এই সেই লোক। কিন্তু ঘটনাটা কম করে পঁয়ত্রিশ বছর আগের, তার মধ্যে সে লোকটিকে একবারও দেখেনি। হয়তো লোকটি তাকে দেখেছে, বহুবারই। ছ—ফুট দু—ইঞ্চি, টকটকে রঙ, কটা চোখ, চওড়া কাঁধ, এসব কি সহজে ভুলে যাওয়া যায়! লোকটি একটি বিড়ি ধরিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসল। চিনতে পারেনি, জায়গাটা অন্ধকারও। এবারে উঠে পড়া যাক।
রঘু, যার পোশাকি নাম রাঘবেন্দ্র, তখন হনুমানজি পার্ক থেকে বেরিয়ে আসে। সে পার্কের ফটক দিয়ে না বেরিয়ে রেলিংয়ে যেখানে একটা শিক উপড়ে মানুষ গলে যাওয়ার জন্য ফোকর করা, সেখান থেকে বেরোল। পার্কের ফটকে ফুচকা আর উনুনের উপর পিতলের থালায় রাখা ঘুগনি বিক্রি হচ্ছে। চল্লিশ বছর আগেও সে এদের দেখেছে তবে তখন অন্য লোক বিক্রি করত। যদুপতি একটা টিনের বাক্স নিয়ে ফটকের পাশে বিকেলে বসত। তার মধ্যে গোল দুটো ডিব্বায় থাকত শুকনো ঘুগনি আর ঘন ঝোলের আলুর দম। চাপড়া চিংড়ির চপ আর কাগজের মতো পাতলা মামলেটও তার কাছে পাওয়া যেত। যদুপতির কালো চুল সে আধ—পাকা হয়ে যেতে দেখেছে। অন্তত পঁচিশ বছর ধরে সে এই পাড়ার ঘুগনিওয়ালা ছিল। সন্ধ্যার পর টহল শুরু করত। ছাব্বিশ নম্বরের ফটকের কাছ থেকে মুখটা বেঁকিয়ে যদুপতি ‘ঘউগ….নিইই’ বলে হাঁক দিলেই সে তার প্রাইভেট টিউটর উমাপদবাবুর মুখের দিকে তাকাত। তিনি তখন মাথা হেলিয়ে বলতেন, ‘দেরি কোরো না।’ সে তখন ছুটে বেরিয়ে আসত ফটকে আর ফিরে যেত চার পাতা ঘুগনি হাতে নিয়ে। দুটো পাতা উমাপদবাবুর জন্য। একদিন দেশের বাড়ি থেকে খবর এল, একমাত্র ছেলে সাপের কামড়ে মারা গেছে। তিনি সেই যে দেশে গেলেন আর ফিরে আসেননি।
ধরদের রকে একটা স্টেশনারি দোকান হয়েছে। প্রথমবার সামনে দিয়ে যাবার সময় এটা সে লক্ষ করেনি। বড়োজোর আড়াই হাত চওড়া, দু—হাত লম্বা। দোকানি একটি সুশ্রী যুবক। সামনে একটা কাচের শো—কেস, তার উপর সার দিয়ে কাচের জার। নানান রঙের প্যাকেট দেওয়ালে আর দোকানের সামনে ঝোলানো। নড়াচড়ার জন্য দু—হাত জায়গাও নেই। একটা টুলের উপর বসে বা দাঁড়িয়ে এই পঁচিশ—ছাব্বিশ বছরের ছেলেটি দিনে কত ঘণ্টা কাটায়! আট? দশ? সে জেলে গেছিল বত্রিশ বছরে। সেখানে হাঁটা চলা দৌড়বার জায়গার অভাব ছিল না। ছেলেটি এই দু—হাত জায়গায় নির্বাসিত থাকবে কত বছর? দোকানের উলটো দিকের বাড়ির দরজায় সালোয়ার—কামিজ পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। হয়তো অকারণেই।
