‘আমি আগে দেখি রতনকে। তারপর যেয়ো।’
সন্তর্পণে, সময় নিয়ে রীণা খিল নামাল। টর্চ জ্বেলে ডাইনিং—দালানটা দেখে এসে বলল, ‘যাও…বাঁদিক দিয়ে।’
বুড়ো মানুষটা কাত হয়ে হাঁটুমুড়ে অঘোরে। মুখ হাঁ হয়ে রয়েছে। কণ্ঠার আর পাঁজরের হাড়গুলো প্রকট। রাহুল তার পাশ দিয়ে পা টিপে বাথরুমের দরজায় পৌঁছাতেই রীণা টর্চ নিভিয়ে ফেলল।
রাহুল যখন বেরিয়ে এল রীণা তখনও দালানে দাঁড়িয়ে। টর্চ জ্বেলে পথ দেখাল। আসার সময় থমকে, রাহুল বারান্দার পাঁচিল থেকে ঝুঁকে দু—ধারে তাকিয়েছিল। রীণা মুখে শব্দ করে উঠতেই তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে আসে। দরজা বন্ধ করে রীণা খিল এঁটে দিল।
‘রাত্তিরে অনেকেরই ঘুম হয় না, জানালা কি বারান্দায় দাঁড়ায়।’ রীণা চাপা গলায় বলল।
‘তুমিও ঘুমোওনি।’ রাহুল মৃদু শান্তস্বরে, অন্ধকার মূর্তির মতো রীণাকে লক্ষ করে বলল। ‘আমার জন্য তোমায় ভাবতে হবে না, শুয়ে পড়ো…মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, ঘুম এসে যাবে।’
‘না।’ রীণা খাটে উঠল। বালিশটা সামান্য সরিয়ে শোবার উদ্যোগ করে বলল, ‘যাও, শুয়ে পড়ো তুমি।’
‘যাচ্ছি।’ কিন্তু রাহুল বসেই রইল। রীণা বিছানায় ছড়িয়ে দিল দেহভার। কিছুক্ষণ তারা কথা বলল না।
রাহুল ঝুঁকে বাঁ কনুইয়ে ভর দেখে রীণার মুখের কাছে মুখ আনল। ‘তুমি খুব ক্লান্ত।’
রীণা চুপ। রাহুল ডান হাতের তালু ওর কপালে রাখল।
‘ঘুমোবার চেষ্টা কর।’ রাহুলের তালু অত্যন্ত কোমলভাবে রীণার কপাল থেকে গালে, চিবুকে, নাকে, ঠোঁটে মন্থর গতিতে সঞ্চরণ করতে লাগল। রীণা প্রত্যাখ্যান করছে না, তালুটা গলা বেয়ে কাঁধের প্রান্তে পৌঁছল। রীণা ব্লাউজ খুলে রাত্রে শোয়।
‘থাক।’ একসময় রাহুলের হাতটা চেপে ধরল রীণা। ‘এবার শুতে যাও।’
‘আর একটু।…তোমার ভালো লাগবে। তুমি অত্যন্ত টেনসড হয়ে রয়েছ, এবার আলগা হও। নার্ভগুলো এলিয়ে পড়ুক।’
রীণা প্রতিবাদ জানাল না। শুধু মুখ থেকে একটা ক্ষীণ শব্দ বেরিয়ে এল। রাহুলের মনে হল, তার কথাগুলোকে সমর্থন করেই যেন রীণার দেহটা শিথিল হয়ে আসছে। বহুদিন, বহু মাস হয়ে গেল এমন যত্নে সে রীণার শরীরে হাত দেয়নি। এত মায়া, মমতা নিয়ে ওর বুকে হাত বুলোয়নি।
রাহুল ঝুঁকে রীণার কপালে ঠোঁট রাখল। তারপর চোখের উপর এবং ওষ্ঠে। ধীরে ধীরে সে বিছানায় রীণার পাশে নিজেকে বিছিয়ে দিল। চুম্বনকে ক্রমশ গাঢ় এবং তীব্র করে তুলল।
‘এবার যাও।’ রীণার স্বরে দুশ্চিন্তার আভাস। ‘বহুদিন এত ভালো লাগেনি তোমাকে চুমু খেয়ে।…তোমার কষ্ট, তোমার দুঃখ,…বেদনা অনুভব না করলে বোধ হয় এই ভালো লাগাটা পেতাম না।’ রাহুল কথাগুলো বলল রীণার অনাবৃত বুকের মাঝে মুখ চেপে রেখে। তার মনে হল রীণার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠল।
‘রীণা আমি এভাবে বন্দি হতাম না, চার দেওয়ালের ওই কুঠুরিটায় আমি ঢুকতাম না, যদি মেয়েটার চিৎকার শুনে থমকে না দাঁড়াতাম। আমি তো অগ্রাহ্য করে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে যা হচ্ছে হোক গে আমার কী, এমন একটা ভাব করে নাও তো দাঁড়াতে পারতাম। কিন্তু দাঁড়ালাম কেন?’
