বিবি গত চার বছর একবারও দেখা করতে আসেনি। সেজন্য তার কোনো দুঃখ, ক্ষোভ বা মর্মবেদনা হয়নি। তার ধারণা সে অনেক বদলে গেছে মানসিকভাবে। এখন সে বুঝতে পারে অন্য মানুষের অনুভবকে, এখন সে ধৈর্য ধরতে, সহ্য করতে এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। কিন্তু এর কোনোটাই পরীক্ষিত হয়নি। এবার হবে।
কীভাবে তাকে ওরা গ্রহণ করবে? তার মেয়ে গুলু, তখন ছিল চার বছরের। এখন সে কুড়ি। তার ছেলে গোরা, তখন ছিল দু—বছরের, এখন সে আঠারো, দুজনকে সে ষোলো বছর চোখে দেখেনি। পুরোপুরি আসা বন্ধ করার আগে বিবি যখন এক—দেড় মাস অন্তর দেখা করতে আসত, তখন সে একবার বলেছিল, ‘গুলু আর গোরার ভালো নাম কিছু রেখেছ?’ বিবি বলেছিল, ‘এখনও কিছু রাখিনি।’ ‘আমি কী রাখব?’ খুব সন্তর্পণে সে বিবির কাছে অনুমতি চেয়েছিল। পরে বুঝেছিল সে ভয় পাচ্ছে, যদি প্রত্যাখ্যাত হয়! নামকরণের অধিকারটা এখনও তার দখলে আছে কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। এক ধরনের কাঠিন্য আর জেদ বিবির মৃদু স্বভাবের আড়ালে প্রচ্ছন্ন থাকে। নিমেষে সেটা কখন যে প্রকাশ্যে আসবে তা কেউ জানে না। বিবি বলেছিল, ‘ছেলেমেয়ের নাম রাখবে, তুমি!’ বিবির চোখ থেকে সে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল। অদ্ভুত একটা ঝাঁঝ ছিল বিবির বিস্ময়ের মধ্যে। ‘ওদের একবার আনবে? দেখব।’ কর্কশস্বরে উত্তর পেয়েছিল, ‘না’।
এবার বিবির সামনে গিয়ে তাকে দাঁড়াতে হবে। ইডেন গার্ডেনস থেকে হনুমানজি পার্ক, তার মধ্যে সে নতুন পাঞ্জাবি, গেঞ্জি, পাজামা, চটি এবং ঝুলিটা কিনেছে। একটা চিনা খাবারের দোকানে পেট ভরে চাওমিয়েন আর চিংড়ি মাছ ভাজা খেয়েছে। দোকানের টয়লেটে হাত ধোবার সময় আয়নায় চুল আঁচড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তার মনে হয়েছিল, দাড়িটা রেখে ঠিক কাজই করেছে, তাকে চেনা যাচ্ছে না। তাকে রাশভারি দেখাচ্ছে। তামাটে চামড়ার সঙ্গে কটা চোখ, ঘন ভুরু। কানের উপর, জুলফিতে আর চওড়া চোয়ালের নীচে পাকা চুলের সাদা ছোপ—ধরা কালো দাড়ি তার মুখটাকে বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিকের মতো গম্ভীর করে দিয়েছে। কিন্তু সে নিজেকে হাসিখুশি, উৎফুল্ল একটা সহজ মানুষ হিসাবে সমাজে, বাড়িতে, ছেলেমেয়েদের এবং বিবির কাছে ফিরে আসতে চায়।
চোখ দুটিকে উজ্জ্বল দেখতে চেয়ে সে মণিদুটিকে স্ফীত করেছিল। কপালে তখন তিনটে ভাঁজ পড়ে, আয়নার কাছে মুখ এগিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকায়। তার মনে হয়েছিল আগের সেই ঝকঝকে ব্যাপারটা যেন আর নেই। দুশ্চিন্তায় স্তিমিত দুটো চোখ যা তার কাছে নতুন, এরপর সে বুকটা সামনে ঠেলে টানটান হয়ে দাঁড়ায়। ছ—ফুট দু—ইঞ্চি, বিরাশি কেজি ছিল ষোলো বছর আগে। এখনও তাই আছে বলেই তার মনে হয়। ওজনটা হয়তো একটু বেড়েছে, পেটটা একটু উঁচু হয়ে উঠেছে। তা হোক, সে ঝুঁকে পড়েনি বয়সের ভারে। গৌরবর্ণ টকটকে গায়ের রঙ আর নেই। সেজন্য তার মনে কষ্ট নেই। পঞ্চাশের কাছাকাছি হতে যাচ্ছে বয়স। জীবনের একটা এলাকা ছেড়ে দিয়ে আর একটা জমিতে পা রাখতে চলেছে, সেখানে গায়ের রঙ দিয়ে সে কিছু লাভ করবে না।
