তারা একই শয্যায় শোয় কিন্তু অনন্তের মনে হয় রেবতী বহু মাইল দূরে, তারা কথা বলে কিন্তু পরস্পরকে যেন বোঝাতে পারে না। বিয়ের এগারো দিন পর অন্য দিনের থেকে একটু আগেই বিকেলে বাড়ি ফিরে অনন্ত দেখল দরজায় তালা দেওয়া। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চায়ের দোকানে গিয়ে বসল। আলুর দম—রুটি খেয়ে খবরের কাগজ নিয়ে সময় কাটাতে লাগল।
রেবতীকে দূর থেকে সে দেখতে পেল দ্রুত হেঁটে আসছে। ওর মেরুন—সবুজ তাঁতের শাড়িটা তারই কেনা। হাতে চামড়ার ছোটো ব্যাগটা। কিন্তু একটা কালো অ্যাম্বাসাডার থেকে যে রেবতী নামল সেটা তার চোখ এড়ায়নি। সে চেষ্টা করল দেখতে মোটরে কে আছে, কিন্তু দেখতে পেল না। গাড়িটা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল।
আশেপাশে না তাকিয়ে রেবতী হাঁটে। ও ঠিকই জানে বহু চোখ তাকে দেখছে। গ্রাহ্যের মধ্যে আনে না, চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে সে চলে গেল। তখন বাড়িমুখো চা—পিপাসু এক অফিস ফেরত অশ্লীল শব্দ করে হাই তুলল। অনন্ত মাথাটা নামিয়ে দিল কাগজে।
হাতঘড়িতে সে দেখল পনেরো মিনিট পেরিয়ে গেছে রেবতী চলে যাওয়ার পর। ঘড়িটা সে বিয়ের দু—দিন পর কিনেছে। বাবার কেনা ওয়াল ক্লকটা আজও নিখুঁত সময় দিয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে সময় জানতে তার অসুবিধা নেই, বাইরে প্রায় প্রত্যেকের হাতেই ঘড়ি। দরকার হলে সে জিজ্ঞাসা করে নেয়। তাই ঘড়ি কেনার জন্য ‘বাজে খরচের’ দরকার তার হয়নি। এখনও দরকার হয় না, তবু কিনেছে। উপরের কাকিমা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি থেকে কী কী দিল?’
প্রথমেই সে বলে ফেলেছিল, ঘড়ি। তাই সে ঘড়িটা কিনে ফেলল। রেবতীর ঘড়ি আছে। তবু তিনশো টাকায় তাকে একটা কিনে দেয়।
অনন্ত যখন ফিরল রেবতী তখন চা করছে। শার্টটা খোলার পর গেঞ্জিটা খুলতে গিয়েও খুলল না। বাড়িতেও গেঞ্জি পরে থাকা সে শুরু করেছে বিয়ের পর।
‘চা আমাকেও একটু দিয়ো।’
‘এই ফিরলে?’
‘হ্যাঁ।’
কেন যে মিথ্যা কথাটা বলল তা সে জানে না। আপনা থেকেই মুখে এসে গেল।
‘কী করলে সারা দুপুর?’
