রীণাকে ‘অনু—সীতাংশু’ ব্যাপারটা রাহুল বলল না। রীণা আলো নিভিয়ে শুয়ে রইল সারা সন্ধ্যাটা। রতন জানতে চাইল খাবে কি না।
‘তুমি এখানে ঢাকা দিয়ে রেখে যাও। রাতে খিদে পেলে খাব।’
রীণা খায়নি। রাতে শোবার ঘরের দরজায় সে খিল দিয়ে এখন শোয়। আজ কোনোক্রমে উঠে খিল দিল। রাহুল তখন কুঠুরি থেকে বেরোল।
‘কী হয়েছে?’ উদবিগ্ন হয়ে রাহুল জিজ্ঞাসা করল।
‘দুপুর থেকেই গা গরম লাগছিল। শরীরটা জ্বরজ্বর লাগছে…ক্রমশই যেন বাড়ছে। খুব ক্লান্ত—।’
‘থার্মোমিটার তো আর কেনা হয়নি?’
‘না।’
রীণার কপালে তালু রেখে রাহুল উদবেগবোধ করল। জ্বর অন্তত একশো দুই—তিন। ভাইরাস ইনফেকশনই বোধ হয়।
‘গায়ে ব্যথা?’
‘হ্যাঁ…ভীষণ।’
‘খাবে কিছু?’
‘না…খাবারটা তোমার জন্য, খেয়ে নাও।’
দুধ, সেঁকা পাউরুটি আর একটা বাটিতে পাতলা ডাল। রাহুল গোগ্রাসে খেয়ে নিল। এখন তার একটা কথাই মনে হচ্ছে, জ্বর বাড়লে রীণার খাওয়া—দাওয়া বন্ধ হবে। রতন নিশ্চয় তখন ওকে ডাল—ভাত—মাছ রেঁধে দেবে না। তখন কে তাকে লুকিয়ে ভাত বা রুটি খাওয়াবে!
‘কাল রতনকে দিয়ে ক্রোসিন বা নোভালজিন আনিয়ে খেয়ে নিয়ো।…আর দু—প্যাকেট বিস্কিট। একটা থার্মোমিটারও কিনতে দিয়ো।’
রাহুল তার কথার কোনো সাড়া না পেয়ে রীণার কপালে আবার তালু রাখল। বেহুঁশের মতো চিত হয়ে। শ্বাস—প্রশ্বাস খুবই ধীর। তার মনে হল, এখন মাথায় আইসব্যাগ দিলে জ্বর নামবে। কিন্তু ফ্রিজ থেকে বরফ বার করে, ব্যাগে ভরে কে মাথায় ধরবে? কাল সকালের আগে কিছু করা যাবে না। কিন্তু সকালেই বা করবে কে? রতনের নিশ্চয়ই ধারণা নেই এক্ষেত্রে কী করা দরকার। বড়োজোর হয়তো কপালে জলপটি দেবার কথা ভাবতে পারে। রীণা ওকে দিয়ে আইসব্যাগটি আলমারি থেকে বার করিয়ে, কী করতে হবে যদি বলে দেয়!
