‘আপনাকে কী আরও মাংস দোব?’
‘না। রান্না ভালো হয়েছে।’
‘ঝাল ঠিক হয়েছে? বউদি বলেছিল আপনি বেশি ঝাল খান।’
সে মাথা হেলিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে।’
‘টক দই এনে রেখেছি।’
নিশ্চয় বিবি ওকে বলে গেছে। ওই বাড়িতে একমাত্র সে—ই মিষ্টি পছন্দ করে না। বাবার ডায়াবিটিস ছিল, তবু প্রতি রাতে চারটে সন্দেশ না খেলে তার ভালো ঘুম হত না। নিজের খাওয়ার ব্যাপারে বিবি কড়াভাবে নিয়ম মেনে চলে। এখনও হয়তো রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস দুধ খায়। এটা ওর ছোটোবেলার অভ্যাস।
ফ্রিজ থেকে অরুণা দইয়ের ভাঁড় বার করে চামচ দিয়ে দই কেটে পিরিচে রাখছে। সে আড়চোখে অরুণার হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথার মধ্যে হঠাৎ একটা কম্পন অনুভব করল। হুবহু সেই আঙুল। মোটা, বেঁটে আর ভোঁতামাথার আঙুল। সেইরকম ভাবেই চৌকো সাদা নখগুলো ছাড়িয়ে আঙুলের মাথা বেরিয়ে রয়েছে। দুটো মানুষের আঙুল হুবহু এক হয় কী করে!
আমি কী এখনও তাহলে ভুলে যেতে পারিনি।
‘থাক।’ সে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। ‘আজ আর দই খাব না। শরীরটা ভালো লাগছে না।’
অরুণাকে অনুরোধের সুযোগ না দিয়ে সে দ্রুত বেসিনের দিকে এগিয়ে গেল। সাবানে হাত ধুতে ধুতে বলল, ‘তুমি শোবে কোথায়?’
‘বউদির ঘরে।’
‘কোথায়?’
অরুণা মৃদুস্বরে বলায় সে স্পষ্ট শুনতে পায়নি। মুখ তুলে সামনের ছোটো আয়নাটায় সে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। দালানের অর্ধেক আর টেবিলটা দেখা যাচ্ছে। অরুণা বাসন তুলছে। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘ কোথায় শোবে বললে?’
অরুণা তার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকাল। ‘কেন বউদির ঘরে, রোজ যেমন শুই।’
‘সেকি, এক ঘরে দুজন?’
‘তা কেন, আপনি আপনার ঘরে শোবেন, বিছানা তো করাই আছে।’
অরুণা ডানহাতের তর্জনি তুলে ছোটোঘরের বন্ধ দরজাটা দেখাল।
একটা চিৎকার তার গলা পর্যন্ত উঠে এসে থমকে গেল। সে বলতে চাইল, ‘বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। কোথায় আমি শোব, সেটা আমিই ঠিক করব। তুমি একটা ঝি, কাজের লোক। আর এই পরিবারের কর্তা আমি!’
‘ছোটোঘরে শোব, সেটা কে তোমায় বলল?’
‘বউদি।’
একহাতে বেসিনটা সে ধরে না নিলে টলে যেত। এই মেয়েমানুষটা তার মনিবের নির্দেশমাত্র পালন করছে। এর সামনে রাগ, ক্ষোভ চিৎকার মানে নিজেকেই সাধারণ স্তরে নামিয়ে আনা।
‘তুমি এখন নীচে খেতে যাবে?’
