কিন্তু তার অপরাধটা কী? একজন স্বাভাবিক, সক্ষম স্বামী যা করে থাকে, সেইটুকুই সে করতে চেয়েছে। তা হলে এই বিরোধিতা কেন? ওর ইচ্ছা—অনিচ্ছার সামনে কী হাত জোড় করে দাঁড়াতে হবে? সে স্ত্রীকে ভালোবাসে, সুন্দরী, শিক্ষিত বিবির জন্য তার অহংকারও আছে। তবু কেন তাকে অপছন্দ করে, যেটা এক—এক সময় ঘৃণার মতো মনে হয়। বিবি এখনও কী ষোলো বছর আগের মতোই রয়ে গেছে?
চটকানো সাবানটা মুঠোর আঙুলের ফাঁক দিয়ে কাদার মতো বেরিয়ে আসতেই তার হুঁশ ফিরল। শুকিয়ে যাওয়া ফেনায় সারা গা চিটচিট করছে। শাওয়ারের কল খুলে দিয়ে সে চোখ বন্ধ করে হাসল, কাল তার সর্দি হবেই।
অরুণা টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে। দালানের পাখাটা ঘুরছে। গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে তাকে আসতে দেখে সে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘তোয়ালেটা দিন।’
‘দড়িতে তো জায়গা নেই আর।’
‘আর একটা দড়ি আছে।’
আর একটা দড়ি সে দেখেছে। তাতে একটা গামছা ঝুলছে, নিশ্চয় সেটা অরুণার। কাজের লোকের গামছা আর তোয়ালে একই দড়িতে থাকবে না, এটাই এ বাড়ির রীতি। তাহলে শুকনো তোয়ালেগুলো সরিয়ে তার তোয়ালের জন্য জায়গা বার করে দিতে পারে। অরুণা সেটা করার কথা ভাবল না কেন? আমাকে কি নীচু চোখে দেখছে? বিবির কাছ থেকে ও কতটা শুনেছে আমার সম্পর্কে?
তোয়ালেটা রেখে এসে অরুণা বলল, ‘চিরুনি দোব?’
‘এখন না, চুলটা আগে শুকোক। তুমি পাখাটা আর একটু বাড়িয়ে দাও আর খাওয়ার জল দাও।’
রেগুলেটারটা এক ঘর বাড়িয়ে অরুণা তার দিকে তাকাল।
‘আরও এক ঘর দাও।’
মুখ তুলে ঘূর্ণির বৃদ্ধিটা দেখতে দেখতে তার খেয়াল হল পাখাটা নতুন। ছোটো ছোটো অনেক বদলই ঘটে গেছে।
‘আপনাকে একটা গেঞ্জি দোব?’
অবাক হয়ে সে তাকাল। ‘গেঞ্জি আছে নাকি?’
‘দাদামণির আছে।’
‘গোরার!’ আরও অবাক সে। গোরা কত বড়ো হয়েছে? ‘আনো তো।’
অরুণা মেজোঘরের বন্ধ দরজায় পেতলের হুড়কোটা খুলে ভিতরে গেল, গোরা তাহলে এই ঘরেই থাকে। অরুণা গেঞ্জি এনে হাতে দিতেই সে চোখের সামনে ঝুলিয়ে অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘এটা গোরার তো? ….. এত বড়ো হয়ে গেছে!’
গেঞ্জিটা পরে সে গভীর তৃপ্তির হাসি হাসল। আমার চেহারাটাই পেয়েছে, আঠারো বছরে আমি এত বড়োই ছিলাম। সে ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
‘আপনার ভাত গরম করে আনি?’
‘কী রান্না হয়েছে?’
‘মসুর ডাল, আলু—পটলের ডালনা আর মাংস।’
মসুর ডাল তার প্রিয়, এটা অরুণার জানার কথা নয়। নিশ্চয় বিবি বলে দিয়েছে। ডালের সঙ্গে ভাজা না থাকলে সে খেতে পারে না। মসুর ডালের সঙ্গে তার পছন্দ করলা ভাজা।
‘ভাজা করোনি?’
