‘বাড়িতে তুমি একা, আর কোনো লোক নেই?’
‘বাইরের কাজের জন্য হেমন্ত আছে, নীচে থাকে। ওকে ডেকে দোব?’
‘থাক।’
বাইরের বারান্দার দরজাটা খোলা। সে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এখনও কারখানা ঘরে আলো জ্বলছে। জরুরি বড়ো অর্ডার থাকলে সারারাত সে কাজ করিয়েছে। নিজেও মিস্ত্রিদের সঙ্গে রাত জেগেছে। কিন্তু এখন কারখানাটা কে চালাচ্ছে, কে দেখাশোনা করে? বিবি? চালাবার মতো যোগ্যতা ওর আছে। বিবি খুব শক্ত আর হিসেবি, অলস নয়। ব্যবসাটা বড়ো নয়, তাহলেও চালাতে গেলে বিশ্বাসী লোক দরকার, অর্ডার ধরার জন্য নানান জায়গায় যেতে হয়। পার্টির কাছে থেকে টাকা আদায় একটা বড়ো সমস্যা।
এবার থেকে সে আগের মতো নিজেই কাজকারবার দেখবে। সে উত্তর থেকে দক্ষিণে বাগানের উপর দিয়ে চোখ বোলাল। পিছনের বাড়িগুলোর জানালায় আলো জ্বলছে। বাঁ দিকে শিবু বর্ধন লেনের সেই বাড়িটার জানালায় পরদা সরানো। বারান্দা থেকে সে চিঠি তুলে ইশারা করত সনতের বোন মিতাকে। পরে জেনেছিল ওর ভালো নাম সুমিতা। মিতা তখন ক্লাস সেভেনে, সে টুয়েলভে। একদিন মিতা বেদম মার খেল তার মায়ের হাতে। ওকে এলাহবাদে মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। কিছুদিন সে খুব মনমরা হয়েছিল, তারপর মিতাকে ভুলে গেল। কম বয়সে এই রকমই হয়, ক্ষীণ হাসি ফুটল তার চোখে।
ভালোই হয়েছে। দুজনের পক্ষেই ভালো। মিতা কোনোভাবেই বিবির ধারে—কাছে আসে না। সে বারান্দা থেকে ফিরে এসে টেবিলটার পাশে দাঁড়াল। একনজরেই সে বুঝল, পড়াশুনোর জন্য এটা ব্যবহৃত হয়। বইগুলো ফিজিক্সের। বিবি কেন যে এমএসসি পড়তে রাজি হল না, সেটা আজও তার কাছে রহস্য। বাবাও অনুরোধ করে বলেছিল, ‘আমাদের বাড়িতে এমএ তো দূরের কথা, গ্র্যাজুয়েট বউ—ঝিও নেই। ছোটো বউমা তুমি পড়তে চাইলে পড়ো।’ বিবি মুখ নামিয়ে বলেছিল, ‘দেখি।’
বিবি দেখেনি। বাবা মারা গেলেন। বিবিকে সে বলেছিল, ‘বাবার ইচ্ছেটা পূরণ করো।’ একই জবাব তাকেও দিয়েছিল। একটা খাতা তুলে মলাট দেখেই বুঝল, উচ্চচ মাধ্যমিক পরীক্ষার উত্তরপত্র। প্রায় ষাট—সত্তরটা খাতা। এগুলো এখানে কেন? বিবি স্কুলে বা কলেজে পড়াচ্ছে নাকি! সে দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা অরুণার দিকে তাকাল।
‘বউদি স্কুলে পড়ায়?’
‘কলেজে পড়ান।’
‘কতদিন পড়াচ্ছে?’
