মিনিট কুড়ির মধ্যেই ডাক্তার আর সীতাংশুকে নিয়ে অনু ফিরে এল। চারজন লোকের ভিড়ে রাহুল দেখতে পারছে না ডাক্তার কী পরীক্ষা করছে। স্টেথিস্কোপটার দুটো নল কানে লাগাল এই পর্যন্ত সে দেখেছে। আর দেখেছে সবাই উৎকণ্ঠিত চোখে ডাক্তারের মুখ লক্ষ করছে।
‘ব্লাড টেস্ট করতে হবে…তুমি দুর্গাবাবুকে বলো এখুনি এসে ব্লাড নিয়ে যাক। দোকানে চলো, প্রেসক্রিপশন লিখে দোব। রেগুলার টেম্পারেচার নিতে হবে… আইসব্যাগ তো রয়েছে দেখছি, মাথায় বরফ দেবার ব্যবস্থা কর।’
‘কী মনে হল?’ সীতাংশু জিজ্ঞাসা করল।
‘ব্লাড রিপোর্ট না পেলে বলা শক্ত।…এনার আছেন কে?’ পেশাদারি গলায় ডাক্তার প্রশ্ন করল।
‘আপাতত কেউ নেই, শুধু এই কাজের লোকটি ছাড়া।’
ডাক্তার ভ্রূ কুঁচকে রতনের দিকে তাকাল। ‘আত্মীয়স্বজন কেউ নেই?’
সীতাংশু তাকাল অনুর দিকে। অনু রতনের দিকে।
‘আমি তো কিছু জানি না, কাউকে কখনো আসতে দেখিনি। তবে ইস্কুল থেকে মাঝে মাঝে দু—একজন আসতেন।’ রতন বিব্রত অসহায় মুখে তাকিয়ে রইল।
‘ইনি তো বিবাহিত, হাজব্যান্ড কোথায়?’
‘বাইরে আছেন…সে অনেক কথা, পরে আপনাকে বলব। চলুন।’ সীতাংশু প্রসঙ্গটা চাপা দিতে দরজার দিকে এগোল।
‘নিকটজন কারোর এখন কাছে থাকা দরকার।’
তিনজন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রতন চুপ করে দাঁড়িয়ে, কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। অনু ফিরে এল।
‘আইসব্যাগে বরফ ভরে দিচ্ছি তুমি ততক্ষণ মাথায় ধরো, আমি ওষুধের দোকান থেকে ঘুরে আসছি। আর বউদি একবার আমায় বলেছিল ওর ছোটোবেলার এক বন্ধু ওরই সঙ্গে স্কুলে পড়ায় সে হয়তো বউদির বাপের বাড়ির ঠিকানা জানে। তুমি কি ওর নামটা জান?’
‘না।’
‘আচ্ছা আমি গিয়ে খুঁজে বার করে নেব।’
নন্দিতা পা ভেঙে বাড়িতে রয়েছে, রাহুল মনে মনে বলল, অনু ওকে স্কুলে পাবে না, আর পেয়েও কি কোনো লাভ হবে? রীণার বাপের বাড়ির কেই বা এখন আসবে? বাবা মৃত, মাকে নিয়ে ছোটোভাই চণ্ডীগড়ে, ছোটোবোন বিয়ে করে আছে সল্ট লেকে। নন্দিতা কারোর ঠিকানাই দিতে পারবে না, শুধু বিডন স্ট্রিটে বাপের বাড়িরটির ছাড়া।
নিকটজন বলতে একমাত্র আমি, রাহুল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে ভেবে চলল, সীতাংশুর কথামতো ‘বাইরে’ আছি। অথচ রীণার থেকে এখন হাত দশেকও দূরে নই। থেকেও নেই। কোথাও এখন আমি নেই অথচ আমি বেঁচে আছি! এইরকম অবস্থায় কোনো লোক কখনো কি পড়েছে? চোখের সামনে বউ অসুখে মরবে আর স্বামী খুব কাছের থেকে হাত গুটিয়ে বসে সেটা দেখবে!
