সবই তো একই রকম রয়ে গেছে। এক ধরনের ভরসা সে এবার অনুভব করল। চোখে, নাকে, কানে তো অভ্যস্ত জিনিসগুলোই পৌঁছল। তাহলে কি সে তার আগের জায়গাতেই ফিরে এসেছে? ছাব্বিশ নম্বর বাড়িও একই রকম হয়েছে? হয়তো রয়েছে। তার ষোলো বছর না থাকায় কতটকু বদলাতে পারে? গুলু গোরা বড়ো হয়ে উঠেছে, তাদের দেখলে সে চিনতে পারবে না। বিবি একদিনও আলিপুরে ওদের নিয়ে যায়নি। ওদের কাছে বাবা অপরিচিত মানুষ।
পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে বিবির সঙ্গেও কি তার পরিচয় হয়েছে! দিদির শ্বশুরবাড়ি চন্দননগরে, বিবির মামার বাড়ির পাড়ায়। সাহেবদের মতো গায়ের রঙওয়ালা, লম্বা—চওড়া ভাইয়ের জন্য মানানসই মেয়ে খোঁজার দায় দিদিই নিয়েছিল। জাহ্নবী তারই আবিষ্কার। সুন্দরী হওয়ার জন্যই ডাকনাম ‘বিবি’। টকটকে না হলেও গৌরাঙ্গী। টানা চোখ, কালো মণি। পাশাপাশি দাঁড়ালে বিবির মাথা তার কানের নীচে পৌঁছয়, সাড়ে পাঁচ ফুটের মতো লম্বা আর যে দেহ—গড়ন পাওয়ার জন্য মেয়েরা ব্যায়াম করে, খাওয়ার বাধ্যবাধকতা মেনে চলে, বিবি তার কিছু না করেই তেমন একটি দেহ পেয়েছে। দিদি বলেছিল, ‘মেয়ের গড়ন—পেটন যেমন, তেমনই মেঘের মতো চুল!’ কোমর ছাড়ানো ঘন চুল। মাথাটা হেলিয়ে বিবি যখন চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতো তখন সে তাকিয়ে থাকত। একদিন সে বলেছিল, ‘এ তো দেখছি চুলের ঝরনা! মেয়েরা কেন যে চুল কেটে ছোটো করে!’ চিরুনি থামিয়ে ও বলেছিল, ‘আমার তো কেটে ফেলতে ইচ্ছে করে।’ সে জবাব দিয়েছিল, ‘আমাদের বাড়িতে মেয়েরা চুল কাটে না।’ বিবির ভ্রূ কুঁচকে উঠেছিল কথাটা শুনে।
তাদের দুজনের জীবন যেন দুটি স্তরে বসানো। কেউ কারও মনের গতিবিধির খবর জানে না। জানার জন্য বিবির তরফ থেকে কখনো আগ্রহ প্রকাশ পায়নি। ওর সঙ্গে কোনোদিনই তার পরিচয় হয়নি। ওকে কখনো সে নগ্ন দেখেনি, বিছানাতেও নয়। রুটিনমাফিক সম্পর্কের বাইরে বিবি কখনো যায়নি।
ছাব্বিশ নম্বরের ফটক থেকে সে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে থমকে পড়ল। ধুতি আর শার্ট পরা একটি লোক বেরিয়ে আসছে। কে হতে পারে? ধুতির বহর দেখে মনে হচ্ছে কোনো চাকর। দুলাল নয়। এত দিনে তার বয়স সত্তরের কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু এর চলন অল্পবয়সিদের মতো। লোকটি তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার তাকাল মাত্র। সে একে আগে দেখনি।
পথের ডান দিকে বাড়ি, বাঁ দিকে পাঁচিল। পথটা সোজা গেছে বাগানে। কিন্তু তার আগেই ডান দিকে ঘুরে পথটা পৌঁছেছে বিরাট সদর দরজায়। বাগান অর্থে চারটে টেনিস কোর্ট হওয়ার মতো ঘাসের জমি। তার পুব দিকের পাঁচিল ঘেঁষে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। কামিনী, টগর আর শিউলির গাছ ছিল, কিন্তু সেগুলো কেটে ফেলতে হয়েছে তার স্টিল ফার্নিচারের কারখানা বসাবার জন্য।
