ছোট্ট হাতব্যাগে লোকটা তার সরঞ্জামগুলো ভরে উঠে পড়ল, তাকে এগিয়ে দিয়ে অনু ফিরে এল।
‘তোমার কাছে টাকাপয়সা আছে তো? না, না, এসব খরচের জন্য বলছি না সীতাংশুদের দোকানে প্যাথোলজিরও কাজ হয়, ওষুধেরও পয়সা লাগবে না। ডাক্তারবাবুর ফি—ও দিয়ে দেবে। বলছি দোকানবাজারের খরচের কথা।’
‘বাজার যা আছে আজ চলে যাবে। দোকানের আর কী কেনার আছে।’ রতন কিন্তু কিন্তু স্বরে বলল।
‘দরকার হলে বলো…আর শোন, আমাদের ঘরের কাউকে বলতে যেয়ো না যে বউদির অসুখ করেছে, আমি ডাক্তার ডেকে এনেছি।’
‘না না, সে আমি বলব না। আর বউদির ব্যাগ তো ওই পড়ে রয়েছে, ওতেই টাকা থাকে।…দিদিমণি ডাক্তার কী অসুখ বললেন?’
‘এখনও বলেননি। রক্ত পরীক্ষার পর বলবেন। আমি আজ বউদির স্কুলে একবার যাব। ওর কে বন্ধু আছে তাকে জিজ্ঞেস করব ওর বাপের বাড়ির কারোর ঠিকানা জানে কি না। আর এই ক্যাপসুলগুলো রইল। তুমি পারবে না, আমি এসে খাইয়ে যাব। থার্মোমিটারটা…দাঁড়াও জ্বরটা দেখি।’
রাহুল উৎকর্ণ হয়ে উঠল। জ্বর কত? আজ নয়তো কাল সকালের মধ্যে রীণা উঠে চলার ক্ষমতা পাবে কি? তা না হলে বিরাট বিপদের মধ্যে সে পড়ে যাবে। পায়খানা দু—দিন চেপে রাখা যাবে কিন্তু তারপর?…না খেয়ে আরও বেশিদিন থাকা যায়। যতীন দাস কতদিন অনশনের পর মারা গেলেন। দু—মাস? তারও বেশি? আমি দু—সপ্তাহ তো থাকতে পারবই।…জল তেষ্টা পেলে সে কী করবে? কুঁজোয় অবশ্য ধরা আছে কিন্তু তাতে কতবার আর খাওয়া যাবে! তারপর?
মাথাটা ঘুলিয়ে যাচ্ছে রাহুলের। দেহটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একসঙ্গে এতরকম সমস্যার সামনে যে তাকে পড়তে হবে, কখনো সে ভাবতেও পারেনি। তার বিদ্যাবুদ্ধি, শিক্ষা, রুচি সবকিছু নস্যাৎ করে দিয়েছে কতকগুলো জৈব দাবি, যেগুলোকে সে চিন্তার যোগ্য বলেই কোনোদিন মনে করেনি।
‘একশো পাঁচ!…বাবা! কাগজ কলম দাও, ডাক্তারবাবু লিখে রাখতে বলেছেন।’
রাহুলের কাছে তাপের পরিমাণটা চিন্তিত হবার মতো ঠেকল, কিন্তু তার পেটের অস্বস্তিটাই তাকে অন্য ধরনের চিন্তায় ঠেলে দিল। দু—দিন চেপে রাখা নয়, আর দু—ঘণ্টাও সে পায়খানা চেপে থাকতে পারবে না।
.
তিনদিন, না পাঁচদিন, না পাঁচ বছর রাহুল মিনিটের, ঘণ্টার, দিনের হিসাব হারিয়ে ফেলেছে, কুঠুরিটা মল আর মূত্রের দুর্গন্ধে ভরা। ক্ষুধা জিনিসটা যে কী, সেই বোধ এখন আর তার নেই। জল ফুরিয়ে গেছে গত রাত্রে।
ওরা রীণাকে নিয়ে গেছে নার্সিং হোমে। যতটুকু সে বুঝেছে, কাছাকাছিই সীতাংশুর চেনা একটা নার্সিং হোমে ওকে ভরতি করানো হয়েছে।
‘রতন তোমার কোনো চিন্তা নেই। নার্সিং হোমের মালিক আমাদের খুব চেনা, টাকার কথা উনি সেরে উঠুন, পরে হবে। খুব কঠিন অসুখ, মাথায় রক্ত উঠে জমে গেছে। দিনরাত বউদিকে নজরে রাখতে হবে।’ সীতাংশু বলেছিল।
‘কেন আমি কি পারতুম না।’ ক্ষুব্ধ স্বরে রতন বলে।
‘পারতে না কেন, তবে ওদের ওখানে যেভাবে হবে তা তো এখানে হবে না। তুমি যখন খুশি যেয়ো, কেমন?’
