‘তুমি কলেজ যাবে না?’
‘না।’
কেন যাবে না, সে কথা জিজ্ঞাসা করার সাহস তার হল না। গোরা সেই যে মেজোঘরে ঢুকেছে, আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। হেমন্ত ফিরে এসেছে। টুথব্রাশের লম্বা বাক্সটা আর চিরুনির সঙ্গে কিছু খুচরো আর কয়েকটা নোট বিবির সামনে টেবিলে রাখল।
‘ঠিক আছে তুমি যাও আর অরুণাকে ডেকে দিয়ো।’
হেমন্ত চলে যাবার আগে কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাল। বিবি তা লক্ষ করল। ‘শোনো, তোমাকে ও বাড়ির কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করেছে?’
‘না তো!’
‘কাল রাতে দই এনেছ, সকালে গন্ধ হয়ে গেছে। জিনিস দেখে কিনবে।’
হেমন্ত মাথা নেড়ে চলে যেতেই সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কত দিন কাজ করছে?’
‘দু মাস।’
‘দুলালের খবর কী?’
‘ছাড়িয়ে দিয়েছি। বড়ো বেশি গল্প করে, তা ছাড়া বয়সও হয়ে গেছিল।’
সে এবার আর চমকে সোজা হল না, ‘গল্প’ মানে তার সম্পর্কে গল্প। ও বাড়ির লোক, পাড়ার লোক, তাদের সামনে দিয়ে বিবিকে হাঁটতে হয়। তাদের চাহনি, ফিসফাস কথাবার্তা ওর মতো আত্মমর্যাদা সচেতনের পক্ষে সহ্য করা কঠিন তো বটেই।
ফোন বেজে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা তুলতে গিয়ে হাত টেনে নিল। বিবি তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে, ডান হাতটা বাড়িয়ে। সে রিসিভার তুলে দিল বিবির বাড়ানো হাতে।
‘মিসেস দত্ত বলছি….ওহহ বলো…আচ্ছা ডেকে দিচ্ছি।’ রিসিভারটা টেবিলে রেখে বিবি ডাকল, ‘রণো, তোর ফোন।’
গোরার পরনে জিনস, খালি গা। রিসিভারটা তোলার সময় সে বাবার দিকে একবার তাকাল। ‘হ্যালো, কে? ….কখন যেতে হবে? …ফিরতে রাত হয়ে যাবে?…. আচ্ছা ঠিক আছে।’
বিবি জিজ্ঞাসু চোখে গোরার দিকে তাকাল।
‘সুজিতের ঠাকুমা পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙেছেন। কৃষ্ণনগর থেকে ওঁকে আনতে হবে। ঠিক এগারোটায় ও গাড়ি নিয়ে আসবে।’
‘তুই কেন?’
‘গাড়িতে তোলা—নামানো, …সুজিতকে তো দেখেছ, ওদের বাড়ির লোকেদের চেহারাও ওর মতো।’
‘কী রোগা ছেলেটা! এক—এক ফ্যামিলির এক—এক রকম গড়ন হয়। …তুই ফিরবি কখন?’
‘বলল তো আটটার মধ্যেই কলকাতায় ফিরতে পারব। ওর কাকার বন্ধুর নার্সিংহোম মৌলালিতে। সেখানে ভরতি করাবে।’
অরুণা দালানে এসেছে। বিবি ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘রণো বেরোবে, রান্না হয়েছে?’