‘বলতে পারব না, আমি তো এসে তক দেখছি পড়াচ্ছেন।’
বিবি তাহলে এর মধ্যেই এম এসসি পাশ করেছে! আশ্চর্য, খবরটা তাকে জানায়নি! আরও কত কী সংসারে ঘটে গেছে কে জানে! বাড়িতে ঢুকে এই প্রথম সে একটা নাড়া খেল। তার মনে হল, বিবি ইচ্ছে করেই যেন স্বামী আর শ্বশুরকে অগ্রাহ্য করেছিল, আর সেটা বুঝিয়ে দিতেই ওদের অনুপস্থিতিটাকে কাজে লাগিয়েছে।
কিন্তু ব্যাপারটাকে সে এভাবেই বা দেখছে কেন? সংসারের প্রধান, একমাত্র পুরুষটি না থাকায় অবশ্যই স্ত্রী একা হয়ে পড়েছিল আর মানুষের সঙ্গ পাওয়ার জন্য তাকে তো বাড়ির বাইরে যেতে হবেই। এ বাড়িতে বড়ো জায়ের সঙ্গে বিবির ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তার বউদি বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় ছাড়া ব্রেসিয়ার পরে না।
কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য বিবি আবার পড়াশুনো শুরু করল তাতে অস্বাভাবিক কিছু খোঁজার মানে হয় না। কিন্তু চাকরি নিল কেন, টাকাপয়সার অভাবে? জেলে থাকার সময়, মামলা চালাবার খরচের জন্য সে তার যাবতীয় স্থাবর—অস্থাবর সম্পত্তি দেখাশোনার আর বিক্রি করার, পোস্ট অফিসের সার্টিফিকেট ভাঙানোর আর ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলার অধিকার সই করে বিবিকে দিয়েছিল উকিলের দেওয়া স্ট্যাম্প পেপারে। ব্যাঙ্কের নগদ টাকা, ব্যবসা আর গোকুলানন্দের চাষের যে জমিজায়গা, তার থেকে কত খরচ হয়েছে তিন বছর ধরে মামলা চালাতে? স্বামীর জন্য বিবি কি এমনই নিঃস্ব হয়ে গেল যে, তাকে চাকরি করতে হচ্ছে!
‘বউদির কলেজ কোথায়?’
‘বালিগঞ্জে।’
‘আমি এখন চান করব।’
সে ঝুলি থেকে খয়েরি ট্রাউজার্স আর সবুজ—সাদা ডোরাকাটা হাওয়াই শার্টটা বার করল। দরজিকে দিয়ে মাস ছয়েক আগে তৈরি করানো। তার অন্যান্য পোশাক, তোয়ালে, সাবান, আয়না, যা কিছু ছিল বিলিয়ে দিয়ে এসেছে। বিবি একটা পুরো—হাতা সোয়েটার বছর দশেক আগে কিনে দিয়েছিল। সেটার দশা দেখে কেউ নিতে চাইল না। জেলে রোজগার থেকে যা জমেছিল তার থেকে এত বছর ধরে খরচ—খরচা বাদ দিয়ে জেলার তাকে দিয়েছে সাতাশশো তেরো টাকা। আজ প্রায় চারশো খরচ হল। কত বছর পর সে এতটাকা অন্য লোকের হাতে দিল।
কাগজে মোড়া নোটগুলো বিছানার উপর রেখে সে বলল, ‘তোয়ালে আছে?’
‘কলঘরে নতুন তোয়ালে দেওয়া আছে।’
প্রত্যেকের জন্য আলাদা তোয়ালে, আলাদা চিরুনি এই বাড়ির নিয়ম। কলঘরের দরজার সামনে তোয়ালেগুলো দড়িতে ঝোলানো থাকে। চান করতে যাবার সময় যে যার নিজেরটা নিয়ে যায়, বেরিয়ে এসে আবার ঝুলিয়ে দেয়। প্রত্যেকটার আলাদা রঙ আর নকশা, ভুল হবার উপায় নেই।
‘তোয়ালে দিতে কে বলল, বউদি?’ কথাটা বলেই সে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকাল।
‘হ্যাঁ’। একটা হালকা বাতাস খেলে গেল তার বুকের মধ্যে। তার দরকারের দিকে বিবি সজাগ থাকবে, এটা তো স্বাভাবিকই। তাকে পাঞ্জাবি খুলতে দেখে অরুণা দরজা থেকে সরে দালানে গিয়ে দাঁড়াল।