রীণার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর হয়ে আসছে। যেন দম বন্ধ রেখে অপেক্ষায় থাকবে উত্তর শোনার জন্য। রাহুল মুখ তুলে বলল, ‘আমি শুধু এইটাই ভেবেছি এই ক—দিন ধরে। উত্তর পাইনি।…মানুষ বিপদে এগিয়ে যায় কেন? তুমি কি এর উত্তর জান?’
‘না।’ ক্ষীণস্বরে জবাব এল। রাহুল জানে এই শব্দটি ছাড়া রীণার পক্ষে আর কিছু বলা সম্ভব হবে না।
‘বহু লোক অন্যকে বিপদের মধ্যে দেখে পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে চলে যায়, কেন যায় জান?’
‘না।’
‘আমাদের সম্পর্কটা আগের মতো রাখা সম্ভব হবে কি?’
রীণা নিরুত্তর রইল। রাহুল হঠাৎই তীব্র একটা আবেগে আচ্ছন্ন হতে শুরু করল। সে রীণার দুই ঠোঁট মুখের মধ্যে ভরে দাঁত দিয়ে চাপ দিল। তারপর নিজেকে টেনে রীণার দেহের উপর তুলল।
‘না, না…অসম্ভব।’
‘কেন অসম্ভব?’ রাহুল প্রশ্নের মতো স্বরে দাবি জানাল। বহুদিন পর সে কামনার প্রবল সাড়া দেহে পেয়েছে। এটা সে নষ্ট হতে দেবে না। এখন খুবই অনিশ্চিত তার ভবিষ্যৎ। কে জানে এটাই হয়তো তার শেষবার!
‘রাহুল না, সম্ভব নয়…আমি পিল খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কিছু হয়ে গেলে আর মুখ দেখাতে পারব না।’
এরপরই রাহুল এমন একটা কথা বলে ফেলল যেটা বলার জন্য সে পর মুহূর্তেই অনুতাপ করেছে।
‘কিছু হবে না তোমার। অনেক আগেই ডাক্তার দিয়ে নিজেকে পরীক্ষা করিয়েছি, আমার কখনো সন্তান হবে না।’
রীণার চাপা আর্তনাদটা রাহুলের মুখের উপর এমন জোরে আঘাত করল যে তার মুখ অসাড় হয়ে গেল।
‘লুকিয়ে রেখেছিলে! কিন্তু আমি যে চাই… একটা অন্তত।’ রীণার বুকভাঙা স্বরে রাহুল যেন ছবির শেষবারের চিৎকারটার রেশ শুনতে পেল। ধীরে ধীরে সে বুকের উপর থেকে নেমে এল।
দু—হাতে রীণা মুখ ঢেকেছে। অন্ধকার ঘর। রাহুলের মুখ দেখবে না বলে কিংবা তার নিজের মুখ না দেখানোর জন্য বা শোকের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি এটাই। রাহুল ভাবল, খবরটা কেন ওকে জানাতে গেলাম? এটা কী এমন জরুরি, অবশ্য দরকারি ব্যাপার যে আজ রাতেই…ধৈর্য, সংযম, অপেক্ষা কি করা যেত না? শরীরের তাড়নায় যুক্তি, বুদ্ধি হারানো এমন অন্ধত্ব তাকে পেয়ে বসল কেন? তা হলে ওই লোকগুলোর সঙ্গে তার তফাত কোথায়?
