জীবনের প্রথম বন্ধু।