‘হ্যাঁ। ছোটোঘর খোলাই আছে।’
অরুণা নীচে চলে গেল। বিবি তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে, এটা সে একবারও ভাবেনি। ভাবা উচিত ছিল। চার বছর তার সঙ্গে দেখা করতে যায়নি, একটা চিঠিরও উত্তর দেয়নি, জেলের ফটকেও তাকে নিয়ে যাবার জন্য কেউ ছিল না। এগুলোই তো জানিয়ে দিয়েছে তাকে উপড়ে ফেলেছে এরা মন থেকে। এই বাড়িতে একটা মাছি আর সে কি একই ধরনের মনোযোগ পাবে? বুকের কাছে মাথা নামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে রূঢ় ধাক্কাটা সামলে চেয়ারে এসে বসল।
তার মনে হচ্ছে সে যেন আবার অধিকার হারাল। মায়ের সঙ্গে ছেলেমেয়েরাও তাকে বোধহয় পরিত্যাগ করবে। এখন আর সে বাবা নয়, স্বামী নয়, কিছুই নয় এই বাড়িতে। সে এই বারান্দায় হাঁটবে, সবার সঙ্গে কথা বলবে, টেবিলে বসে খাবে, টিভি দেখবে, বাড়ির বাইরে যাবে, প্রতিটি কাজ স্বাভাবিক মানুষের মতো করবে অথচ সে কিছুই নয়।
কী ভয়ংকরভাবে বিবি তাকে শাস্তি দিল। ও বোধহয় আজকের দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। ইচ্ছে করেই সবাইকে নিয়ে চন্দননগরে গেছে, যাতে তার নির্দয়তার আঘাতে ভেঙে পড়া একটা মানুষকে না দেখতে হয়। তার প্রতিভূ হয়ে অরুণা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই বাড়িতে তার জায়গা কোথায়।
আপাতত অ—দরকারি কিন্তু ভবিষ্যতে দরকার হতে পারে, এমন সব জিনিস রাখার জায়গা এই ছোটোঘর। একটা উঁচু কাঠের র্যাকে ছেঁড়া বই, খবরের কাগজ; ইলেকট্রিকের, কর্পোরেশন ট্যাক্সের, টেলিফোনের বিল, পুরনো জুতো, গ্রামোফোন রেকর্ড; ভাঙা আয়না, চেয়ার, শ্বেত পাথরের টুকরো এমনকী বাটনা বাটার শিল পর্যন্ত এই ঘরে ছিল। একটা ছোটো তক্তপোশে গোটানো থাকত শতরঞ্চি মোড়া তোশক। পুবে আর দক্ষিণে দুটো ছোটো জানালা, অন্য দুটো ঘরের মতো এর লাগোয়া কোনো বারান্দা নেই। আগে ছোটো একটা ছাদ ছিল, তার ঠাকুরদার সময়ে ছোটোঘরটা তৈরি হয়। বাড়ির সর্বত্র কাঠের কড়িবরগা, এই ঘরের লোহার।
সে ছোটোঘরের ভেজানো দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেজানো দরজাটা খুলে ঢুকলেই সে আর একটা জগতে পৌঁছে যাবে। জেল সে জানে। যাবজ্জীবন কারাবাসের দণ্ডাজ্ঞা নিয়ে জেলে ঢুকলেও সেখানে একটা প্রতিশ্রুতি ছিল, একদিন সে মুক্তি পাবে। কিন্তু এই ছোটোঘরটাকে সে জানে না। সে জানে না কীসের সম্ভাবনা এখানে রয়েছে। তার সারা শরীর কেঁপে উঠল। খুনের মামালায় আসামি, ধর্ষণের মামলায় আসামি, আমি রাঘবেন্দ্র নারায়ণ দত্ত, আমার আর কিছুই করার নেই। এবার আমি নিজেকে বিলোপ করার দণ্ড মাথা পেতে নিচ্ছি।
আমি এখনও বুঝতে পারছি না আমি কে! সে চোখ বন্ধ করে ছোটোঘরের দরজায় হাত রাখল।
তিন
সে ঘুমের মধ্যে অস্বস্তিভাবে নড়াচড়া করল। পাখা ঘুরছে তবু সে ঘেমে উঠল। একবার ঘুম ভেঙে উঠেও বসে। নতুন বিছানার চাদরের গন্ধ শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকে পাকাপাকিভাবে যদি রয়ে যায়, এমন একটা ধারণা তাকে কিছুক্ষণ বিব্রত করে রেখেছিল। মুখে ঘাড়ে জল দেবার জন্য বেসিনে যাওয়ার ইচ্ছাটা দমন করে সে আবার শুয়ে পড়ে। এই ঘরে কোনোদিনই সে রাত কাটায়নি। নতুন কলি করা হয়েছে, চুনের গন্ধ এখনও মিলিয়ে যায়নি।
