দালানটা চওড়া। কত্তার ঘর, তারপর মেজো ঘর। এই দুটো ঘরের মাঝে দেওয়াল ঘেঁষে খাওয়ার টেবল। জন্মে থেকেই সে শ্বেত পাথর বসানো টেবলটা আর কাঠের ছ—টা চেয়ারকে দেখে এসেছে। টেবলে রাখা জিনিসগুলো আগে সে দেখেনি, শুধু টেলিফোনটা ছাড়া। আগের ভারী কালো রঙের বদলে এটা জলপাই রঙের হালকা। টেবলের পাশেই ফ্রিজ। সাদার বদলে এটা টোমাটো রং—এর। তার অনুপস্থিতিতে কেনা। টুলের উপর রাখা জলের ফিলটারটাও নতুন। পিতলের ফুলদানিটা মোরাদাবাদি। তাতে আধ শুকনো রজনীগন্ধার কয়েকটা ছড়। প্লাস্টিকের ছোটো ধামায় চারটে সিঙ্গাপুরি কলা, খোসা কালো হয়ে উঠেছে। কাচের দুটো নুনের কৌটো, উপুড় করা চারটে স্টিলের গ্লাস আর নিকেলের ফোল্ডিং ফ্রেমের মধ্যে পোস্টকার্ড মাপের দুটি শিশুর রঙিন ছবি।
কলঘরে যাওয়ার সময় সে টেবলের পাশে থমকে ছবি দুটোর দিকে তাকাল। বছর দশেকের একটি মেয়ে, মাথায় কুঁচি করে ঘোমটার মতো বাঁধা ওড়না, ফুলের মুকুট, কপালে চন্দনের ফোঁটা, চোখে পুরু কাজল। সামনে থেকে তোলা ছবি, নাকটা হুবহু বিবির মতোই সরু, লম্বা। বোধহয় নাচের কোনো অনুষ্ঠানের পর সাজঘরে তোলা ছবি। মেয়েটি গুলু নিশ্চয়। এত ভারী মেক আপে বোঝা যাচ্ছে না মুখটা কেমন। হাসির জন্য ঠোঁট দুটি খোলা, নীচের একটা দাঁত নেই। অন্য ছবিটি অবশ্যই গোরার। ট্রাই সাইকেলে বসে, প্যাডেলে চটি—পরা পা, হাফ প্যান্ট, গোল—গলার গেঞ্জিতে ছাপছোপ দেওয়া, বাগানে তোলা ছবি। মুখটা সে ছবির কাছে নিয়ে গেল। তার মনে হল, শিশুটির চোখের মণির রঙ তার মতোই কটা, কান দুটি দীর্ঘ, চোয়াল সামান্য চওড়া। ভ্রূকুটি করে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। দুজনে এখন কত বড়ো হয়েছে? গুলুর বয়স এখন কুড়ি, গোরার আঠারো। সে মুখ ঘুরিয়ে পাশে তাকাল। অরুণা তাকে লক্ষ করছে। ‘দাদামণি আর দিদিমণির ছবি।’ অরুণা পরিচয় দিল ছবি দুটোর।
‘জানি’।
সে দ্রুত পায়ে কলঘরের দিকে এগোল। দালানের শেষ প্রান্তের ঘরটাকে বলা হয় ছোটো ঘর। তার ডান পাশের সরু পথ দিয়ে যেতে হয় কলঘরে আর পায়খানায়। দড়িতে ঝুলছে তিনটি শুকনো রঙিন তোয়ালে। সে তিনটিতেই নাক ঠেকিয়ে গন্ধ নিল। বিবির গায়ের গন্ধ কোনটিতে সে বুঝে উঠতে পারল না। ও চান করে বেরিয়ে আসার পর কলঘরটা ভরে থাকত যুঁইয়ের গন্ধে। এই গন্ধের সাবান ছাড়া মাখে না। তোয়ালেতেও গন্ধটা লেগে থাকত। কাল চন্দননগর গেছে চান করে, আজ গন্ধ থাকার কথা নয়।
কলঘরে নিকেলের রডে ঝুলছে একটা সাদা তোয়ালে, তাতে আনকোরা গন্ধ। সাবানদানিতে সাদা নতুন সাবানের নীচে আধ খাওয়া একটা গোলাপি সাবান। সে শাওয়ারের কলটা ঘুরিয়েই বন্ধ করে দিল। পাজামাটা শুকনো রাখা দরকার, এটা পরেই কলঘর থেকে তাকে বেরোতে হবে। চান করে পরার মতো কিছু অরুণা রাখেনি। বিবি কি ভুলে গেছিল একটা পাজামা রেখে দেবার কথা বলতে! কিন্তু তার পুরনো জামা প্যান্ট, জুতো কি এখনও পরার মতো অবস্থায় আছে?
