বিবি প্রতীক্ষা করছে একটা বোঝাপড়ার জন্য এবং সে জানে রাঘবেন্দ্র দত্তর বৈধ স্ত্রী, দুই ছেলেমেয়ের মা বোঝাপড়ার জন্য প্রতীক্ষা করতেই পারে।
দুই
ভিতর থেকে পায়ের শব্দ দরজা পর্যন্ত এল। তার মনে হল দরজার আই—হোল দিয়ে কেউ তাকে দেখছে। বিবি না অন্য কেউ? সে মুখ নামিয়ে অপেক্ষায় রইল।
দরজার দুটো পাল্লা ফাঁক করে যে দাঁড়িয়ে, তাকে সে কখনো দেখেনি। মাঝবয়সি এক স্ত্রীলোক। সিঁদুর নেই, থানকাপড়ে ঘোমটা দেওয়া উজ্জ্বল শ্যাম মুখ। চোখে সন্দিগ্ধ কৌতূহল।
‘কাকে চাই?’ নীচু গলায় প্রশ্ন করল।
‘বাড়িতে কেউ নেই?’ সে পালটা প্রশ্ন করল।
‘সবাই কাল চন্দননগর গেছে, আপনি?’
‘আমার নাম রাঘবেন্দ্র দত্ত।’ তার নাম শুনে প্রতিক্রিয়া কী হয় দেখার জন্য সে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রত্যাশিত চেনা নাম শুনলে যা হয় মুখে সেটাই ফুটে উঠল। সেইসঙ্গে একটা স্বস্তিও। বোধহয় তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। দরজার পাল্লা দুটো পুরো খুলে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল। সে ভিতরের চওড়া শ্বেত পাথরের দালানে পা রাখল।
ষোলো বছর পর নিজের আবাসে। বুকের মধ্যে একটা মোচড় দিল। এখন সে সত্যি সত্যিই তাহলে মুক্ত। এই মুহূর্তটার জন্য সে কতবছর যে অপেক্ষা করেছে। তার সারা শরীরের লোমকূপ থেকে উৎকণ্ঠা, প্রত্যাশা, উদবেগ আর হতাশা যে অবসাদ তৈরি করেছিল, তা যেন বাষ্প হয়ে বেরিয়ে তার চোখদুটোকে সজল করে দিচ্ছে। এবার সে নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে। কিন্তু বিবির চন্দননগরে যাওয়াটা কি খুবই জরুরি ছিল?
‘আপনি দুপুরে আসবেন তাই ভাত করে রেখেছিলুম।’
এ কে? দিনরাতের কাজের লোক? নিশ্চয় নিঃসন্তান, অনাথা বিধবা এবং ভদ্র গেরস্ত বাড়িরই, না হলে বিবি রাখত না। এর হাতে সংসার ছেড়ে দিয়ে চলেও যেত না। বিবির খুব কাছের লোক!
‘দুপুরে আসব কে বলল?’
‘বউদি বলেছিলেন।’
‘কোথা থেকে আসব বলেছে?’
মুখে থতমত ভাব। নিশ্চয়ই জানে সে জেল খেটে আসছে, নিশ্চয়ই জানে কেন সে জেলে গেছিল। সে মুখ থেকে চোখ সরিয়ে বাঁয়ে প্রথম ঘরের দিকে তাকল। এই ঘরটার নাম কত্তার ঘর। বাড়ির কর্তারা, তার ঠাকুরদা দ্বারিক দত্ত, বাবা অমিয় দত্ত এই ঘরে বাস করেছে, মারাও গেছে। ঠাকুরদাকে সে দেখেনি। দরজায় ফিকে হলুদ জমিতে হালকা খয়েরি চাকার মতো ছাপ দেওয়া পরদা। পুকুরের জলে ঢিল ফেললে চক্রাকার তরঙ্গ যেমন বাড়তে বাড়তে পাড়ের দিকে যায়, সেই রকম। দরজার দু—পাশে দুটো জানালারও একই কাপড়ের পরদা। দালানের দুটো টিউব আলোই জ্বলছে। এই উজ্জ্বলতার মধ্যে চক্রাকার তরঙ্গগুলো যেন জীবন্ত হয়ে তার বুকের মধ্যে আর একটা তরঙ্গ তুলল। তার মনে হল সব কিছুই ঠিক আছে, চিন্তার কিছু নেই। তার নিজের জায়গা তাকে আগের মতোই গ্রহণ করবে।
দালানের ডান দিকে কাঠের ফ্রেমে তিন রঙের ঘষা কাচ বসানো টানা লম্বা জানালা। আটটা ছোটো ছোটা পাল্লা। খুললেই নীচে উঠোন, উলটোদিকে একইরকম কাচ বসানো দাদার দালান। রোদ যখন পশ্চিম থেকে আসে, এই দালানটা তখন রঙিন হয়ে যায়। সে আবার বিকেলের দালানকে ফিরে পাবে।
‘চন্দননগর কেন গেল?’
