আবার খিল তোলার শব্দ। অনু বেরিয়ে যাচ্ছে তা হলে। রাহুল দরজাটা ফাঁক করল আর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল। চাপা গলায় কে কথা বলল।
সীতাংশু ঢুকল, পিছনে অনু। উত্তেজনায় টসটসে দু—জনের মুখ। কথা না বলে ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ পর ওরা হাসল।
‘তুমি এমনভাবে দোকানে ঢুকলে, মুখ দেখে মনে হচ্ছিল কী যেন ঘটেছে!’
‘চাকরটা দুপুরের মধ্যেই ফিরবে, তাই ছুটতে ছুটতে গেছি।’
‘দাদা কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দোকানে আসবে…কর্মচারীদের হাতে দোকান ফেলে বেরিয়েছি শুনলে ভীষণ রেগে যাবে।’
‘যাবে তো যাবে। আমার জন্য বকুনি খেতে পারবে না?’
সীতাংশু একগাল হাসল। অনুকে বুকে টেনে নিয়ে চুমু খেতে গিয়ে জানালার দিকে তাকাল।
‘বাইরে থেকে দেখা যায়।’
‘পর্দা টানা আছে তো।’
‘তা হলেও…বন্ধ করে দি।’ সীতাংশু আর অনু জোড়ের ফাঁক থেকে সরে গেল। দুই ধাপে ঘর অন্ধকার হল। দরজা দিয়ে যতটা আলো আসা উচিত, আসছে না, রীণার টাঙানো শাড়িতে বাধা পেয়ে। ওদের আর রাহুল দেখতে পাচ্ছে না।
‘কেউ এসে পড়বে না তো?’
‘দরজায় খিল দেওয়া।’
‘তবু যদি কেউ এসে পড়ে!’ সীতাংশুর গলা।
‘তুমি বড্ড ভিতু।’ অনুর মিষ্টি ধমক।
কিছুক্ষণ পর সীতাংশুর গলা, ‘ভাত না খেয়েই স্কুলে গেছে।’
‘পাখাটাও নেভাতে ভুলে গেছিল।’
‘মাথার ঠিক নেই… এই বয়সে একা থাকা! বউদির কোমর—বুক—পেট দেখেছ কী দারুণ না?’
‘তোমার ছাড়া আমি আর কারোর দেখি না।’
কথা আর হচ্ছে না। রাহুলের চোখের পাতা দরজার কাঠে ঠেকে গেল। উপরে—নীচে জোড়ের নানান জায়গা থেকে সে দেখার চেষ্টা করল। দেখতে পাচ্ছে না দু—জনকে।
‘আমি অত বড়ো করে লিখি আর তুমি অতটুকু করে উত্তর দাও কেন?’ সীতাংশুর অনুযোগ।
‘আমাদের কি তোমাদের মতো অত বড়ো বাড়ি যে নিরিবিলিতে লেখার জায়গা পাব?’
আবার কথা বন্ধ হল। রাহুল আর দেখার চেষ্টা করল না। এখন তার শিরার মধ্য দিয়ে তরল আগুন শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। থরথরিয়ে হাঁটু কেঁপে উঠতেই সে উবু হয়ে বসে পড়ল। দু—হাতে ঊরু জড়িয়ে হাঁটু চেপে তার যন্ত্রণাটাকে দমিয়ে নিল।
‘না, খাটে নয়…বউদি এসে ঠিক বুঝতে পারবে।’
‘কী করে পারবে?’
‘বিছানায় পুরুষ মানুষ শুলে গন্ধ লেগে যায়।’
‘সব বাজে কথা।’
‘হ্যাঁ গো, পুরুষের গায়ের আলাদা গন্ধ আছে?’
‘তা হলে মেঝেয়…’
‘কিছু হবে না তো?…তা হলে কিন্তু গলায় দড়ি দিতে হবে।’
রাহুল বুঝতে পারল না ঘড়ঘড়ে চাপা স্বরে সীতাংশু কী বলল। সে শুনল শুধু অনুর গলা, ‘মহা শয়তান তুমি, আগে থাকতে ভেবে পকেটে করেই নিয়ে এসেছ…আগে বলো আমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসবে না।’
‘না, বাসব না।’
‘গা ছুঁয়ে দিব্যি কর।’
‘কাউকে ভালোবাসব না, কোনোদিন নয়।’
‘যদি আমাদের বিয়ে না হয়?’