ভয়ে। প্রাণের ভয়ে। কী অসম্ভব মূল্যবান এই প্রাণভয় ব্যাপারটি। রাহুল চোখ বুজল বুকের বাঁদিকে হাত রেখে। হৃৎস্পন্দনটা অনুভব করতে পারল না। কবজির কাছে দুটো আঙুল টিপে ধরল।…পাওয়া গেছে। এটা যদি বন্ধ হয়!…এই যদিটাই হল ভয়।
তাকে বাথরুমে যেতে হবে। তলপেটটা ফুলে ভারী হয়ে উঠেছে। কাল রাতের পর এখনও সে পেচ্ছাপ করেনি। অন্তত বারো ঘণ্টা তো বটেই। পায়খানায়ও যাওয়া দরকার। কাল রাতে দুধ—পাউরুটির পর পেটে কিছু পড়েনি। রাহুল আকুল হয়ে শোবার ঘরের মধ্যে চোখ রাখল।
রতন আইসব্যাগ ধরে আছে রীণার মাথায়। মাঝে মাঝে তোয়ালে দিয়ে মুখ থেকে জল মুছিয়ে দিচ্ছে। এই বুড়োটা কি এখন কিছুক্ষণের জন্য ফ্ল্যাটের বাইরে যাবে না? রাহুলের মনে হল এই কুঠুরিটায় নিশ্চয় কোনো নর্দমা আছে। থাকা উচিত।
বন্ধ জানলার দিকের দেওয়ালে সে মেঝের কাছে হাতড়াতে শুরু করল। একটা গর্ত যদি হাতে ঠেকে। তিনবার, চারবার সে দেওয়ালের নীচের দিকটা আঙুল দিয়ে খুঁজল। নেই। ক্রমশ সে রেগে উঠতে লাগল। অদ্ভুত বাড়ি বানিয়েছে। ঘর তৈরি করেছ অথচ নর্দমা রাখনি? গবেট, গাধা, উল্লুক। তার মনে হল, এই দিকের নয়। হয়তো অন্যদিকের দেওয়ালে নর্দমাটা আছে। কিন্তু জিনিসপত্রের স্তূপে দু—দিকের দেওয়াল চাপা। সে শব্দ না করে জিনিসগুলো সরিয়ে জানলার দিকে আনতে লাগল। ভ্যাপসা গন্ধটা বদ্ধ ঘরে আরও ঝাঁঝালো হয়ে উঠল। কয়েকটা পোকা তার হাত বেয়ে সরসর করে উঠে আসতেই সে হাত ঝাড়ল। তোরঙ্গে হাত লেগে শব্দ হওয়া মাত্র সে চট করে জোড়ের ফাঁক দিয়ে তাকাল। রতন একইভাবে রীণার মাথায় আইসব্যাগ ধরে মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শব্দটা শুনতে পায়নি।
রাহুল আঙুল দিয়ে দেওয়ালের সঙ্গে মেঝের সংযোগের জায়গাগুলো আঁচড়ে যেতে লাগল। গর্ত এদিকেও নেই। ঘরের কোথাও নেই।
তা হলে? প্রশ্নটা নিজেকে করেই রাহুল ট্রাউজার্সের চেন টানল।
ধীরে ধীরে তলপেট থেকে টনটনানিটা নেমে যাচ্ছে। রাহুল চোখ বুজে চমৎকার একটা আরাম উপভোগ করে যেতে লাগল। ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে লাগছে। কোণের দিকে মেঝেয় জমে থাকবে। ওর ওপর ছেঁড়া তোশকটার তুলো ফেলে দিলে তো ব্লটিংয়ের মতো শুষে নেবে। মনে হওয়া মাত্র রাহুল দাঁত দিয়ে তোশকের কাপড় ছিঁড়ে তুলো বার করে মেঝেয় ছুড়ে ছুড়ে ফেলল। অন্ধকারে সে বুঝতে পারছে না তুলোগুলো ঠিক জায়গায় পড়ল কি না।
শোবার ঘরে লোক এসেছে। রাহুল চোখ রাখল। অনুর সঙ্গে একটি লোক। পিছন ফিরে খাটে বসে লোকটি রীণার হাত টেনে নিল। রক্ত নিতে এসেছে। পরীক্ষা করে কীসের বীজাণু পাবে? রাহুল ভাবতে লাগল, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, ডায়বিটিস, যক্ষ্মা, ক্যানসার…আর কী হতে পারে? এনসেফেলাইটিস, এইডস? না এইডস নয়, কোথা থেকে এই রোগ পাবে? তার তো নেই। অন্য কারোর কাছ থেকে রীণা কি পেতে পারে? কিন্তু ও স্বামীর প্রতি খুবই বিশ্বস্ত। এ ব্যাপারে সন্দেহের উপরে।
