কৌতূহলটা পনেরো—কুড়ি সেকেন্ড পর্যন্ত প্রখর থেকে ধীরে ধীরে নিবে এল। গুলু মুখ ফেরাল তার মায়ের দিকে। গোরা মুখ নামাল চায়ের কাপে। বিবিই শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। ওর চোখেই অপরিচয়ের ছাপটা নেই। মুখ নামিয়ে চাপাস্বরে সে কিছু বলতেই গুলু তার মায়ের বাঁদিকে খালি চেয়ারটায় উঠে এল চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। এটা বিবির না—বলা নির্দেশ—ওই চেয়ারটায়ই তাকে এখন বসতে হবে।
সে হাসার চেষ্টা করল। আর শুধু বিবিই সেই হাসিটা দেখল। সে আশা করল, পালটা এক চিলতে হাসি বিবির চোখে ফুটে উঠবে। তার বদলে বিবি মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে গুলুর পরিত্যক্ত চেয়ারটা দেখাল। বসার আগে সে তিনজনের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে বলল, ‘গুড মর্নিং।’ শুধু গুলু অস্ফুটে বলল, ‘মর্নিং।’
‘চন্দননগর থেকে কখন তোমরা ফিরলে?’ জিজ্ঞাসাটা বিবিকে।
‘আধঘণ্টা আগে। তোমাকে চা দেবে?’
‘হ্যাঁ।’
ঘুম ভাঙার পর বিছানাতেই সে এক কাপ চা খায়। বিবির সেটা নিশ্চয় মনে আছে। এতে আপত্তি ছিল ওর: ‘দাঁত না মেজে কিছু খাওয়া আনহাইজিনিক।’ সে বলেছিল, ‘গোলি মারো তোমার হাইজিনকে, বেড—টি দাঁত মেজে খেলে সেটা আর বেড—টি হয় না।’ বিবি আর একদিনও দাঁত মাজার কথা তোলেনি।
আজও তুলল না। তাহলে কি ও বদলায়নি কিংবা ভীষণভাবে বদলেছে বলেই ব্যাপারটা গ্রাহ্যে আনল না?
‘দাঁত মাজার ব্রাশ, পেস্ট কিছুই আমার নেই। কাউকে দিয়ে আনানো যাবে কি?’
‘কেন যাবে না!’ ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডাক তো হেমন্তকে।’
গোরা দ্রুত উঠে গিয়ে দালানের জানালা দিয়ে চেঁচিয়ে হেমন্তকে ডাকল। ওর ডাকার স্বরটা কেমন যেন, উৎকণ্ঠিত, জরুরি, তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি করতে চাওয়ার মতো। কী নিষ্পত্তি করতে চায়? বাবাকে প্রথম দেখার টাল যে সামলাতে পারছে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে ওর ভাবভঙ্গিতে। নিজেকে খাড়া রাখতে চাইছে। বাবাকে গ্রাহ্য করবে কী করবে না এখনও তা ঠিক করে উঠতে পারেনি। গোরার পুরো চেহারাটা এই প্রথম সে দেখল। আঠারো বছরের, কিন্তু একটা ব্যাটাছেলের মতোই বটে! সে স্নেহভরা তারিফ নিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকল।
‘এক্সকিউজ মি।’ অস্ফুটে সবার উদ্দেশে কথাটা বলে গোরা মেজোঘরে ঢুকে গেল। বাবার দিকে সে একবারও তাকাল না।
স্বাভাবিকই। সে মনে মনে বলল, বলতে গেলে এই প্রথম বাবাকে দেখছে, জড়তা তো থাকবেই। ধীরে ধীরে আলাপ হবে। নতুন করে বিবির সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, এখনও তো তার সঙ্গে বাইরের লোকের মতোই ব্যবহার করা হচ্ছে।
অরুণা চা দিয়ে বলল, ‘কিছু খাবেন, মাখন—পাউরুটি?’
