জীবনকে সে কিছু কি দিয়েছে যে আজ প্রতিদান আশা করছে? ভাই বোন মা সবাই একে একে সরে গেছে। তাদের জন্য সে সতেরো বছর বয়সে বাবার জায়গা নেওয়ার দম্ভে বলেছিল, ‘আমি সবাইকে দেখব।’ মা বলেছিল, ‘তুই সুখী হবি।’
সুখ।
রেবতী ওপাশ ফিরে দেওয়াল ঘেঁষে শুয়ে।
পরদিন যথারীতি সে বাজারে গেল, স্নান করল, ভাত খেল এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। অন্যদিনের মতো সন্ধ্যার সময় ফিরল।
অন্ধকার ঘরে রেবতী শুয়েছিল। আলো জ্বালতেই চোখ বন্ধ করল।
‘শুয়ে যে! শরীর খারাপ নাকি?’
‘না…ভালো লাগছে না তাই।’
‘রান্না করবে না?’
‘যাচ্ছি।’
অলু একদিন এসেছিল ঘণ্টাখানেকের জন্য। তাকে বলেছিল: ‘এমন সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে ভাব করলে কী করে?’ আর পাঁচশো টাকা চেয়েছিল। দু—দিন পর ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে মানিঅর্ডার করে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
একদিন সন্ধ্যায় দোতলার কাকিমার সঙ্গে রাস্তায় মুখোমুখি হতেই তিনি এ—কথা সে—কথার পর গলা নামিয়ে বলেন, ‘তোকে তো ন্যাংটো বয়স থেকে দেখছি, তুই তো আমার ঘরের ছেলে, বল তো প্রায়ই গাড়ি নিয়ে একটা লোক তুই বেরিয়ে যাবার পরই আসে আর বউমা সেজেগুজে তার সঙ্গে বেরিয়ে যায়…কে লোকটা?’
‘গাড়ি নিয়ে!’
‘ওই মোড়ে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে, আমি অবিশ্যি দেখিনি, রেডিয়োয় গান গায় প্রফেসরের বউ সঙ্ঘমিত্রা—ওদের ঝি দেখেছে। তোর কাকাবাবুও দু—দিন দেখেছেন। দুপুরে পার্ক স্ট্রিট দিয়ে দু—জনকে গাড়ি করে যেতে।’
শুনতে শুনতে অনন্তের বুকটা খালি হয়ে যেতে লাগল। একটা নোংরা সন্দেহ পাড়ায় ছড়িয়েছে। তার নিজেরও ব্যাপারটা ভালো লাগছে না। তা ছাড়া একবারের জন্যও রেবতী তাকে বলেনি সে দিলীপ ভড়ের সঙ্গে বেরিয়েছিল। গোপন করা কেন? মাকে স্পেশালিস্ট দেখাবার জন্য আর তো একবারও বলল না। মা—র কাছে সেদিন সত্যিই গেছল কি!
‘ওহো, দিলীপদা, উনি তো রেবতীর মাসতুতো দাদা।’
কাকিমার মুখের ভাবের বিশেষ কোনো বদল ঘটল না। রেবতীকে দোতলার কেউ পছন্দ করে না। সে ওদের সঙ্গে কথা বলতে চায় না।
‘হোক দাদা, লোকে তো পাঁচকথা বলে, তুই একটু বারণ করিস।’
রাত্রে পাশাপাশি শুয়ে অনন্ত একসময় জিজ্ঞেস করল, ‘দিলীপদা আসে?’
সে টের পেল পাশের শরীরটা টানটান হয়ে শক্ত হল।
‘পাড়ায় অনেকে খারাপ ভাবে নিয়েছে।’
‘কী নিয়েছে?’
‘ওর সঙ্গে তোমার বেরোনোটা।’
হঠাৎ অনন্তের চোখে ভেসে উঠল মধুবনের খালি ফ্ল্যাট আর শোবার ঘরের দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের ছবিটা। বুকটা তার দুরদুর করে উঠল। একটা বাজে সন্দেহ তার মনে ঝিলিক দিল।
‘আমি কার সঙ্গে বেরোই না বেরোই তাতে পাড়ার লোকের কী?’
