খাট থেকে নেমে রাহুল নিজের কুঠুরিতে ফিরে এল। নিজহাতে দরজা বন্ধ করল। পা ছড়িয়ে বসে প্রথমেই তার মনে হল, বাঁশের খোঁটা হাতে নিয়ে কেউ একজন এবার তার দিকে এগিয়ে আসবে। কবে আসবে তা সে জানে না।
বেডকভারটা টেনে আনার জন্য সে হাত বাড়াতেই হাতুড়িটা হাতে ঠেকল।
৪
রতনের দাঁতে যন্ত্রণা হয়। দাঁতটা তুলে ফেলে দিতেই হবে। রীণা বলেছিল, টাকা দিচ্ছি ডাক্তারের কাছে গিয়ে তুলিয়ে ফেল। রতনের আপত্তি টাকা খরচ করায়। সে জানতে পেরেছে, ঠিকে ঝি কমলের মা একই যন্ত্রণায় ভুগছে এবং ডেন্টাল হসপিটালে গিয়ে দাঁত তুলিয়ে আসবে। রতন অতঃপর কমলের মা—র সঙ্গে ব্যবস্থা করে ফেলে, সেও ওর সঙ্গে যাবে দাঁত তোলাতে।
এসব কথা রাহুল জানল যখন রীণা রাত্রে তাকে বলল, ‘রতন কাল সকালেই দাঁত তোলাতে যাবে। ফিরবে কখন ঠিক নেই, হয়তো দুপুরে আসবে।’
‘তা হলে কে ওকে দরজা খুলে দেবে? তুমি তো সাড়ে ন—টায় বেরোবে!’
‘বাইরে তালা দিয়ে চাবিটা অনুর কাছে রেখে যাব, রতন এসে চেয়ে নেবে।’
সকালে ঘুম ভাঙতেই রাহুলের প্রথমেই মনে হল, রতন আছে না বেরিয়ে গেছে? অন্যান্য দিনেও রতন বেরোয় দুধ আনতে। তারপর বাজারে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে। আজ রতন টানা অনেকক্ষণ বাইরে থাকবে। হাসপাতালটা কাছে নয় আর বিনি পয়সায় চিকিৎসা করাতে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রাহুল ধরে নিল, দুপুর পর্যন্ত সে এই ফ্ল্যাটে স্বাধীনভাবে থাকছে।
দরজা খুলে রীণা বলল, ‘রতন দাঁত তোলাতে চলে গেছে। বাথরুমে যেতে পার।’
রাহুল শোবার ঘরের দরজা থেকে হামা দিয়ে বাথরুমে গেল। এইভাবে যাওয়াটা এখন তার স্বাভাবিক হয়ে গেছে। রীণাও আর তাকে লক্ষ করে না তবে ওই সময়টায় সে পাশের বাড়ির দিকে চোখ রাখে, তারপর হাত নেড়ে তাকে এগোবার জন্য ইশারা করে। ততক্ষণ রাহুল মুখ তুলে তাকিয়ে থাকে রীণার দিকে। শুধু এই সময়টুকু সে নিজেকে একটু অন্যরকম ভাবে। করুণাপ্রার্থী একটা অসহায় জন্তু, রীণা তার মনিব।
স্বামী—স্ত্রী সম্পর্কটা এই সময়টুকুতে আর থাকে না। তার লেখাপড়া, ব্যায়াম করা, শিক্ষা, রুচি, কান্তি, বিত্ত সব নিশ্চিহ্ন হয়ে সে একটা চতুষ্পদ ছাড়া নিজেকে আর কিছু মনে করতে পারে না।
রীণা সেদিন রাত্রের পর থেকে নিস্পৃহ, আচরণে আবেগবর্জিত কর্তব্যে যথাযথ। রাহুল খবরের কাগজ চোখের সামনে রেখে কান রাখল দালানে। রীণা রান্নাঘরে আর দালানে কাজের জন্য চলাফেরা করছে, মাঝে একবার ঘরেও এল। কলকাতার সকাল তার নিজস্ব শব্দ তৈরি করে যাচ্ছে। সূর্যের আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে প্রতিদিনের মতো অভ্যস্ত জায়গায় পড়েছে।
রাহুলের চোখ ঘরের চারদিকটা ঘুরে এল। ঘরটা একই রকম রয়েছে এখনও। অধিকাংশ আসবাব তার পছন্দেই কেনা। রীণা চেয়েছিল রাবার—ফোম গদির খাট। শিরদাঁড়ার নানান ব্যাধির ভয় দেখিয়ে সে তুলোর গদি আর তোশকের খাট কেনে। প্রত্যেকটা আসবাবই তার জীবনের পটভূমির এক—একটা অংশ। একদিন আর তা থাকবে না। রীণা একার রোজগারে হয়তো চালাতে পারবে না। তখন কি টিভি, রেডিয়ো, খাট, ফ্রিজ বিক্রি করে দেবে?