হনুমানজি পার্কে বেঞ্চে বসে থাকার সময় তার মনে হয়েছিল, এখানকার কিছুই বদলায়নি। বাড়িগুলো একই চেহারায় রয়ে গেছে। অবশ্য ষোলো বছরে বদলাবেই বা কীভাবে। চল্লিশ বছর আগেও সে বাড়িগুলোকে এই রকমটিই দেখেছিল। হয়তো কোনোটার গায়ে কলি পড়েনি, দেওয়ালে অশ্বত্থ বা বটের চারা, জানালার পাল্লা কবজা থেকে ঝুলে গেছে, বারান্দায় পার্টিশান হয়েছে, সদর দরজার চৌকাঠটা আর একটু ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু এগুলোকে বদল বলা যায় কী? ঘেঁষাঘেঁষি বাড়িগুলোর কাঠামো তো একই রয়ে গেছে। ছাব্বিশ নম্বর সূর্য গাঙ্গুলি স্ট্রিট—এর বাড়িটাকে সে একটু আগেই বাইরে থেকে দেখে এল, একই রয়েছে। তবে লোহার ফটকে মরচে, পাঁচিলের খসে পড়া পলেস্তারা, ফটক থেকে ভিতরে ঢোকার ইট বাঁধানো পথটায় ঢেলা ইট, গর্ত আর ছেঁড়া কাগজ দেখে মনে হয়েছিল বাড়ির মানুষগুলো আগের শৃঙ্খলার মধ্যে আর নেই।
পার্কের বেঞ্চে সে একাই বসেছিল। এক প্রৌঢ় এসে তার পাশে বসে। সে কিনারের দিকে সরে যায়। আড়চোখে তাকিয়ে সে চেষ্টা করে লোকটিকে চেনার । দেখা মুখ কিন্তু সূর্য গাঙ্গুলি স্ট্রিটের নয়। কিন্তু লোকটি তাকে চিনে ফেলতে পারে কি? পাজামা, পাঞ্জাবি আর বিশেষ করে দাড়িটা কি যথেষ্ট ছদ্মবেশ নয়? দাড়িটা সে রেখেই দেবে তবে বিবি বোধহয় পছন্দ করবে না। ছোটোবেলায় চন্দননগরে মামার বাড়িতে যাত্রায় দেখেছিল, এক অত্যাচারী নবাবকে গ্রাম থেকে এক সুন্দরী গৃহবধূকে হরণ করে নিয়ে যেতে। নবাবের ছিল দাড়ি। সেই থেকে বিবির কাছে দাড়ি আর লাম্পট্য এক হয়ে গেছে।
নিজের অজান্তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল। দাড়িটা তাকে কাটতেই হবে। সে তখন পাশে মুখ ফিরিয়ে দেখতে পায় লোকটি তার দিকে তাকিয়ে। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। তার মনে হয় লোকটি তাকে চেনার চেষ্টা করলে হয়তো চিনতে পারবে। এই পার্কেই ফুটবল খেলার সময় সে ঘুসি মেরে দাঁত ভেঙে দিয়েছিল পাশের পাড়ার বস্তির একটি ছেলের। রক্তাক্ত মুখে কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটি তার বাবাকে ডেকে আনে। এই লোকটিই সেই বাবা। হন্তদন্ত হয়ে লোকটি প্রায় ছুটে এসে তাকে চড় মারার জন্য হাত তুলেও মারেনি। না মারার কারণ সে পরে বুঝতে পেরেছিল। তার মুখ চোখ আর গায়ের রঙ লোকটাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, ছেলেটা বড়ো ঘরের। ‘কোথায় তোর বাড়ি?’ শুধু এইটুকু জানতে চেয়েছিল। সে বলেছিল, ‘দত্তবাড়ি। আমার বাবা অমিয় দত্ত। এর জন্য ডাক্তার ওষুধের খরচ আমার বাবা দিয়ে দেবে।’ লোকটা চিৎকার করে বড়োলোকদের গাল দিতে দিতে তখন ছেলেকে নিয়ে চলে যায়। পরের দিন রাত্রে বাবা তাকে ডেকে বলেছিল, ‘রঘু, তোর একটা ঘুসির দাম চুকোতে চল্লিশ টাকা খসে গেল। আর ঘুঁসোঘুসি করিসনি বাবা।’ বাবা প্রশ্রয়ের হাসি হেসেছিল।