‘কেন হবে না! জাতটাত নিয়ে এখন আর কেউ অত আপত্তি করে না। আর যদি করে…বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বিয়ে করব। তোমার জন্য কষ্ট স্বীকার করতে—।’
সীতাংশুর কথা শেষ হল না কেন? রাহুল জোড়ের ফাঁকে চোখ রেখে ওদের খুঁজতে লাগল। খাটের ওধারে মেঝেয় দু—জোড়া পা সে দেখতে পেল। পায়ের অবস্থান, নড়াচড়া দেখে সে জানতে পারছে দু—জনে কী করছে।
রাহুল হাঁটু গেড়ে মেঝেয় কপাল ঠেকিয়ে। সে সহ্য করতে পারছে না শোবার ঘরের ঘটনাটা। তার মনে হল, অনু যা করছে, সীতাংশু যা করছে, কিছুই এমন অন্যায় নয় যে তাকে দরজা খুলে বেরিয়ে ওদের ভয় পাওয়াতে হবে। তার অসহ্য লাগছে, এটা চোখের উপর ঘটছে কেন? এটা কি তার জন্য শাস্তি? বেচারারা জানে না, একজন তাদের দেখতে পাচ্ছে! এটা যদি ওরা জানতে পারে তা হলে কী মানসিক অবস্থার মধ্যে পড়বে? ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবে ছেলেমেয়েদুটো!
ওদের কি ভয় দেখাব?
রাহুল এটা ভেবেই মেঝেয় মাথা ঠুকল। তার মন নোংরা হয়ে গেছে। ভয় দেখানোর মতো নীচ কাজ করার কথা সে ভাবতে পারল কী করে! বেশ তো আছে ওরা নিজেদের মতো ভালোবেসে। ওষুধের দোকানের মালিকের ছেলে, পাড়ার অর্ধশিক্ষিত মেয়ে। বিয়ে হতে পারে, নাও পারে! কিন্তু ওদের জীবনে এই মুহূর্তগুলো…রাহুলের মনে পড়ছে, তার জীবনেও এমন ধরনের মুহূর্ত বিয়ের আগে এসেছিল। কিন্তু তাই নিয়ে সে আর ভাবতে চায় না।
আবার সে দরজার ফাঁকে চোখ রাখল। সীতাংশুর গলা দু—হাতে জড়িয়ে ওর বুকে মাথা রেখে অনু কাঁদছে। সুখের কান্না?
‘আমি এবার যাই, দোকান ফেলে রেখে এসেছি।’
বুকে মুখ ঘষে অনু চোখের জল মুছল।
‘তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।’
রাহুলের মনে হল, পৃথিবীটা একই রয়ে গেছে শকুন্তলা, সীতার আমল থেকে।
‘আমারও কেউ নেই তুমি ছাড়া।’
‘বিয়ের কথাটা বাড়িতে তাড়াতাড়ি তুলো।’
‘তুলব।’
‘রাজি না হলে, আলাদা হয়ে যাবে তো?’
‘যাব।…এইবার যাই, দাদা আসার আগেই—’।
সীতাংশু বুক থেকে অনুকে সরিয়ে দিল। রাহুল হাসতে শুরু করল। ছেলেটা পারবে না, মেয়েটাও ছাড়বে না।
এবার ওরা বিদায় হোক এই ফ্ল্যাট থেকে।
‘আমি কিন্তু বিষ খাব যদি তোমাকে না পাই।’
‘না অনু তোমাকে মরতে দেব না, তাহলে আমিও—’
সীতাংশুর মুখ চেপে ধরল অনু। তারপর কামনাভরা তীব্র চুম্বন করতে করতে দু—জনে খাটের উপর পড়ল।
রাহুল চোখ সরিয়ে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তার ছোটো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
একসময় ওরা দু—জন চলে গেল। একসময় রাহুল ঘর থেকে বেরিয়ে ভাত খেয়ে নিল। রতন ফিরে এল। রীণা ফিরল জ্বর নিয়ে। খাটে শুয়ে সে রতনের কাছ থেকে জেনে নিল হাসপাতালের ডাক্তার কী কী বলেছে। রতন প্রেসক্রিপসান দেখাল। ওষুধগুলো খেয়ে সাতদিন পর যেতে বলেছে, সবগুলো দাঁতই তুলে ফেলতে হবে।
