‘টুথব্রাশ, পেস্ট তো বাড়িতেই রয়েছে, একটা চিরুনি চাই। আর তো এখন কিছুর দরকার হচ্ছে না।’
বিবি তার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। এই প্রথম আজ বিবির গম্ভীর মুখ থেকে সে টেনশন আর ব্যক্তিত্ব সরে যেতে দেখল। স্বাভাবিক, সহজ হাসিভরা বিবি একটা দুর্লভ প্রাপ্তি।
‘একটা সেফটি রেজারও দরকার।’
ডান হাতটা নিজের থেকেই তার গালে উঠে এল। বিবি দাড়ি পছন্দ করে না। ‘দাড়িটা আমি রাখব।’
সে যা দেখবে আশা করেছে তাই হল। বিবির ভ্রূ কুঁচকে রইল তিন—চার সেকেন্ড, চাহনিটা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠল। বিবি বুদ্ধিমতী, নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে তার বিরুদ্ধে এটা প্রতিরোধের জন্যই বলা। আবার সেই পুরোনো রাঘবেন্দ্র নারায়ণ। কিন্তু কতদিন সে বিবিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে? এক সময় তো নুয়ে পড়তে হবেই। বিষয় সম্পত্তি অর্থ সবই তো সে লিখে দিয়েছে। এই বাড়িতে দাদা—বউদিরা ছাড়া বোধহয় সবই নতুন হয়ে গেছে। পুরোনোর সঙ্গে বিবির সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টাটা কেন, এতে ওর কী লাভ হবে?’
‘দাড়ি থাকলে চট করে মানুষকে চেনা যায় না। আমার বোধহয় আপাতত সেটাই দরকার।’
‘হ্যাঁ, সেটাই দরকার।’
বিবি মুখ নামিয়ে মৃদুস্বরে কথাটা বলে ব্যাগ থেকে একটা কুড়ি টাকার নোট বার করে হেমন্তর হাতে দিল। ‘একটা দাঁতমাজার ব্রাশ আর একটা ছেলেদের চিরুনি আনবে।’
বিবি ব্যাগটা ঘরে রেখে ফিরে আসতেই সে বলল, ‘আমার জামাকাপড়গুলোর কিছু এখনও আছে কি?’
‘থাকা কি সম্ভব?’
‘তা বটে! এই দ্যাখো, গোরার গেঞ্জি পরে আছি। কিছু কাপড়—চোপড় তো কিনতেই হবে।’ সে সচেতন থেকেই ‘গোরা’ নামটা উচ্চচারণ করল, এই নাম তারই দেওয়া। ‘রণো’ সে স্বীকার করবে না। বিবির নিশ্চয় কান এড়ায়নি ‘গোরা’ শব্দটা। বুদ্ধিমতী, তাই মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফোটাল না।
‘আমি কিনে এনে দেব।’
‘তুমি কি আমার মাপ জানো?’
‘রণোকে সঙ্গে নিয়ে যাব।’
বিবি আবার হাসল। এই হাসিতে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হল না। সে হৃদয়ের গভীরে তৃপ্তি বোধ করল, গোরা আর সে সমান—সমান। গোরার বয়সে তার বাপও অমন চেহারার ছিল। সে চেয়ার থেকে উঠে বলল, ‘আমার ঘরে একটা আয়না নেই।’ সে মেনে নিল ছোটোঘর তারই ঘর। ‘একটা আলনাও দরকার। পাখাটা বন্ধ হয়ে গেছে।’
‘লোডশেডিং।’ বিবি বলল।
‘পাওয়ার কাট।’ গুলু বলল।
‘একই ব্যাপার জন্য।’ প্রায় ধমকের মতোই শোনাল বিবির স্বর।
গুলু ঢোঁক গিলল। মেয়েটার মুখ মায়ের মতো হলেও স্বভাবে বোধহয় ততটা মিল নেই। দালানের দুই প্রান্তের জানলাগুলো খোলা, শুধু টেবিলের সামনে মাঝেরটা বন্ধ। দাদার দিক থেকে দেখা যাবে না টেবিলে বসা লোকেদের। এটা নিশ্চয় বিবির তাকে আড়ালে রাখার চেষ্টা।
‘তুমি কী পড়ছ এখন?’