রেবতী উত্তর দেবার আগে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চাউনিটা তুরপুনের মতো, ঘুরতে ঘুরতে তার মনের মধ্যে গর্ত করে যাচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে প্রশ্নের পিছনের উদ্দেশ্যটা দেখা যাবে। অনন্ত তার মুখটাকে নির্বিকারে করে রেখে দিল, হাতে চায়ের কাপ নেবার সময়।
‘কিছুই তো করবার নেই। তাই একবার বাড়ি থেকে ঘুরে এলাম। মা—র মাথার যন্ত্রণাটা খুব বেড়েছে, ডাক্তার দেখাতে হবে মনে হচ্ছে।’
‘স্পেশালিস্ট দেখানোই ভালো।’
‘অনেক টাকার ধাক্কা।’
‘টাকার জন্য ভাবতে হবে না।’
রেবতী তাকাল এবং মিষ্টি করে হাসল। অনন্ত উত্তেজনা বোধ করে অথবা বহুদিন পর সাংসারিক দায়িত্বের স্বাদ পেয়ে, যেটাই হোক, বলল, ‘মাথার ব্যথার কখনো অবহেলা করতে নেই। স্পেশালিস্ট কত আর নেবে…পঞ্চাশ, একশো, দু—শো? অবহেলা যদি না করা হত তা হলে আমার মায়ের ক্যানসার গোড়াতেই ধরা পড়ত। কালই আমি খোঁজ নেব। আমাদের মালিক সমীরেন্দ্র বসুমল্লিককে যে ট্রিটমেন্ট করেছিল তার কাছেই বরং যাব।’
‘এত তাড়াহুড়োর দরকার কী…একটু বাজারে যাবে, ঘি, গরম মশলা ফুরিয়েছে। কপিটা আজই রেঁধে ফেলি।’
রাতে অন্যদিনের মতো রেবতী আজ বাঁ দিকে না ফিরে অনন্তের দিকে কাত হয়ে শুল। কিছুক্ষণ পর তার বাঁ হাত অনন্তের বুকের উপর পড়ল। সে নিশ্বাস চেপে শক্ত হয়ে শুয়ে রইল। এই প্রথম রেবতী তাকে স্বেচ্ছায় স্পর্শ করল, এটা কীসের আভাস দিচ্ছে?
সে প্রায় চুপিসারে তার ডান হাত বিছানা থেকে এমনভাবে বুকের দিকে আনতে লাগল যেন রেবতীর হাতটা একটা পাখি, সামান্য নড়াচড়া টের পেলেই উড়ে যাবে।
ধীরে ধীরে সে তা রাখল রেবতীর আঙুলের ওপর। মুঠিতে চাপ দিল এবং হাতটায় টান দিয়ে কাছে আসার জন্য ইঙ্গিত করল।
বাহুতে ভর দিয়ে মাথাটা সামান্য তুলে রেবতী ঝুঁকে পড়ল এবং অনন্তের ঠোঁটের উপর আলতো চুমু দিল।
অনন্ত সংবিৎ হারানোর আগে বুকের মধ্যে প্রচণ্ড চিৎকার শুনতে পেল। একটা অস্থিরতা তার শরীরটায় দাপিয়ে যাচ্ছে। একটা দুর্লভ চূড়ায় সে উঠবে। সেখান থেকে তার জীবনের পিছন দিকে একবার মাত্র সে তাকাবে।
রেবতী মাথাটা সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। অনন্ত দু—হাতে তাকে জাপটে ধরল।
‘নাহ।’
‘হ্যাঁ।’
রেবতী চেষ্টা করল অনন্তর মুঠি আলগা করতে। অনন্ত হুড়মুড় করে তার বুকের উপর ভেঙে পড়ল, এলোপাথাড়ি চুমু দিতে লাগল ওর গালে, গলায়, বুকে।
‘না আ আহ, কী ছোটোলোকমি হচ্ছে!’
রেবতীর নখ বসে গেছে অনন্তের ঘাড়ে। সে কিছুই বোধ করছে না শুধু একটা অন্ধ রাগ ফুঁসে উঠছে তার মাথার মধ্যে।
‘আমি তোমার স্বামী।’
‘তাতে কী হয়েছে!’
‘তা হলে বিয়ে করলে কেন?’
‘শুধু এইজন্যই বিয়ে করা?’
‘এটাও একটা কারণ।’
‘একটা নয়, তোমার কাছে এটাই একমাত্র কারণ।’
রেবতীর স্বরে তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া রয়েছে। অনন্তের ইচ্ছা করছে ঘুসি মেরে মেরে ওর মুখটাকে থেঁতলে দিতে।
‘তোমার একটা মেয়েমানুষের শরীর দরকার, যে—কোনো, যেমন—তেমন, মেয়েমানুষ।’
অন্ধকারে মূঠো করা অনন্তের হাতটা উঠেছিল, সেটা দেখতে পেলে রেবতী হয়তো কথাগুলো বলত না। কয়েক সেকেন্ড পর হাতটা মন্থরভাবে নেমে গেল।
মাত্র এগারো দিন তাদের বিয়ে হয়েছে। অনন্তের মনে হচ্ছে, তারা আর মিলতে পারবে না। বোকার মতো সে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। চল্লিশটা বছর কেটেছে যেভাবে বাকি জীবন সেইভাবেই নয় কেটে যেত।
