হঠাৎই কুঠুরির দরজাটা খুলে গেল। রতনের প্রথমে ঠাওর হয়নি, চোখের মাত্র দু—হাত দূরে, এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের অবয়বটিকে। তার চেতনায় দৃশ্যটা ছবি পাঠাতে দেরি করল। রাহুলই প্রথম অসাড় ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে, কিছু একটা অবলম্বন চেয়ে হাতটা পাশে বাড়াতেই হাতুড়ির বাঁটটা মুঠোয় পেল। চিন্তার ঢেউ ওঠার আগেই সে তুলে নিল সেটা।
খাটে পা ঝুলিয়ে রাহুল নির্নিমেষে রতনের মুখের দিকে তাকিয়ে। মুখটায় কোনো হেরফের নেই। যন্ত্রণার ছাপ বা বিকৃতি কিছুই নেই। রোজ সকালে ঘুম ভাঙিয়ে চা দেবার সময় যেমন থাকত, মুখটা প্রায় সেইরকমই। একটু ব্যস্ততা যেন। উনুনে দুধ চাপিয়ে এসেছে এমন একটা ভাব। এ ছাড়া রতন খুব স্বাভাবিকভাবেই মেঝেয় শুয়ে আছে।
হাতুড়িটা খাটের উপর পড়ে। রাহুল সেটা তুলে চোখের সামনে ধরে কৌতূহলী চোখে দেখতে লাগল। সে আশ্চর্যবোধ করল একটা কথা ভেবে, বাঁশের খোঁটার থেকে এটা কত ছোটো অথচ এটারই ক্ষমতা কত বেশি! মাত্র একটা ঘা দিতেই…।
রাহুল হুঁশিয়ার হয়ে রতনকে পাশ কাটিয়ে শোবার ঘরের দরজার দিকে এগোল। দালানে এসে পায়ের দিকে তাকাল। না, রক্ত মাড়ায়নি। এইবার তাকে পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন হতে হবে। সবার আগে জল খেতে হবে।
ফ্রিজ থেকে বোতল বার করে মুখে দিতে গিয়ে রাহুল থমকে গেল। তার অভ্যাস গ্লাসে ঢেলে খাওয়ার। সে গ্লাসে জল ঢেলে ধীরে পান করল। ঝুড়িতে শুকনো টোম্যাটো, শশা। ডেকচিতে দুধে সর পড়েছে। সে হাসল। এখন নয়, আগে বাথরুমে যাওয়া। অনেকক্ষণ ধরে সাবান ঘষবে, দাড়ি কামাবে, শ্যাম্পু করবে, আফটার শ্যেভ গালে লাগাবে। লন্ড্রি থেকে আনা ট্রাউজার্স, শার্ট পরবে। এখন তার অনেক কাজ।
প্রায় দেড়ঘণ্টা পর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা দেবার পর চাবিটা পকেটে রেখে রাহুল থরথর করে কেঁপে উঠল। পৃথিবীটা যে এত বড়ো, এই বোধটা সে এখন পাচ্ছে। রতনই তাকে বাঁচিয়ে দিল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে মাথাটা তুলে, সামনে চোখ রেখে হাঁটতে শুরু করল। এখন সে যাবে রীণাকে দেখতে। নার্সিং হোমটার নাম সে জানে না, তবে সে জানে বাসস্টপ থেকে মিনিট তিনেক বড়ো রাস্তা ধরে হেঁটে বাঁদিকে একটা রাস্তায়।
কেউ কি তার দিকে তাকিয়ে দেখছে? অবাক হয়ে যাচ্ছে? দেখুক। কানাকানি, ফিসফিস হবেই তাকে দেখে। হোক। কেউ তার কাছে এগিয়ে এসে কথা বলবে না। পাড়ায় কারোর সঙ্গে তার আলাপ নেই। এখন নার্সিং হোমের ভিজিটিং আওয়ার্স নয়। সে ওদের কাছে অপরিচিত। নিশ্চয় দারোয়ান কিংবা নার্স জানতে চাইবে, ‘আপনি কে?’ বলব, ‘আমি আপনাদের পেশেন্ট রীণা মিত্রর স্বামী।’ সন্দেহের চোখে তাকাবে কি? ওরা কি জানে সে এখানকারই একটা মাঠে, এক বর্ষার রাতে…’দেখুন, আমি বেটাইমে এসেছি জানি, কিন্তু নিরুপায়…আমাকে এখনই থানায় যেতে হবে, আমার চাকর খুন হয়েছে। আততায়ীকে আমি চিনি, সেটাই থানায় গিয়ে বলব।…আমি একবার স্ত্রীকে দেখতে চাই, প্লিইজ…।’
