চোখ বন্ধ করে বুকের উপর দু—হাত রেখে সে ঘুমোবার চেষ্টা করে। তখন আবছাভাবে মনে পড়ে শ্রীগোপালের কথাটা : ‘যদি ঘুম না আসে, তাহলে মদ খেলে আসবে।’ ‘তোকে কে বলল?’ ‘বাবাকে দেখেছি ঘুম না এলে খায়।’ ‘নন্দকাকা মদ খায়।’ ‘ঘরের তাকে কাগজে মোড়া বোতল লুকিয়ে রাখা আছে। আলো জ্বেলে প্রথমে দেখে নেয় আমি ঘুমিয়েছি কি না। আমি তখন মটকা মেরে থাকি।’ ‘তুই খেয়েছিস কখনো?’ ‘খেয়েছি। তুই খাবি?’ ‘খেলে মাতাল হয়, বাবা পিঠের চামড়া তুলে দেবে।’ ‘একটু খেলে কিচ্ছু হয় না। এলাচ দিয়ে পান খাবি, কেউ মুখে গন্ধও পাবে না। খাবি তো আমাদের ঘরে আয়।’ দুপুরে একতলায় নন্দকাকার ঘরে, কালমেঘ রস খাওয়ার মতো সে ঢক করে জীবনে প্রথমবার নির্জলা মদ খেয়েছিল। চোখ বুজে সে উগরে আসতে চাওয়া তরল জিনিসটাকে নীচের দিকে নামাতে ধস্তাধস্তি করেছিল নিজের সঙ্গে। চোখ খুলে সে শ্রীগোপালের লম্বা মুখ আর বেরিয়ে থাকা লম্বা দুটো উপরের দাঁতের দিকে তাকিয়ে ছলছল স্বরে বলেছিল, ‘ঘোড়ামুখো, তুই আমাকে নষ্ট করলি!’ সে ছুটে দোতলায় এসে ছোটোঘরের দরজা বন্ধ করে তক্তপোশে শুয়ে ছিল।
তখন সে ক্লাস এইটে, শ্রীগোপাল ক্লাস সিক্সে। তারা সমবয়সি ছিল। তাদের কাচ আর আয়নার ব্যবসা, গোকুলানন্দর জমি—জায়গা নন্দকাকাই দেখাশোনা করত। মা—মরা শ্রীগোপালকে মেদিনীপুরের গ্রাম থেকে নিয়ে যখন এল তখন তার বয়স দশ। ফেল করে করে শ্রীগোপাল কুড়ি বছর বয়সে মাধ্যমিক পাস করল, তার দু—মাস পর পঁয়তাল্লিশ বছর দত্তদের সেবা করে নন্দকাকা মারা গেল আলসারে ভুগে। মারা যাবার এক হপ্তা আগে নন্দকাকা দোতলায় উঠে এসেছিল বাবার সঙ্গে দেখা করতে। ‘বড়োবাবু, শ্রীগোপালকে একটু দেখবেন। আমি মরে গেলে ও অনাথ হয়ে যাবে। ‘ ‘একথা বলছ কেন নন্দ? রঘু আর শ্রীগোপালকে আমি আলাদা করে দেখি না তো। তুমি নিশ্চিন্ত থাক, ওর দায়দায়িত্ব আমি নিচ্ছি।’ শ্রীগোপাল চেয়েছিল কলেজে ভরতি হতে। বাবাকে সেকথা সাহস করে বলতে পারেনি। তাকে ধরেছিল, ‘রোঘো, তুই বল। তুই বললে জ্যাঠামশাই শুনবেন।’ বাবা শোনেননি। ‘শ্রীগোপালের পড়াশুনোর মাথা নেই, মিছিমিছি বছরগুলো নষ্ট হবে। তার থেকে বরং রোজগারের চেষ্টা এখন থেকেই করুক। ওকে গোকুলানন্দে রাখব। ওর যা বিদ্যে তাতে চাকরিবাকরি হবে না, বরং চাষবাসের লাইনে যাক, এতে পয়সা আছে।’ সে শ্রীগোপালকে সেই কথাই জানিয়েছিল। তখন কীরকম থমথমে হয়ে গেছিল ওর মুখ। বড়ো বড়ো দুটো দাঁতে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে হতাশা আর ক্ষোভ দমন করে বলেছিল, ‘তোকে আর আমাকে নাকি আলাদা করে দেখেন না? তুই কলেজে পড়বি আর আমি ধানচাষ করব। এই হচ্ছে বড়োলোকদের চরিত্র। ঠিক আছে তাই করব।’ তখন সে শ্রীগোপালকে কী বলেছিল? তিরিশ বছর আগে…না আরও কম, আঠাশ বছর। কী বলেছিলাম? মনে পড়ছে না….মনে পড়ছে না….আমার স্মৃতিশক্তি কমে গেছে….কিন্তু আমার সব কথা মনে পড়ার আর কি কোনো দরকার আছে?