সদর দরজার মাথায় আলোটা জ্বলছে। তাতে বাগানের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। প্রায় এক কাঠা জমিতে অ্যাসবেসটসের চালার কারখানাটি তিনটি ঘর নিয়ে। কাজ এখন হচ্ছে না কিন্তু একটি ঘরের দরজা খোলা, আলো জ্বলছে। ভিতরে থেকে কথার শব্দ আসছে। মিস্ত্রিরা এখনও বাড়ি যায়নি।
সদর খোলা। একতলায় সব সময় চাকর থাকে কিন্তু এখন নেই। দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা বড়ো ঘর। সেখানে কাঠের গোলাকার একটা বড়ো টেবিল, বেঞ্চ আর তিনটে চেয়ার। এটা বৈঠকখানা নয়, সম্মান দেবার মতো নয় এমন লোকেদের সঙ্গে দেখা করার ঘর। এই ঘরের ডানদিকে ভিতরের উঠোনে যাবার দরজা, তার পাশেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। ঘরের বাঁ দিকে বৈঠকখানা। ভিতরে উঠোন ঘিরে নীচু দালান, তার পাশে পাশে দুটো রান্না ঘর, কল—পায়খানা, কাজের লোকেদের থাকার ঘর।
অদ্ভুতভাবে নিঃশব্দ বাড়িটা। সে ভাবল এটা কি তার জন্যই? আজ সে খালাস পেয়ে বাড়ি ফিরবে এটা নিশ্চয় দাদা, বউদি, ছেলেমেয়েরা, বিবিকে লেখা তার চিঠি মারফত জেনে গেছে। কিংবা বিবি কাউকেই জানায়নি। দেখা করতে যাওয়া বন্ধ করার পর সে আটটা চিঠি দিয়েছিল। প্রথম দুটোর দায়সারা উত্তর পাওয়ার পর আর জবাব পায়নি। বিবি বাড়ির লোকেদের সম্পর্কে একটি কথাও লেখেনি। শুধু, ‘আমরা সবাই ভালো আছি। আশা করি তুমিও ভালো আছ।’
একতলার ভিতর থেকে কাপড় কাচার অস্পষ্ট শব্দ আসছে। কান পেতে দোতলার পিছন মহলে তার দাদা গোপেন্দ্রর ঘর থেকে হিন্দি সংলাপ ক্ষীণভাবে শুনতে পেল। বোধহয় টিভি—তে সিরিয়াল হচ্ছে। সদর ঘরের উপরেই বড়ো, মাঝারি আর একটা ছোটো—তিনটি ঘর আর চওড়া একটা দালান নিয়ে তার মহল। দুটো ঘরের সঙ্গে জুড়ে বাইরের বাগানের দিকে জাফরি—কাটা রেলিংয়ের টানা বারান্দা। সদর দিয়ে ঢোকার সময় বারান্দায় সে আলো দেখেনি।
সিঁড়ি দিয়ে সে দোতলায় উঠে এল। শেষ ধাপের পর একটা চৌকো জায়গা। সামনের দরজাটা তাদের, ডান দিকেরটা দাদার। সিঁড়ির দেওয়ালে কয়েক ধাপ অন্তর চারটে নিগর্স—চিত্র, সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো। ফ্রেমের রঙ কালো হয়ে গেছে, কাচে ময়লা জমে ছবিগুলো অস্পষ্ট। এগুলো পরিষ্কার রাখার দায়টা যৌথ, কেননা সিঁড়িটা সবাই ব্যবহার করে। পরিষ্কার করার কাজটা সে দুলালকে দিয়ে করাত। ছবিগুলো নোংরা হয়ে রয়েছে, সে ধরে নিল দুলাল আর এই বাড়িতে নেই।
সামনের দরজাটা বন্ধ। সন্তর্পণে দরজার কড়া ধরে সে ঠুকঠুক শব্দ করল। ভিতরের প্রথম ঘরটাই ছিল বাবা—মার। তারপর তার আর বিবির, এখন সম্ভবত শুধুই বিবির। ওর কান খুব সজাগ। যদি ঘরে থাকে তাহলে এই ঠুকঠাক শব্দটুকুই শুনতে পাবে। জানে আজ সে ছাড়া পাচ্ছে সুতরাং বিবি প্রতীক্ষা করছে। তবে গত চারবছর যে তার সঙ্গে দেখা করেনি, চিঠিরও উত্তর দেয়নি, তার প্রতীক্ষাটা স্বামীর সঙ্গে ষোলোবছর পর মিলনের আশায় উচাটন মন, অধীরা বিরহিণীর মতো যে হবে না, এটা সে জানে। মনের গভীরে ভয় মেশানো একটা অস্বস্তি সে বোধ করল।