রীণা স্নান করে ভাত খেল, স্কুলে যাবার জন্য শাড়ি পরল। থালা হাতে ঘরে ঢুকে বলল, ‘তোমার ভাত এই টেবলে রেখে যাচ্ছি, রতন আসার আগেই তোমার ঘরে তুলে নিয়ে যেয়ো।…চাবিটা অনুর কাছে দিয়ে যাচ্ছি।’
রাহুল কাগজে চোখ রেখে মাথা নাড়িয়ে একটা শব্দ করল। সে জানে রীণা কথাটা বলেই ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেছে। তার মাথা নাড়া দেখার জন্য সময় দিতে ইচ্ছুক নয়।
রীণা চলে যাবার পর আধঘণ্টা কি তারও বেশি সময় কেটে গেছে, হিসেবটা রাহুল আর করার দরকারবোধ করেনি। এখন তার কাছে সময়ের কোনো দাম বা দরকার নেই। সে পাখার গতি বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে। তন্দ্রা মাঝে মাঝে চেতনাকে ঢেকে দিচ্ছে। তবু জেগে থাকার চেষ্টা করছে। রতন এসে যেন তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় না দেখে ফেলে।
হঠাৎ তার মনে হল সদর দরজায় তালা খোলার শব্দ হল। স্প্রিংয়ের মতো বিছানায় উঠে বসল। শোবার ঘরের দরজাটা খোলাই। দরজায় খিল আঁটার শব্দ শুনতে তার ভুল হল না। সে দু—লাফে কুঠুরিতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। জোড়ের ফাঁকে চোখ রেখে সে অপেক্ষা করতে লাগল। এত তাড়াতাড়ি রতন ফিরে এল!
ঘরে ঢুকল অনু। প্রথমেই তাকাল ঘুরন্ত পাখার দিকে। হাসল। রাহুল খুবই অবাক হয়ে যায় ওকে দেখে। কেউ চাবি গচ্ছিত রেখে গেলেই কি তালা খুলে তার ঘরে এভাবে আসা উচিত! কিন্তু পাখার দিকে হাসাটা দেখেই ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। নিশ্চয় মনে মনে প্রশ্ন তুলবে, কেন ঘুরছিল, কে হাওয়া খাচ্ছিল, সে তা হলে গেল কোথায়? ওই দরজা বন্ধ ঘরটায় কী?
অনু পাখার সুইচ বন্ধ করে, পা টিপে জানালার কাছে গেল। পর্দা সরিয়ে বাইরে দু—ধারে, উপরে সন্তর্পণে নজর বোলাল। তারপর শাড়ির আঁচল বার করে কয়েকবার নাড়ল। দু—পা পিছিয়ে এসে অনু দাঁতে আঙুল চেপে জানালার দিকে তাকিয়ে কী ভাবতে লাগল। রাহুল দেখল মেয়েটির গৌরবর্ণ মুখ লাল হয়ে উঠেছে, কপালে ঘাম ফুটেছে, আর দু—চোখে জ্বলজ্বলে অস্বাভাবিক চাহনি।
অনু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কী ব্যাপার? আঁচল নেড়ে কী করল! কাউকে ইশারা? সংকেত জানাল?…উদ্দেশ্য? অনু কি চলে গেল, নাকি ফিরে আসবে! পাখাটা বন্ধ করার সময় ও কী ভেবেছিল?