ধীরে ধীরে তার অবসাদভরা চেতনা ক্ষীণ হয়ে ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি জায়গায় তাকে রেখে নিল। একসময় তার মনে হল, বাইরের দালানে কারা হাঁটচলা করছে, কথা বলছে। তার ইচ্ছে হল উঠে গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ায়। দাঁড়াবার জন্য অস্থির হয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে সে আবার ঘুমের মধ্যে ঢুকে গেল। পুবের খোলা জানলা দিয়ে বিছানায় রোদ এসে তার ঘুম ভাঙাতে সে চোখ খুলে প্রথমেই দেখল সিলিংয়ে ঝোলানো রঙচটা পাখাটাকে। অবাক হয়ে সে বুঝতে চেষ্টা করল, এখন সে কোথায়? পাখাটা রাতে ঘুরছিল, এখন থেমে রয়েছে।
সে ঘরের চারিদিকে চোখ বোলাল। যে ছোটোঘরটাকে সে চিনত, সেটা ছিল অন্যরকম। কাঠের র্যাকটা রঙিন বিবর্ণ একটা পরদা ঝুলিয়ে আড়াল করা। যে সিঙ্গল খাটে সে শুয়ে রয়েছে সেটাও নতুন। প্লাস্টিকের চাদরে ঢাকা কাঠের একটা ছোটো টেবল, তার ওপর হাতঘড়িটা, প্লাস্টিকের জাগ, কাচের গ্লাস আর একটা কাঠের চেয়ার। এর বেশি আর কিছু তার চোখে পড়ল না। সে উঠে বসে হাতঘড়িটা তুলে নিয়ে সময় দেখল। আটটা—পঞ্চাশ। ঘরটা আগের মতো হতশ্রী নয় কিন্তু কীরকম যেন খেলো, দায়সারা আর যত্ন—বঞ্চিত। খাটের কাঠ খুবই সস্তার। সে চাদরটা তুলে দেখল তোশকটা নতুন এবং পাতলা।
দালানে কারা কথা বলছে? কান পেতে সে শোনার চেষ্টা করল। মেয়ে গলায় কে বলল, ‘চায়ে চিনি নিতে বারণ করেছি অরুণাদি, তবু দিয়েছে।’ অরুণার উত্তরটা সে শুনতে পেল না। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। গোরার গেঞ্জিটা তার গায়ে। চুল আঁচড়ানো দরকার কিন্তু চিরুনি নেই, দাঁত মাজার ব্রাশও নেই। ব্রাশটা রেখে দেওয়া উচিত ছিল। দু—হাতের আঙুল চুলে ঢুকিয়ে পিছনে চিরুনির মতো চালাল। দরজার কাছে এসে একটু ইতস্তত করে পাল্লাদুটো সে ভিতরদিকে টানল।
ওরা একসঙ্গে মুখ ফিরিয়ে তাকাল তার দিকে। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই ওরা জেনে গেছে, সে কালরাতে এসেছে, তাই চমকাল না। টেবলের তিনদিকে তিনটি চেয়ারে বসে ওরা তার দিকে সোজা তাকিয়ে রয়েছে। বড়ো চেহারার যে ছেলেটি, যার চোখ একবার কুঁচকে উঠল, সে নিশ্চয় গোরা। যে মেয়েটি মুখ পিছনে ঘুরিয়ে দেখছে, চোখদুটো বড়ো হয়ে উঠেছে, সে নিশ্চয় গুলু। দুজনের মাঝে বসে রয়েছে বিবি। সে ডানদিকে মুখ ফিরিয়ে দেখছে। তিনজনের চাহনিতে একটাই মিল। চোখগুলো যেন, প্রচণ্ড ক্ষমতাসম্পন্ন লেনসের দূরবিন দিয়ে তার মুখের ভাব ধরার জন্য গভীর অনুসন্ধানী। তার চোখের, ঠোঁটের প্রতিটি কোষ, তন্তু, শিরা, শ্বাসপ্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করছে প্রবল কৌতূহলে । তার কাছে এটা খুবই স্বাভাবিক মনে হল। ষোলো বছর এরা তাকে দেখেনি, সেও দেখেনি এদের।