‘না।’ সে বিবির দিকে তাকাল, খাওয়ার কথাটা ওরই তো তোলা উচিত ছিল।
‘চন্দননগর থেকে কখন বেরিয়েছ? কার মেয়ের ভাত, সুবোধের?’ সুবোধ ওর ছোটোভাই, তার বিয়ের সময় ক্লাস ফোর—এ পড়ত।
‘সাতটার ব্যান্ডেল লোকাল ধরে এলাম। হ্যাঁ, সুবোধের মেয়ের ভাত।’ সহজ স্বচ্ছন্দ বলার ধরন। বিজ্ঞানের ছাত্রী, কলেজে পড়ায়, যতটুকু প্রশ্ন ততটুকুই উত্তর। সে বিবির মুখের দিকে এখন ভালো করে তাকাল। মুখটা সামান্য ভারী হওয়া ছাড়া আর কিছুই বদলায়নি। থুতনির নীচেটা একটু ফুলে রয়েছে, চর্বি। গলাটা আর লম্বা দেখাচ্ছে না। বাহুদুটো অন্তত দু—তিন ইঞ্চি মোটা হয়েছে। গায়ের রঙও আর আগের মতো ফরসা নেই। কানে সেই পুরোনো হিরের—তার চোখ নিথর হয়ে গেল। বিবি চুল কেটে ফেলেছে।
সে মুখ নামিয়ে টেবিলে চোখ রাখল। সে টের পাচ্ছে গুলু একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। বিবির চুল, ঘাড় আর কাঁধের উপর ছড়ানো, পিঠে ব্রেসিয়ারের দু—পাশে চর্বি উপচে উঠেছে। কাজটা বোধহয় ইচ্ছে করেই করেছে। ওর দীর্ঘ চুল তার ভালো লাগত বিবি সেটা জানে। তাকে আঘাত দেবার জন্য যদি চুল কেটে থাকে, তাহলে বিবি খুব সফল নয়। গত রাতে ছোটোঘরের দিকে তোলা অরুণার আঙুলই তাকে চুরমার করে দিয়েছে। তারপর আর কোনোকিছুই তাকে যন্ত্রণা দিতে পারবে বলে তার মনে হচ্ছে না।
‘তোমার ভালো নাম আমি জানি না।’
‘জনা।’
‘বেশ নাম। কে রেখেছে, মা?’
‘হ্যাঁ।’
‘গোরার ভালো নাম কী?’
‘গোরা!’ গুলু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ‘গোরা কে?’
‘উনি রণোর কথা বলছেন। ওর ভালো নাম রণব্রত।’ বিবি তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দেবার সময় ভ্রূ কোঁচকাল। তার মনে হল, বিবির চাহনিতে ঔদ্ধত্য আর বিরাগ। যেন বলতে চায়, এরা আমারই ছেলেমেয়ে, এদের আমিই মানুষ করেছি, আমার দেওয়া নামেই এরা পরিচিত হবে। রাঘবেন্দ্র নারায়ণ দত্তর দেওয়া নাম এরা বহন করবে না।
‘জনাকে আমরা জনা বলেই ডাকি, ওর ডাকনাম এটাই।’
সে আবার মুখ নামিয়ে ফ্যাকাশে হাসি হাসল। বিবি নামটা ওর বাপের বাড়ির দেওয়া। যদি তার দেওয়া হত, তাহলে বিবি নিশ্চয় বদলে নিত ।
দালানের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সেই লোকটি, কাল রাতে যে ফটকের কাছে তার পাশ দিয়ে চলে গেছিল। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স, গোল মুখটা বোকামিতে ভরা, তেল চকচকে ব্যাকব্রাশ চুল, হাফশার্টের হাতার তলায় একটা বড়ো মাদুলি।
‘বউদি, ডেকেছেন?’
‘এত দেরি হল কেন আসতে? ডেকেছি তো অনেকক্ষণ।’ বিবি চেয়ার থেকে উঠল। ‘দোকানে যেতে হবে, তাড়াতাড়ি কয়েকটা জিনিস এনে দাও।’ ব্যস্তভাবে সে ঘরে ঢুকে তার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল।
‘কী আনতে হবে?’
