‘দাদাবাবু আপনার খাবার।’
সে চমকে ঘুরে দাঁড়ল। টুথব্রাশটা হাতে নিয়ে কখন সে নিজের অজান্তেই ছোটোঘরে ফিরে এসেছে! ফ্যাল ফ্যাল করে অরুণার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী খাবার?’
‘গোলমরিচ দিয়ে পাউরুটি মাখন আর চা। বউদি বললেন, আপনি যদি ঘরে বসে খেতে চান তো খেতে পারেন।’
বিবি তাকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিতে চায়। সবার মতো, সবার সঙ্গে দালানে বসে সে খাক এটা বিবি চাইছে না। ছেলেমেয়েরা তাকে দেখুক সেটাও তার ইচ্ছে নয়। ওর ইচ্ছেতেই তাকে চলতে হবে! হঠাৎই তার মাথা গরম হয়ে উঠল।
‘ডিম নেই?’ তার তীব্র স্বর অরুণার শান্ত চোখকে ব্যস্ত করে দিল।
‘আছে, সেদ্ধ করে দোবো?’
‘দাও, কলা আছে?’
‘নেই, শেষ হয়ে গেছে।’
‘ফ্রিজে জেলির শিশি দেখলাম, জলের বোতলও রয়েছে। শিশিটা আর একটা বোতল দিয়ে যাও, এই প্লাস্টিকের জাগটা নিয়ে যাও।’ সে আঙুল তুলে জাগটা দেখাল। কাল রাতে অনেকটা এইভাবেই অরুণার আঙুল উঠেছিল। ওর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভাবতে পারেনি লোকটা আচমকা এমন রুক্ষভাবে কথা বলবে। নিশ্চয় বিবির কাছে এখনই লাগাবে।
খাবারের প্লেটটা রেখে জলের জাগটা তুলে নিয়ে অরুণা যখন বেরিয়ে যাচ্ছে সে বলল, ‘বরাবরাই আমি দুটো ডিম সকালে খাই, বউদি সেটা জানে। আর আমার সব খাবারদাবার এই ঘরে দিয়ে যাবে।’
মাথা হেলিয়ে অরুণা চলে গেল। সে চায়ের কাপটা তুলে চুমুক দিয়েই বুঝল, অনেক কিছু পরিবর্তন ঘটে গেলেও বিবির দামি গন্ধওয়ালা দার্জিলিং চা খাওয়ার অভ্যাসটা বদলায়নি। বাইরে বাগানে মোটর ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যেতেই সে দ্রুত পুবের জানালায় এসে দাঁড়াল। একটা মাতাদোর ভ্যানে স্টিলের শিট এসেছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। ভ্যানের পিছনের ডালা খুলে দুটো লোক শিটগুলোকে টেনে টেনে মাটিতে ফেলেছে। কর্কশ ঝনঝন শব্দ তার কানে ধাক্কা দিতেই সে জানালা বন্ধ করে দিল। অন্যের কারখানার দিকে তাকিয়ে থাকার কোনো যুক্তি নেই।
‘ডিম সেদ্ধ আর জেলি, জলের বোতল দিয়ে যাচ্ছি।’ অরুণা তার মুখের দিকে একবারও না তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে ফোন বাজছে। গোরার গলা শোনা গেল, ‘মা, তোমার ফোন।’
বিবি ফোনে গলা চড়িয়ে কথা বলে না। ঘর থেকে শোনা যাবে না ওর কথা। অরুণা ঠান্ডা জলের বোতল নিয়ে এল।
‘কলঘর কি খালি রয়েছে?’
‘বউদি বোধহয় যাবেন, জিজ্ঞেস করে আসি।’
‘কে খাচ্ছে এখন, গোরা?’
অরুণা বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কে খাচ্ছে?’
ওকে ব্যাপারটা বোঝাবার চেষ্টা না করে সে বলল, ‘দাদামণি খাচ্ছে কি?’
‘হ্যাঁ, সঙ্গে দিদিমণিও বসেছে।’
সে পাউরুটির স্লাইস তুলে নিয়ে চেয়ারে বসল। ঠান্ডা রুটি চিবোতে তার ভালো লাগে না। আধখাওয়া টুকরোটা হাতে ধরে সে চোখ বন্ধ করল।
‘বউদি বললেন ঠিক সাড়ে এগারোটায় বাথরুমে যাবেন।’
সে মাথা নাড়ল। কাজের লোকও এ বাড়িতে কলঘরকে বাথরুম বলছে। বদলের ছাপ মুখের কথাতেও!