‘তাদের কিছুই নয়, কিন্তু আমার কিছু।’
‘তোমার।’
‘কেন বেরোও?’
এত কঠিনস্বরে অনন্ত কখনো কথা বলেনি।
‘বেরোলেই বা, কিছুক্ষণ মোটরে ঘুরলে কী হয়েছে?’
অনন্ত বলতে যাচ্ছিল, বেরিয়ে কোথায় যাও? জিবের ডগা থেকে সে কথাটা প্রত্যাহার করল।
‘বিয়ে করাটা উচিত হয়নি।’
‘কার, তোমার?’
‘তোমার…কোনো দরকার ছিল কি?’
‘ছিল।’
‘ছিল?’
‘বলা যাবে না। ওর কাছে আমরা অনেক কৃতজ্ঞ, অনেক ঋণী।’
‘তার জন্য আমাকে বলি হতে হবে।’
তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয়নি। রেবতী হাত বাড়িয়ে অনন্তর বাহু স্পর্শ করল। সে কোনো উত্তেজনা অনুভব করল না।
শান্তভাবে কয়েকটা দিন কেটে যাবার পর, বাড়ি ফিরে অনন্ত দেখল দরজায় শিকল তোলা, তালা ঝুলছে না। ঘরে যাওয়ামাত্র টেবলে রাখা চিরকুটটা তার চোখে পড়ে।—’আমার আর ভালো লাগছে না। চলে যাচ্ছি। আর ফিরব না। রেবতী।’
রান্নাঘরে রাতের খাবার ঢাকা দেওয়া। তার দেওয়া কোনো কিছুই নিয়ে যায়নি। ঘড়িটা টেবলে রাখা।
খাটে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে থাকতে অসম্ভব একটা শ্রান্তির শব্দ তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। আবার সে একা। পাঁচ মাসের জন্য সে অন্য একটা জগতে ঘুরে প্রত্যাবর্তন করল।
একদিন পর জেঠিমা বলল, ‘বউমাকে দেখছি না যে! বাপের বাড়ি গেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কদ্দিনের জন্য?’
‘মাসখানেক থাকবে।’
এক মাস সময় পেল। এর মধ্যে কেউ কৌতূহল দেখাবে না। কিন্তু তারপর? জানাজানি হবেই। মুখ দেখাবে কী করে? যে শুনবে প্রথমেই বলবে—কার সঙ্গে বেরিয়ে গেল? কিংবা—কোথায় গিয়ে উঠেছে?
খবরটা রেবতীর বাড়ির লোকেরা কেমন ভাবে নেবে? তারা কি ওকেই সমর্থন করবে?.. কোথায় গিয়ে উঠেছে? বাড়িতে না মধুবনের ফ্ল্যাটে!
নানান অনুমান, প্রশ্ন এবং দ্বিধা কাটিয়ে চারদিন পর রাত্রিবেলায় সে রেবতীদের বাড়িতে হাজির হল। তাকে দেখে প্রত্যেকের মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল। সে বুঝল, এরা তা হলে জানে।
‘রেবতী কি এখানে?’
ওর মা ইতস্তত করে বলল, ‘বিকেলেও তো ছিল…বলে যায়নি কোথায় গেছে।’
‘তা হলে আমি একটু ঘুরে আসি।’
‘একটু কিছু মুখে দিয়ে যাও বাবা।’
অনন্ত ওখান থেকে বেরিয়ে এল মধুবনের সাততলায়। দরজা খুলল দিলীপ ভড়ই।
‘আসুন।’
যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। অনন্ত সোফায় বসল। সামনের সোফায় দিলীপ ভড়। হাতে আধভরতি মদের গ্লাস। ছোটো করে চুমুক দিল।
‘রেবতী এখানে নেই। এসেছিল। আমি ফিরে যেতে বলি, ও রাজি হয়নি। ওকে তাই পাঠিয়েছি আমাদের দেশের বাড়িতে।’
‘ফিরে যেতে…কোথায় ফিরে যেতে?’
‘আপনার কাছে।’
‘আমি তো ওকে গ্রহণ নাও করতে পারি, তখন যাবে কোথায়?’
দিলীপ ভড় বড়ো করে হাসলেন। গ্লাসটা শেষ হয়ে গেছে।
