মিনিট পাঁচেক পর সদর দরজা খোলার ও বন্ধের শব্দ হল। গ্লাসে চা নিয়ে রীণা ঘরে ঢুকল। শিকল খুলল।
‘জানালার পর্দা।’
‘টেনে দিয়েছি।’
রাহুল বেরিয়ে এসে চায়ের গ্লাস নিল। খাটে বসল। রীণা নিজের চায়ের কাপ নিয়ে এসে প্যাকেটটা খুলছে।
পাউরুটি, বিস্কুটের প্যাকেট, জেলির শিশি! রাহুল জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল।
‘সবসময় তো খাবারদাবার দিতে পারব না… এগুলোই তখন খেয়ো।’
‘ভালোই করেছ।’
‘হাতে করে আসার সময় ভয় করছিল।’ শাড়ি খুলতে খুলতে রীণা পিছন ফিরে দাঁড়াল।
‘ভয়! কীজন্য?’ রাহুল বিস্কুটের প্যাকেট ছিঁড়ে একটা বার করল।
‘পুলিশের ওয়াচ তো নিশ্চয় আছে। হাতে এত খাবার নিয়ে যেতে দেখে সন্দেহ করতে পারে।’
‘এসব জিনিস তো সব পরিবারেই প্রায় দরকার হয়, এতে সন্দেহ করার কী আছে!’
‘কিছুই নেই, কিন্তু এখন আমাকে সর্ব ব্যাপারে ভয়ে ভয়ে থাকতে হচ্ছে। চলাফেরা, কথা বলা, কেনাকাটাতেও পর্যন্ত। নতুন কুঁজো কিনতে দিতে পারিনি, যদি কেউ মনে করে হঠাৎ এখনই কিনা পুরোনোটা ভাঙল! তোমার দুটো প্যান্ট লন্ড্রিতে রয়েছে, আনতে পারছি না।… অদ্ভুত একটা কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে, কিছুই আর স্বাভাবিকভাবে করতে পারছি না। বাইরে বেরোতেই মনে হয়, কেউ যেন লক্ষ করছে, ফলো করছে।’
শাড়ি পরা হয়ে গেছে। রাহুল দ্বিতীয় বিস্কুট দাঁতে ভাঙল। প্যাকেটটা রীণার দিকে বাড়িয়ে ধরল। একটা তুলে নিয়ে সে কাপে চুমুক দিয়ে রাহুলের পাশে বসল। দু—জনে কিছুক্ষণ নিজেদের চিন্তায় ডুবে গেল।
‘রতনকে কোথায় পাঠালে!’
‘নন্দিতার কাছে। আজ এগারো দিন স্কুলে আসছে না, পা ভেঙে পড়ে আছে। কিন্তু সেজন্য নয়… পরশুর আগের দিন খবর পাঠিয়েছিল, ওর হাতে কাজের লোক আছে, অল্পবয়সি, বিবাহিতা, দেশ থেকে সবে এসেছে। পাঠিয়ে দেবে কিনা জানতে চেয়েছে।’
‘কী লিখলে!’ রাহুল উৎকণ্ঠিত হয়ে জানতে চাইল। ‘রতনটা খুব অসুবিধে করছে।’
রীণা একটু অবাক হয়েই বলল, ‘রতনকে ছাড়াতে বললে তুমিই তো আপত্তি করতে… ‘যাক বুড়ো মানুষ, এই বয়সে যাবে কোথায়, কে ওকে কাজ দেবে’ এইসব বলে তো আমাকে বোঝাতে! এখন বলছ অসুবিধা করছে?’
‘হ্যাঁ বোঝাতাম। তখন অবস্থাটা অন্যরকম ছিল।’
‘কার অবস্থা? আমার, এই সংসারের…না রতনের?’
‘আমার অসুবিধেটা কি একটা গুরুত্ব পাবার মতো ব্যাপার নয়?’