‘করলা ভেজেছি।’
‘বউদি বলে দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
তার চোখ ক্ষণেকের জন্য উজ্জ্বল হল। আসল জায়গায় বদল ঘটেনি। বিবি ভোলেনি তার পছন্দের ব্যাপারটা। একটা আবেগ তার বুক থেকে উঠে আসছে। সে ঢোঁক গিলে সেটাকে নামিয়ে দেবার চেষ্টা করল।
অরুণা একতলায় নেমে গেছে। জামা, ট্রাউজার্স আর নোটগুলো আবার ঝুলিতে ভরে সে একপাশে সরিয়ে রাখল। কাপড়চোপড়গুলো সে আর পরবে না ঠিক করেই রেখেছে। কাউকে দিয়ে দেবে, কিন্তু কাকে? তার মাপের লোক কে আর আছে? গোরা! পাগল নাকি, জেলের গন্ধ লাগা জিনিস নিজের ছেলেকে! বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে সে চোখ বন্ধ করল। বহু বহু বছর পর এমন একটা আরামের উপর সে শরীর রাখল। তার চেতনা থেকে অতীত ধীরে ধীরে এবার মুছে যাবে। একটা নতুন মানুষ হয়ে তার জীবন শুরু হবে আজ থেকেই।
অরুণার রান্নার হাত ভালো। সে প্রায় জাবর কাটার মতো অনেক সময় নিয়ে চিবিয়ে যাচ্ছে এক—একটা গ্রাস। টেবিলের অপর ধারে অরুণা দাঁড়িয়ে, সারা বাড়িতে কোনো সাড়াশব্দ নেই। দাদার টিভি বন্ধ। ও বাড়িতে দুই মেয়ে, নিশ্চয়ই এত দিনে তাদের বিয়ে হয়ে গেছে, তাহলে এখন লোক মাত্র দু জন। ওরা দশটায় শুয়ে পড়ে। এখন কটা বাজে?
সে মুখ তুলে দেওয়ালঘড়িটা দেখার জন্য তাকাল। এতক্ষণ সে লক্ষ করেনি, পেন্ডুলাম ঝোলানো সাদা ডায়ালের ঘড়ির জায়গায় একটা সোনালি ফ্রেমের গোলাকার ঘড়ি রয়েছে। ডায়ালটা ফিকে গোলাপি, তিনটে কাঁটা সোনালি। রাত্রে ঘুম না এলে সে দালানের ঘড়ির টকটক শব্দ শুনতে পেত। প্রতি ঘণ্টায় আর আধ—ঘণ্টায় ঘড়িটা বাজত। হপ্তার দম সে নিজের হাতে দিত।
‘আগের ঘড়িটার কী হল?’
‘জানি না। আমি এসে তো এই ঘড়িটাই দেখছি।’
‘তুমি রাতে শোও কোথায়?’
‘বউদির ঘরে, মেঝেয়।’
‘বউদির ঘর’ শব্দটা তার কানে বাজল। এটা তার কাছে নতুন। ‘কত্তার ঘর’ কথাটা হয়তো কেউই আর বলে না। গুলু আর গোরার জন্য এই বাড়ির কতটা অতীত বাকি রইল।
‘আমি আজ আসব, এটা আর কে জানে?’
‘হেমন্ত জানে।’
‘ও বাড়ির কেউ?’
‘বউদি বলতে বারণ করেছে।’
‘দালানের জানালা তুমি বন্ধ করে রেখেছ?’
‘বউদি আজ বন্ধ করে রাখতে বলেছে।’
‘আমি কেন জেলে গেছিলাম, জানো?’
সে অরুণার মুখের দিকে তাকাল। বিবি ওকে কী বলেছে, সেটা জেনে রাখা দরকার। বাড়ির আর পাড়ার লোকেরা, আত্মীয়স্বজনেরা কী শুনেছে বা জেনেছে তা সে জানে না। না জানলেও সে অনুমান করতে পারে। শুধু তো খুন নয়, তার সঙ্গে ছিল—।
‘আপনাকে কতকগুলো লোক খুন করতে এসেছিল। আপানি আটকাতে গিয়ে তাদের একজনকে মেরে ফেলেন।’
বিবি যতটা সম্ভব করেছে। ব্যাপারটাকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য এর থেকে ভালো গল্প আর কী হতে পারে! সে মেরে ফেলেছে, খুন করেনি, সে অপরাধ করতে বাধ্য হয়েছে—এই কথা কি বিবি ছেলেমেয়েদেরও বলেছে?