রাস্তায় লোক চলাচল কম। যারা সামনে দিয়ে আসছে,তাদের কাছ থেকে না—চেনা আলতো একটা চাহনি ছাড়া আর কিছু সে পেল না। হাতঘড়িতে সে সময় দেখল সাড়ে আটটা। এখন বিবি গোরা গুলুরা কী করতে পারে? হারমোনিয়ামের মতো দেখতে একটা টিভি সেট সে কিনেছিল। তখন টিভি রঙিন হয়নি। জেলে সে রঙিন দেখেছে। বিবি এতদিনে নিশ্চয়ই পুরনো সাদা—কালোটা বাতিল করে রঙিন কিনেছে। ওরা এখন কি টিভি দেখছে? কিন্তু বিবি কি দেখতে দেবে? এখন তো পড়াশুনোর সময়। পড়ার ব্যাপারে বিবি খুব সিরিয়াস। ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে বি এসসি। পরীক্ষার মধ্যেই ওর বাবার স্ট্রোক না হলে ফার্স্ট ক্লাস হয়তো পেত। বাবা সামলে উঠেই মা—মরা মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এক মাসের মধ্যে বিয়ে দিলেন। দেওয়াটা উচিত কী অনুচিত হয়েছে, তাই নিয়ে সে বিবিকে একবার জিজ্ঞাসাও করেছিল, ‘আমার মতো এক অর্ডিনারি বিএ—র সঙ্গে তোমার বিয়ে হওয়াটা উচিত হয়নি।’ বিবি নিরাসক্ত গলায় বলেছিল, ‘তাহলে কার সঙ্গে বিয়ে হলে উচিত হত?’ সে চট করে বিবিকে জবাব দিতে পারেনি। শুধু বলেছিল,’তুমি আমার থেকে অনেক বেশি রিফাইনড, শিক্ষিত।’ বিবির ভ্রূ কুঁচকে উঠেছিল শুনে। ওই কোঁচকানোর অর্থটা সে কোনোদিনই ধরতে পারেনি, এখনও নয়।
ছাব্বিশ নম্বরের ফটকের সামনে দ্বিতীয় বার পৌঁছে সে আগের মতো ফিরল না। বেঁকে যাওয়া সূর্য গাঙ্গুলি স্ট্রিট ধরে আরও এগিয়ে গেল। একশো মিটার গেলে একটা ভাঙা শিব মন্দির, তারপর আশুর তেলেভাজার দোকান। আর একটু এগোলে কচুবাগান বস্তি, নারান পণ্ডিতের পাঠশালা, তারক স্যাকরার দোকান, রেশন দোকান, চুল কাটার দোকান।
নতুন কিছুই চোখে পড়ল না, শুধু পুরোনোগুলো আরও পুরোনো হয়েছে। শিবুর দোকান বন্ধ রয়েছে, অথচ বিকেল থেকেই ভিড় লেগে যেত মোচার চপের জন্য। শিবু কি মরে গেছে! নারান পণ্ডিতের পাঠশালা ঘরে কারা ড্রাম আর অ্যাকর্ডিয়ান বাজিয়ে হিন্দি ফিল্মের গান চর্চা করছে, তার মধ্যে মেয়ের গলাও সে পেল। সন্ধের পর হয়তো ভাড়া নেয় ঘরটা। গান শোনার জন্য দরজায় ভিড়। স্যাকরার দোকানের মাঝামাঝি লোহার গরাদ দিয়ে ঘরটা দু—ভাগ করা। আগে এটা ছিল না। গরাদের ওপারে মাথা নীচু করে হাতুড়িতে ঠুকঠাক করে যাচ্ছে একজন। তারক স্যাকরার ছেলে বলাই, তার সঙ্গে স্কুলে পড়েছে। আশ্চর্য, এত বড়ো টাক—এর মধ্যে ওর হল কী করে! বলাই তাকে নিশ্চয়ই চিনতে পারবে।
সে দ্রুত পা চালাল। শুভ্রা সেলুনে গেঞ্জি গায়ে, লুঙ্গি পরা একজনকে দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছে অল্পবয়সি ছেলে। প্রৌঢ় মালিক বাইরের রকে চেয়ারে পা তুলে বসে। এখানে কখনো সে চুল কাটেনি দাড়ি কামায়নি। লোকটা তাকে চেনে না। সেলুনের উলটোদিকের বাড়ির জানালার নীচে কালী মহাদেব আর কৃষ্ণ—নানা রঙ দিয়ে দেওয়ালে আঁকা। লোকের পেচ্ছাপ করা বন্ধের অব্যর্থ দাওয়াই! হলুদ রঙের মোটর গাড়ির সাইজের একটা আবর্জনা ভরা লোহার বাক্স রাস্তায় বসানো। তার পাশের ঢাকনা খোলা। সেখান থেকে উপচে রাস্তায় পড়ে আছে আবর্জনা। আঁশটে বাসি গন্ধ ঠেলে তার আর এগোবার ইচ্ছে হল না।