‘ফার্স্ট ইয়ার, সায়ান্স।’
‘কোথায়?’
‘যাদবপুরে।’
‘আজ কলেজে যাবে না?’
‘যাব, সাড়ে এগারোটায় ক্লাস।’ গুলু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে পড়ল।
‘জনা, বাথরুমে যাবে তো এখুনি যাও।’
‘তুমি কলেজে পড়াচ্ছ শুনলাম, এমএসসি—টা কবে পাশ করলে? আজ তোমার কলেজ নেই?’
নিছকই কৌতূহল মেটাতে প্রশ্ন করা। কিন্তু বিবি সহজভাবে সেটা নিল না। গুলু ঘরে ঢুকে যাবার পর সে বিরস স্বরে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ পড়াচ্ছি, বসে খাবার মতো অত টাকা কোথায়? সবই তো শেষ হয়ে গেছে।’
কেন শেষ হয়ে গেছে বিবি তা আর বলল না। আন্দাজে ওর অনুক্ত কথাটা ধরে নিয়ে সে অনুতপ্ত গলায় বলল, ‘আমার জন্যই।’
বিবি নীরব রইল। সে আড়চোখে ওর মুখের দিকে তাকাল। মুখটা কঠিন। হয়তো মনে মনে বলছে, সংসারটাকে মানে মর্যাদায় ডুবিয়ে, টাকাপয়সায় নিঃস্ব করে দিয়ে এখন অনুশোচনা করার কোনো মানে হয় না।
‘আমি কিন্তু তোমাকে খরচ করতে বারণ করেছিলাম। সুপ্রিম কোর্টে যেতে মানা করেছিলাম। জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে, এটা আমি বুঝতাম।’
‘এই বোঝার কোনো মূল্য নাই। তুমি এটা কি বোঝনি, স্বামীর জন্য স্ত্রী শেষচেষ্টা করবেই। এমন একটা অবস্থা এসেছিল যে, গোকুলানন্দর জমিজায়গা সম্পত্তি বিক্রি করার কথাও ভাবতে হয়েছিল। আমার কাকা বাধা না দিলে হয়তো বিক্রিই করে ফেলতাম। তার বদলে স্টিল ফার্নিচারের কারখানাটা লিজ দিলাম একজন গুজরাটিকে।’
‘লিজ!’ সে চমকে সোজা হয়ে বসল। ‘আর. ডি. এন্টারপ্রাইজ লিজ দিয়েছ?’
‘একত্রিশ বছরের জন্য।’ বিবি চকিতে তার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘ওটা চালাবার মতো কেউ তো আমার নেই। মিছিমিছি পড়েই থাকত।’
‘কারখানাটা তাহলে এখন আর আমাদের নয়?’
‘না।’
‘আমার দাদার কাছ থেকে তো টাকা চাইতে পারতে।’
‘তোমার দাদাকে তুমি ভালোই চেনো। একবারও খোঁজ নেননি, পাশে এসে দাঁড়াননি। এমন লোকের কাছে টাকার জন্য হাত পাতার প্রবৃত্তি হয়নি।’
সে মুখ ফিরিয়ে বন্ধ জানলার দিকে তাকাল। হাত পঁচিশেক দূরে দাদা থাকে, কিন্তু মানসিকভাবে তাদের মধ্যে ব্যবধান পঁচিশ হাজার মাইলের। বিবি টাকা না চেয়ে হয়তো ঠিক কাজই করেছে। গুলু ঘর থেকে বেরিয়ে তার মায়ের পিছন দিয়ে কলঘরে যাবার সময় বাবার দিকে তাকাল। তার মনে হল ক্ষীণ একটা হাসি যেন গুলুর চোখে নড়ে উঠল।
‘জনা চুল ভিজিও না, কাল রাতে অনেক বার কেশেছ।’ বিবি মৃদু স্বরে বলল। ওর কড়া নির্দেশগুলো মুখ থেকে বেরিয়ে আসে চাপা স্বরে।