দুপুরে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। শরীরটা ঝরঝরে হালকা রাখতে পেট ভরে ভাত খায়নি। কাল রাতে বেশি খেয়ে ফেলায় ঘুম ভালো হয়নি। গোরা আর গুলুর বেরিয়ে যাওয়ার পর বিবিও বেরিয়ে গেল। বলেছিল কলেজে যাবে না। আগে বিবির বেরোনোর দরকার হত না, হলেও একা বেরোতো না। চন্দননগরে যতবার গেছে সঙ্গে সে—ও গেছে। শেষবার গেছে ওর বাবার বাৎসরিকে। ফিরে আসার পর বিবি ক্ষুব্ধ স্বরে বলেছিল, ‘তুমি কি ভাব আমি একা যেতে পারি না? তিন বছর আমি চন্দননগর থেকে যাদবপুর যাতায়াত করেছি, একা। এভাবে পাহারা দিয়ে কেউ সঙ্গে গেলে বিশ্রী লাগে।’ ‘আমাদের বাড়ির বউয়েরা একা ট্রেনে যাচ্ছে, লোকে শুনলে বলবে কী? তা ছাড়া স্বামী সঙ্গে থাকলে বিশ্রী লাগবে কেন?’ ‘সব ব্যাপারেই স্বামীকে সঙ্গে থাকতে হবে কেন? আমাকে কি তোমাদের বাড়ির অশিক্ষিত জবুথবু মেয়েদের মতো মনে করো নাকি?’ তার রেগে ওঠা উচিত ছিল। বাড়ি বা বংশ নিয়ে কোনো হেয় কথা সে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু বিবির কথাটা সত্যের থেকে বেশি দূরে নয়। সে কথা কাটাকাটিতে না গিয়ে বলেছিল, ‘বাবা গাড়িটা বিক্রি করে না দিলে এসব প্রবলেম দেখা দিত না, তুমি একাই ড্রাইভারকে নিয়ে চলে যেতে পারতে। তোমাকে তো বলেছিলাম মোটরবাইকে নিয়ে যাব, রাজি হলে না।’ ‘কোমর জড়িয়ে ধরে যাওয়া!’ বিবি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছিল।
সেই অবাক চোখ এখন আর বিবির নেই। এখন আর কারুর অনুমতির জন্য ওকে অপেক্ষা করতে হয় না। হয়তো এবার থেকে তাকেই অনুমতি নিয়ে চলাফেরা করতে হবে, হাতও পাততে হবে। হাজার দুয়েক টাকার আয়ু কতদিন আর? টাকা রোজগারের কথা তাকে ভাবতে হবে, চেষ্টা করতে হবে, লোকের সামনে যেতে হবে।
সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল টেলিফোনের শব্দে। দশ—বারো বার বাজতেই সে খাট থেকে উঠে পড়ল। কেউ নেই যখন, অরুণারই ফোন ধরার কথা। নিশ্চয় অরুণা নেই। সে দরজার কাছে পৌঁছবার আগেই বাজা থেমে গেল।
দালানে কেউ নেই, মাত্র দুটো জানালা খোলা। সূর্য এখন পশ্চিমে, তাই রঙিন কাচগুলো উজ্জ্বল হয়ে দালানকে বাহারি করে তুলেছে। সে অবাক হয়ে প্রায়ান্ধকারের মাঝে চেয়ারে বসে পড়ল। কত্তার ঘরের, মেজোঘরের দরজার হুড়কো টানা। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। সে একা, তার সঙ্গী শুধু বাল্যকালের বিকেলের দালান। সে স্কুল থেকে ফিরেছে, মা নীচের রান্নাঘরে, বাবা ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় চেয়ারে বসেছে। স্কুলের ব্যাগ পিঠে, দরজা ঠেলে সে দালানে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াত। বড়োজোর আধ মিনিট …তিরিশ সেকেন্ড বিশাল সময়, ওইটুকুর মধ্যেই একটা মানুষকে মেরে ফেলা যায়, …ওইটুকু সময়েই একটা মেয়েমানুষকে শুইয়ে তার শাড়ি টেনে খুলে ফেলা যায়,… ওইটুকু সময়ের মধ্যেই একটা মানুষের ধ্বংস ঘটে যায়…।