মাথার উপর থেকে বৃষ্টির মতো জল ঝরে পড়ছে। সে চোখ বন্ধ করল। কানের পাশ দিয়ে জলধারা গড়িয়ে নামছে। কাঁধ, বাহু, বুক যেন শুষে নিচ্ছে খরা জমির মতো। মুখ তুলে সে জলের আঘাত চোখে, কপালে, গালে নিতে লাগল। রাত্রে নিয়মিত সে চান করত চুল না ভিজিয়ে। সারারাত পাখার তলায় ভেজা চুলে শুলে তার সর্দি হয়। হয়তো কাল তার সর্দি হবে।
কলটা বন্ধ করে সে নতুন সাদা সাবানটা তুলে দিয়ে শুঁকল। ল্যাভেন্ডারের গন্ধ। সেটা রেখে দিয়ে গোলাপিটা শুঁকল। জুঁই, এটা বিবি মাখে। একটু ইতস্তত করে সে গোলাপি সাবানটা গলায় ঘষল। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে অনুভব করার চেষ্টা করল, কিছু একটা তার মধ্যে ঘটে কি না। কিন্তু কিছুই ঘটতে শুরু করল না।
সাবানটা বুকে পেটে ঘষতে ঘষতে তার মনে পড়ল, সেদিনও তার দেহের কোষগুলো প্রবল সুখে ফেটে পড়েনি, আবেশে ঝিমিয়েও যায়নি। মনের মধ্যে শুধু একটা জ্বালা বোধ করেছিল। ষোলো বছর আগে এগারোই জুন শুক্রবার রাতে সে মেজোঘর থেকে এসেছিল কত্তার ঘরে। খাটে চতুর্থ জনের জন্য জায়গা হত না, তাই ছেলেমেয়ে নিয়ে বিবি এই ঘরে শোয়।
‘আজ থাক।’
‘বিবি প্লিজ।’ পাজামাটা খুলতে খুলতে সে বলেছিল।
‘কালকে বরং—’
‘কাল সকালে গোকুলানন্দে যাচ্ছি, রোববার বিকেলে ফিরব।’
‘ফিরে এসে বরং—’
‘না।’
অধৈর্য রুক্ষ স্বরটা বিবিকে বুঝিয়ে দিয়েছিল প্রত্যাখ্যান করলে আরও রূঢ়তা আসবে।
‘ওদের ঘুম যেন না ভাঙে।’
এ বাড়িতে তার জন্য বিবির ওটাই শেষ কথা। দু—হাতে অনিচ্ছুক ঊরুদুটো সরিয়ে তাকে নিজের জন্য জায়গা করতে হয়েছিল। আজও মনে আছে, তখন ঘুষি মেরে বিবির মুখটা থেঁতলে দিতে পলকের জন্য একবার ইচ্ছে করেছিল। প্রচণ্ড রাগ চেপে সে হিংস্রভাবে নিজের বিরাশি কেজি ওজন আছড়ে ছিল ওর নরম শরীরে। ওর ঠোঁট চাপা মুখ থেকে সে একটা শব্দ বার করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়, বিবি টুঁ শব্দটি করেনি। অন্ধকারের মধ্যেই সে ওর চোখের মণিদুটোকে পাথরের মতো কঠিন নিষ্পন্দ হয়ে থাকতে দেখেছিল। নিজের উপর অহেতুক একটা রাগ আর জ্বালা নিয়ে সে মেজোঘরে ফিরে আসে। ব্যাপারটা ধর্ষণ ছাড়া আর কিছু নয়, শেষ রাত পর্যন্ত জেগে থেকে এই চিন্তাটা যতই তার মাথায় ধুঁইয়েছে, ততই সে গ্লানিতে আচ্ছন্ন হয়েছে। বিবি তাকে কখনোই বোঝার চেষ্টা করেনি, তাকে দয়া দেয়নি।