সে আলমারি খুলল। কাজ এগিয়ে রাখার জন্য টর্চ জ্বেলে কাপড়ের স্তূপ সরিয়ে আইসব্যাগটা বার করে টেবলে, চোখে পড়ার মতো জায়গায় রাখল। খাটে শোবে কি না, তাই নিয়ে সে দ্বিধায় পড়ল। যদিও ঘুমের মধ্যে সে নড়াচড়া করে না, তবু অসুস্থ মানুষের পাশে শুলে বীজাণু সংক্রমিত হতে পারে। দু—জনেই শুয়ে পড়লে ব্যাপারটা তখন বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যাবে।
রাহুল মেঝেয় শুয়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। তার ঘুম ভাঙল দরজা ধাক্কানোর শব্দে। প্রথমে সে বিরক্ত হয়ে দরজার দিকে তাকাল। তারপরই উঠে দাঁড়াল বুকের মধ্যে বরফ নিয়ে।
‘বউদি দরজা খুলুন… অ বউদি।’ রতনের উৎকণ্ঠিত চিৎকারের সঙ্গে দরজায় অধৈর্য করাঘাতও চলেছে।
রাহুল খাটে শোওয়া রীণার দিকে তাকাল। চোখ মেলে দিশাহারার মতো তাকাচ্ছে। ওঠার ক্ষমতা নেই। রাহুল বাইরে রতনকে আশ্বস্ত করার জন্য মেঝেয় রাখা থালা—বাটিতে পা দিয়ে ধাক্কা দিল। এতে কাজ হল। করাঘাত বন্ধ করে গলা নামিয়ে রতন বলল, ‘বউদি দেখে পা ফেলুন।’
রীণাকে দু—হাতে প্রায় হিঁচড়ে রাহুল খাট থেকে নামাল। শাড়ি খুলে কোমর থেকে ঝুলছে। চুল আলুথালু। তাকে টেনে নিয়ে সে দরজার কাছে দাঁড় করাল। খিলটা ধীরে ধীরে তুলে, টলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় থাকা রীণার একটা হাত খিলের উপর রেখেই রাহুল ছুটে কুঠুরিতে এসে দরজা বন্ধ করল।
সে একই সঙ্গে রীণার এবং খিলটা খুলে পড়ে যাওয়ার শব্দ পেল।
‘দেখছ কাণ্ড! এমন বেহুঁশ জ্বর নিয়ে উঠে আসা…আর খিল দিয়ো না দরজায়।…উঠতে পারবে?’
জোড়ের ফাঁকে চোখ দিয়ে রাহুল বাকিটা দেখল। বুড়ো রতন দু—হাতে রীণাকে বগলের নীচ থেকে জড়িয়ে টেনে দাঁড় করাল। শাড়িটা খুলে পড়ে গেল। ব্লাউজের দুটো হুক খুলে গেছে। হাত বাড়িয়ে কোনোক্রমে রীণা খাট পর্যন্ত পৌঁছে খাটে উপুড় হয়ে পড়ল। মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বেরোচ্ছে। দুটো পা ধরে রতন রীণাকে খাটে তুলে শুইয়ে দিল। মাথার নীচে বালিশ রাখল। ব্লাউজের হুক লাগাবার জন্য ঝুঁকে পড়ল এবং চেষ্টা করতে করতে সফল হল। শাড়িটা যথাসম্ভব বিছিয়ে দিল গলা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত। এত কিছু করার সময়, রাহুল লক্ষ করল, রতনের মুখে মমতা আর স্নেহ টলটল করছিল।
এইবার সমস্যায় পড়ল রতন। এখন সে কী করবে? রাহুল ভাবল, আমি হলে কী করব? প্রথম কাজ দৌড়ে ডাক্তার ডেকে আনা। রতনের হাতে টাকা নেই। রীণার হাতব্যাগে পঞ্চাশ—ষাট টাকা থাকেই। রতন নিশ্চয় তা জানে।… আর নয়তো কাউকে ডেকে আনা।
চিন্তিত মুখে ঘর থেকে রতন বেরিয়ে গেল। সদর দরজা খোলার শব্দ হল। রতন যাচ্ছে কোথায়? উপরের গৌতমবাবুর কাছে? রাহুল অপেক্ষা করতে লাগল। শোবার ঘরে দীর্ঘশ্বাসের মতো কাতর শব্দে রীণা বুঝিয়ে দিচ্ছে সে এখন যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছে।
রতন ফিরল, সঙ্গে অনু। কপালে, গলায় তালু ছুঁইয়ে অনু বলল, ‘এ যে অনেক জ্বর!…ডাক্তার ডাকতে হবে।’
‘আমি তো কিছু জানি না। কোথায় ডাক্তার পাব…তুমি একটু ডেকে আনবে?’
‘দাঁড়াও, সীতাংশুকে বলছি। ওদের দোকানে ডাক্তার বসে।’
অনু বেরিয়ে গেল। রতন দাঁড়িয়ে রইল রীণার মাথার কাছে। বেচারার এখন কিছু করার নেই। শুধু উৎকণ্ঠাভরে বার বার জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে বউদি?…কোথায়, মাথায়? টিপে দেব?…জল খাবে?’
রতন গ্লাসে জল এনে, রীণার ঘাড়ের নীচে বাহু দিয়ে তুলে খাওয়াবার চেষ্টা করল। খেল কিনা, রাহুল তা বুঝতে পারল না। রীণার মাথায় কপালে রতন হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