প্রায় অজ্ঞান রীণাকে ধরাধরি করে সবাই যখন নীচে নিয়ে গেল তখন রাহুল ভেবেছিল—এইবার, এইবার ছুটে গিয়ে চৌবাচ্চচায় মুখ দিয়ে চোঁ চোঁ করে জল খেয়ে আসবে। কিন্তু ভয়ে কুঠুরি থেকে বেরোতে পারেনি। যদি হুট করে কেউ এসে পড়ে? ভয়, ধরা পড়ার ভয়। শুধু এই একটা ব্যাপারই তাকে স্বাভাবিক মানুষের জীবন থেকে সরিয়ে পশুর জীবনে নামিয়ে দিয়েছে।
কয়েকবার বমি করেছিল রাহুল। তারপর আর তাও হয় না। পেটে কিছু থাকলে তো হবে। হিক্কার মতো হয়েছিল, টকটকে লালা থু থু করে ফেলে। সে আশা করেছিল রীণাকে নার্সিং হোমে পাঠালেও শোবার ঘরটা খোলাই থাকবে। কিন্তু রতন তা রাখেনি। দিনের বেলাতেও এই পাড়ায় চুরি হয়েছে, এটা রীণাই ওকে বার বার হুঁশিয়ার করে বলেছে। তারই ফল হল, যতক্ষণ সে ফ্ল্যাটে থাকে শোবার ঘরের দরজা খোলা রাখলেও নার্সিং হোমে যাবার জন্য যখনই বেরোয় ঘরের দরজাটা বন্ধ করে শিকল তুলে তালা দিয়ে যায়। রাত্রেও শিকল তুলে দিয়ে দালানে ঘুমোয়। তখন রাহুল শোবার ঘরে বেরিয়ে আসে।
প্রথমবার সে উন্মাদের মতো সারা ঘরে খাদ্য খুঁজেছিল, পায়নি। নতুন কুঁজোটায় সামান্য তলানি জল ছিল, সেইটুকুই পায়। অদ্ভুত চোখে সে ঘরের আসবাবগুলোর দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল খাট, বিছানা, আলমারি, টেবল, টিভি, আয়না, রেডিয়ো, বই, জামাকাপড় এগুলো যদি ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি আর খাবার জল হয়ে যেত! সে হিসাব করার চেষ্টা করেছিল, মাথার বালিশটা পাউরুটি হয়ে গেলে সে কতদিন চালাতে পারবে। মনে মনে পাউরুটির মতো স্লাইস করে তার মনে হয়েছে দিনে আট স্লাইস করে সতেরো দিন চালাতে পারবে। সেই সঙ্গে আর একটা ব্যাপারও মনে হয়েছে—তার মাথা খারাপ হয়ে আসছে।
অন্ধকার কুঠুরিতে মাড়িয়ে ফেলেছিল নিজেরই মল। তুলো দিয়ে ঘষে ঘষে পায়ের আঙুলের ফাঁক থেকে সেগুলো পরিষ্কার করলেও দুর্গন্ধ যায়নি। বার বার সে হাত শুঁকেছে, পায়ের কাছে মুখ নিয়ে গেছে। বাসি মলের গন্ধ সারাক্ষণ যেন তার নাকের চারপাশ ঘিরে ভনভন করছে। সে অতিষ্ঠ হয়ে বন্ধ দরজাটা বালিশ দিয়ে পিটিয়েছে।
অবশেষে সুযোগ এল। শোবার ঘরে রতন কী যেন খুঁজতে শুরু করল। রাহুল তখন জানলাটা সামান্য ফাঁক করে সকালের রোদের অপেক্ষা করছিল। নটা—সাড়ে নটার আগে সেই তরল সোনা এই ঘরে গড়ায় না। সে ফাঁক দিয়ে দেখেছে রতন খাটের নীচে, আলমারির পিছনে কী যেন খুঁজছে।