‘বউদির ভাইঝির মুখে ভাত।….আপনার ভাত তোলা আছে, গরম করে দোব?’
‘পরে। জানলাগুলো বন্ধ কেন?’
‘বউদি বলে গেছেন।’
‘তোমার নাম কী?’
‘অরুণা।’
‘কতদিন এখানে আছে?’
‘দু—বছর।’
‘আগে কোথায় ছিলে?’ কথাটা বলে সে এগিয়ে গেল। পরদাটা সরিয়ে ঘরের ভিতরে তাকাল। আলো নেবানো, সে ডান হাত দিয়ে দরজার পাশের দেওয়ালে তৃতীয় সুইচটা খুঁজে নিয়ে টিপল। হুবহু সেই ষোলো বছর আগের ঘর। পুবের দেওয়ালে বাবা—মার ছবি একই জায়গায়। মেহগনির খাটটা নড়াতে কম করে চারজন জোয়ানের দরকার। ওটাও একই জায়গায়। তবে একটু—আধটু অন্যরকম এতদিনে যে হবে, এটা সে ধরেই রেখেছে। বেডকভারেও হলুদ—খয়েরি। তার নীচে দুটো মাথার বালিশ। নিশ্চয় বিবি আর গুলুর। আয়না লাগানো আলমারিটা বাঁ দিকে উত্তরের দেওয়ালে সরানো হয়েছে আর সেই জায়গায় একটা কাঠের টেবিল। তার উপর কয়েকটা বই, টেবল ল্যাম্প, প্রচুর খাতা, কাঠের গ্লাসে রঙিন পেনসিল ও কলম আর একটা হাতল—ছাড়া চেয়ার। এগুলো নতুন। টিভি সেটটা এই ঘরেই ছিল, সেটাই শুধু নেই।
‘আগে কোথায় ছিলে?’ সে অরুণার মুখের দিকে তাকাল।
ঘোমটা বাড়িয়ে দিয়ে অরুণা বলল, ‘বাপের বাড়ি। আগে কোথাও কাজ করিনি।’
সে কাঁধ থেকে থলিটা নামিয়ে সেটা বিছানার উপর ছুড়ে দিয়ে পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে শুরু করল।
‘আপনি ভাত খাবেন তো?’
‘আগে চান করব।’
সে বিছানায় বসল। শিমুল তুলোর চার ইঞ্চি পুরু গদির উপর দুটো তোশক। তার সারা দেহ কয়েক সেকেন্ড থরথর করেই স্তিমিত হয়ে এল। দু—হাতের চেটো বিছানায় আলতো বোলাতে বোলাতে সে হাসল। তার পরিচিত আরাম এবার সে পেল, এবার থেকে পাবে। চেটো দুটো সে দুই গালে চেপে ধরে দেখল, দরজা থেকে অরুণার কৌতূহলী নজর।
‘খুব অবাক লাগছে?’
অপ্রতিভ হয়ে অরুণা মুখটা পাশে ফেরাল। সে দেখল, যাই যাই করেও তারুণ্য ওর ঠোঁটে চিবুকে আর চোখে এখনও হালকাভাবে লেগে আছে। রাতে এই বাড়িতে আমরা দুজনেই শুধু থাকব, এমন একটা পরিস্থিতি রেখে দিয়ে বিবি ছেলেমেয়ে নিয়ে চন্দননগর চলে গেল কেন? এটা কি ইচ্ছে করে? সে অরুণার দিকে সোজা তাকাল।