‘ভাত হয়ে গেছে, ডাল এবার নামাবো।’
‘নামিয়ে মাছের ঝাল চটপট করে দাও। তারপর দাদাবাবুর রুটি সেঁকে দিয়ে দাও।’ বিবি টেবিলে পড়ে—থাকা টুথব্রাশের বাক্সটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘দাঁতটা মেজে নাও।’
এতক্ষণ সে যেন বাইরের লোক হয়ে বসে ছিল। বিবি ‘দাঁতটা মেজে নাও’ বলে ওকে যেন সুযোগ দিল পরিবারের ভিতরে আসতে। যে কৃতজ্ঞ হাতে বাক্সটা থেকে সবুজ রঙের ব্রাশ বার করল।
‘বেসিনের ওপর ব্র্যাকেটে পেস্ট রয়েছে।’
কাল রাতেই সে দেখেছে ব্র্যাকেটে তিনটে টুথব্রাশ রয়েছে একটা গ্লাসে, পেস্টের আধ—গোটানো একটা টিউব, হাত ধোওয়ার সাবান, রিংয়ে ঝোলানো হাত মোছার ছোটো তোয়ালে আর সেফটি রেজারের বাক্স। তখন দেখে খেয়াল করেনি বাক্সটা কার জন্য হতে পারে। গোরা যখন ফোনে কথা বলছিল সে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। গোরা দাড়ি কামায়। আঠারো বছরের ছেলে দাড়ি কামাতেই পারে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, তবুও সে অবাক হয়ে গেছিল। কুড়ি—একুশ বয়স পর্যন্ত সে দাড়ি কামিয়েছে লুকিয়ে। যৌবন দেখা দেওয়ার, ব্যাটাচ্ছেলে হয়ে ওঠার চিহ্নগুলো ফোটার জন্য লজ্জা পেত। গোরার বুকে লোম, তবে তার মতো এত ঘন হয়ে ওঠেনি। বাইসেপস, ডেল্টয়েড, ট্রাইসেপস যেন ছেনি দিয়ে কেটে তৈরি করা। নিশ্চয় ব্যায়াম করে। জিনসটা এঁটে বসেছে, ভারী গোল সুগঠিত পাছার উপর। চোখ রাখলেই মনে হবে ওর গায়ে ভীষণ জোর।
নতুন ব্রাশের খোঁচায় মাড়িতে জ্বালা করে। সে সন্তর্পণে ব্রাশ ঘষতে ঘষতে দেখল দালানটা নির্জন হয়ে গেল। গুলু কলঘরে, বিবি আর গোরা তাদের ঘরে। কেউ তার সঙ্গে কথা বলার জন্য নেই। হঠাৎই সে অসহায় বোধ করল। তাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে না উঠলেও অন্তত কাছাকাছি থাকবে, কথা বলবে। দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর বউ, ছেলেমেয়ের কাছে ফিরে আসা একটা লোক, যে অপরাধই করে থাকুন না, এমন পরিত্যক্ত বোধ করবে কেন? বিবি তার সম্পর্কে ষোলো বছর ধরে ছেলেমেয়েদের কী বুঝিয়েছে? খারাপ চরিত্রের, সে ঘৃণার যোগ্য, পরিবারটাকে নষ্ট করেছে, একে বর্জন করো! মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য এবার কি ওরা শাস্তি দেবে?
ব্রাশটা কলের জলে ধুয়ে সে গ্লাসে রাখতে গিয়ে থমকে গেল। তিনটে ব্রাশের সঙ্গে বিবি কি চতুর্থ ব্রাশটা মেনে নেবে? ওর চোখে সে বিরাগ, বিরক্তি মাঝে মাঝে ঝিকিয়ে উঠতে দেখেছে। আয়না আর আলনার দরকার শুনে বিবি কোনো কথা বলেনি। বালবটায় একটা শেড দরকার, না থাকলে চোখে লাগে। কিন্তু চাইলে কি বিবি কিনে দেবে? তার কাছে টাকা আছে, সে আয়না, আলনা বা শেড নিজে কিনে আনতে পারে। কিন্তু বিবি কি এখন তার বাইরে যাওয়া পছন্দ করবে! কিন্তু কতদিন সকলের দৃষ্টি থেকে বিবি তাকে সরিয়ে রাখতে পারবে? একটা জেলখানা থেকে বেরিয়ে কি আর একটা জেলখানায় সে ঢুকল? এই বাড়িতে কর্তৃত্ব, দাপট আর ইচ্ছাকে ব্যবহার করার যে স্বাভাবিক অধিকার তার ছিল—সংসারের উপর, মানুষের উপর, বিবির উপর—সবই তার হাত থেকে এইভাবে যে চলে যাবে, কখনো সে দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারত না।