‘কিন্তু এখন রতনকে নিয়ে আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না, আর এটাও আমার কাছে এখন খুব দরকারি ব্যাপার, কেননা আমাকেই এখন সবকিছু টানতে হবে। পাড়া—প্রতিবেশী, স্কুলের কলিগরা ছাড়া পুলিশও আছে। সবাই এখন আমায় এড়িয়ে চলছে। অনু… যে দিনে দু—বার অন্তত আসত, সে পর্যন্ত গত চারদিনে একবার এসেছে, তাও লুকিয়ে, তাও সীতাংশুর সঙ্গে দেখা করতে। এই যখন অবস্থা, হঠাৎ কাজের লোককে ছাড়িয়ে দিলে—’
‘কেউ সেটা অত তলিয়ে দেখতে যাবে না।’
‘যাবে কি যাবে না তা আমি জানি না, তুমিও জান না। ঘরে বসে থাকা এক জিনিস আর বাইরে সবকিছু ফেস করা আর এক জিনিস।’
‘বাইরেটা যে কী জিনিস তা আমি তোমার থেকে ভালোই জানি।’
‘হ্যাঁ জান। বাইরে গিয়ে কী ফেস করেছ, তা তো আর লোকের কাছে বলার মতো নয়।’
‘কী করেছি বাইরে?’
‘রেপ… মার্ডার। এর থেকে নোংরা, জঘন্য আর কিছু মানুষে করতে পারে?’
রীণা উঠে দাঁড়িয়েছে। চাহনিতে আগুন। দু—চোখের মণি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নাকের পাটা ফোলা। ঠোঁটদুটো ঘৃণায় অবজ্ঞায় দোমড়ানো। দেহটা শান্ত হয়ে ঈষৎ ঝোঁকানো।
রাহুল থম হয়ে শুধু স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘আমি রেপ করিনি…মেয়েটাকে স্পর্শ পর্যন্ত করিনি।’ ধীরে ধীরে দাঁত চেপে সে বলল। খুন করার কথাটা বলতে গিয়েও বলল না।
‘সাফাই গেয়ো না।’ রীণা চাপা গলায় ধমকে উঠল। ‘তুমি আমাকেও জড়িয়েছ তোমার পাপের সঙ্গে।’
‘তোমাকে জড়িয়েছি!’
‘একটা মার্ডারারকে সেল্টার দিলে আইন কি বউ বলে আমাকে ছেড়ে দেবে?’
রাহুল অবুঝ অবোধ শিশুর মতো রীণার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যাকে দেখছে সে অন্য এক রীণা। একে সে চিনতে পারছে না।
‘নন্দিতাকে জানিয়ে দিলাম কাজের লোকের এখন দরকার নেই।’
রাহুল উঠে দাঁড়াল। শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে ধীর পায়ে সে নিজের কুঠুরিতে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ করল।
একটু পরেই দরজার একটা পাল্লা ফাঁক হল। কাগজের প্যাকেট মেঝেয় নামিয়ে রেখে রীণা দরজা বন্ধ করল।
অনেকক্ষণ পর রাহুল পাল্লার জোড়ে চোখ রেখে দেখল বিছানায় উপুড় হয়ে রীণা, বোধ হয় কাঁদছে। সে বুঝতে পারছে, ওর মানসিক যন্ত্রণা। যে অবস্থার মধ্যে পড়েছে সেটা তারই তৈরি। রীণার সহ্যশক্তি যে এতখানি, রাহুল এখন তা অনুভব করছে। ভয় শুধু তো তার একারই নয়, রীণাকেও ভাগ নিতে হয়েছে। চাপের মধ্যে পড়েও বুদ্ধি হারায়নি। খুঁটিনাটি সাবধানতার দিকে হুঁশ রেখেছে। সবথেকে বড়ো কথা, তাকে সহ্য করছে। রেপ, মার্ডার… এইসব সত্ত্বেও তার প্রতি মমত্ববোধটা হারায়নি। ওর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
মাঝরাতে রাহুল কুঠুরি থেকে বেরোল। বাথরুমে যাবে। অন্ধকার শোবার ঘরের মধ্য দিয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছে তখন রীণা চাপা স্বরে বলে উঠল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
‘বাথরুমে।…তুমি ঘুমোওনি?’
‘দাঁড়াও।’ রাহুলের প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে রীণা খাট থেকে নেমে এল। টর্চের আলো পড়ল মেঝেয়।