একা কথা বলতে বলতে, স্বচ্ছন্দে স্বাভাবিকভাবে রাহুল হেঁটে যেতে লাগল।
পুবের জানালা
এক
দ্বিতীয়বার সে বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। হাঁটার মধ্যে এমন একটা ভাব বজায় রাখল যেন সে খুবই প্রত্যয়ী, তার মধ্যে কোনো উদবেগ বা ব্যস্ততা নেই। কারও দৃষ্টি আকর্ষিত হতে পারে এমন পদক্ষেপ একবারও করেনি। শুধু তার চোখ দুটি অস্বাভাবিক তীক্ষ্ন এবং কৌতূহলী। কিন্তু রাস্তার আলোয় তার চোখ খুব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল না। তার কাঁধে ঝুলছে একটা নীল আর কালো নকশাকাটা কাপড়ের ঝুলি। পরনে হালকা সবুজ পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। পায়ে কোলাপুরি। এসব আজই কেনা। কিন্তু তার গালের দাড়ি তিন মাসের। আজকের দিনটির কথা ভেবেই সে দাড়ি রাখতে শুরু করেছিল। বাড়িতে ঢোকার আগে পাড়ার লোক অন্তত যাতে চিনতে না পারে।
দু—পাল্লার লোহার ফটকটা হাট করে খোলা। সাধারণত একটা পাল্লা বন্ধ থাকে। মোটর ঢোকার বা বেরোবার সময় দুটো পাল্লাই খোলা হয়। কোনো মোটর কি এখন ঢুকেছে বা বেরিয়েছে? মোটর তো আছে শুধু তার দাদা গোপেন্দ্রর। কোনো ট্যাক্সি তো ভিতরে ঢুকবে না। এই নিয়ম বাবার আমল থেকে চলে আসছে, কিন্তু গত ষোলো বছরে সেটা কী টিকে আছে?
রাস্তার আলোটা ফটকের পাশ দিয়ে বেরিয়ে—যাওয়া শিবু বর্ধন লেনের মুখেই সনৎদার বাড়ির দেওয়ালে আঁটা। ওই আলোতেই গলির মুখ আর ছাব্বিশ নম্বর সূর্য গাঙ্গুলি স্ট্রিটের ফটক ছাড়িয়ে আরও তিরিশ মিটার রাস্তা আলোকিত। রাস্তার এক প্রান্ত গিয়ে পড়েছে গৌরচরণ ঘোষ লেনে। এই দুই রাস্তার মোড়ে একটি পার্ক। এই পার্কে বাল্যে সে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছে। পরে খেলেছে ভলিবল। পার্কের দক্ষিণে একটা ব্যায়ামের আখড়া, সেখানে আছে হনুমানজির মূর্তি, পাথরে তৈরি দু—হাত লম্বা। সবাই তাই বলে হনুমানজি পার্ক। পার্কের রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে বেঞ্চ পাতা। কিছুক্ষণ আগে সে পার্কের মাঝামাঝি অন্ধকার জায়গায় একটা খালি বেঞ্চে বসেছিল।
অত্যন্ত ক্লান্ত সে। সকাল দশটায় জেলের ফটকের বাইরে পা দিয়েই তার মনে হয়েছিল, আজ সে লম্বা একটা হাঁটা হাঁটবে। হাঁটতে সে ভালোবাসে। যদিও তার মোটরবাইক ছিল, কিন্তু খুব তাড়া না থাকলে বাড়ি থেকে এক বা দেড় মাইল হেঁটেই চলে যেত। আজ সে হেঁটেছে। আলিপুর থেকে উত্তরে সোজা রেসকোর্স হয়ে পশ্চিমে গেছে। গঙ্গার ধার দিয়ে আবার উত্তরে ইডেন গার্ডেনস। গাছের ছায়ায় ঘাসের উপর চিত হয়ে সে ভেবেছে। তার গত ষোলো বছরকে নয়, ভেবেছে কয়েক ঘণ্টা পর কী ঘটতে পারে সেই কথা। তাকে নিয়ে যাবার জন্য কেউ আসেনি জেল—ফটকে। সে দু—সপ্তাহ আগে বিবিকে চিঠি দিয়েছিল তার খালাসের তারিখ জানিয়ে। ‘বিবি’ তার বউ জাহ্নবীর ডাকনাম।
