চা—ওয়ালাটা কি শুনছে, কি দেখেছে? ওই লোকটাই ‘সূত্র’ হতে পারে। রাহুল বুঝতে পারছে না, লোকটা তাকে চেনে কি না। অনেক লোকই শর্টকাট করার জন্য মাঠের পথটা ধরে। চা—ওয়ালা সবাইকে কি চিনে রেখেছে? সেও তো ভালো করে মুখটা কখনো দেখেনি, কখনো ওর দোকান থেকে চাও খায়নি। ওর কাছ থেকে পুলিশ কি জানতে পারবে?
আরও দুটো লোক ছিল যারা ছুটে পালায়। তাদের কেউ ধরা পড়েনি। শ্যামলের মতো লোকের সঙ্গী যখন নিশ্চয় ওরাও ডাকাতি—ছিনতাই করে। ওরা দু—জন ছবিকে খুন করেনি, কেননা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে ছবির চিৎকার করার সময় ওরা দূরে ছিল। ছবির কাছে ছিল শ্যামল, সেই গলা টিপেছে। অন্য দু—জন তখন ছুটে পালাবার সময় জানতও না শ্যামল ছবিকে খুন করছে এবং সে নিজেও দ্বিতীয় এক আততায়ীর হাতে খুন হতে চলেছে। লোকদুটো তাকে দেখেছে। হয়তো শ্যামলের মতো ওরাও আধ মাইলের মধ্যেই বাস করে। ওরা তাকে দেখলে চিনতে পারবে কি না সে বিষয়ে রাহুলের সন্দেহ আছে। আলো যথেষ্টই কম ছিল। কিন্তু শ্যামলের খুনি যে তারা দু—জন নয়, এই কথাটা বলার জন্য ওরা কি পুলিশের কাছে যাবে?
মোটেই নয়। এরা হার্ডকোর ক্রিমিনাল। একটা সেক্সবেচুনি মফস্সলের গরিব মেয়েকে ঠকাবে এবং লুঠও করবে স্থির করেই তাকে ওরা এনেছিল। মেয়েটা চেঁচাতে এবং তার এসে পড়াতেই গলাটা টিপে দিয়েছে। সে এসে পড়েছিল বলেই রাহুলের বিশ্বাস, ছবি মরল। না হলে… তা হলেও বোধ হয় মরত। এদেরই হাতে কিংবা এইডসে কিংবা… এত রকমে মরা যায় যে রাহুল এই নিয়ে আর ভাবতে চায় না।
তবে ছবির টাকা—গহনার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে… এটা মনে পড়লেই রাহুলের হো হো করে হেসে ওঠার ইচ্ছে হয়। সোনাদানা গায়ে দিয়ে রানাঘাট থেকে কেউ কি এই ব্যবসা করতে আসে? আর ‘বিবাদ’ যে হয়েছে এটাই বা পুলিশ বুঝল কী করে! সোজা ব্যাপারটাকে জটিল করে না তুলতে পারলে বোধ হয়, বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া যায় না।
কিন্তু সূত্র ধরে পুলিশ এই ফ্ল্যাটে এসেছিল, রীণার সঙ্গে কথা বলে গেছে। ওরা জানল কী করে? কী কথাবার্তা হয়েছে, রীণা তা বলতে চায়নি। স্কুল থেকে ফিরলে ওকে চেপে ধরতে হবে। কথা বলার সুযোগ রতন জেগে থাকা পর্যন্ত পাওয়া যাবে না। রতন না থাকলে এই কুঠুরিতে অন্ধকারে বসে তাকে ভেপসে মরতে হত না। এখন তা হলে সে শোবার ঘরে পাখার হাওয়ার নীচে হাত—পা ছড়িয়ে খাটে শুয়ে থাকতে পারত।
রতনটাকে কি বিদায় করা যায় না?
চিন্তাটা আসা মাত্র সে কুঁকড়ে গেল। এতকাল ধরে যে করুণা, মায়া সে এই বৃদ্ধটি সম্পর্কে পোষণ করে এসেছে সেটা কখন যেন নিজের স্বার্থের, দৈহিক নিরাপত্তার প্রশ্নে উবে গেছে। রাহুল অপ্রতিভ বোধ করল নিজের কাছেই। মহৎ, সৎ অনুভবগুলো দেখছি এই একটা জিনিসের কাছে জব্দ—নিজের প্রাণ নিয়ে যখন প্রশ্নটা ওঠে। অস্বাভাবিক কিছু নয়, পৃথিবীর সব মানুষের কাছে এটাই রক্ষা করার তালিকায় এক নম্বরে।
রীণা স্কুল থেকে ফিরল ক—টার সময় রাহুল সেটা তার হাতঘড়ি থেকে বুঝতে পারল না। দম না দেওয়ায় ঘড়িটা বন্ধ। তবে সামনের বাড়ির ঝিয়ের গলা থেকে আন্দাজ করল চারটে বেজে গেছে। স্কুলের মিটিং ছিল এগারোটায়। এতক্ষণ ধরে কি গার্জেনরা বসে থেকেছে!
রাহুল কুঁজো থেকে গ্লাসে জল গড়িয়ে খেল। বসবাসের জন্য ঘরের এটাই নতুন উপকরণ। একটা চিনেমাটির প্লেট অবশ্য রয়েছে কিন্তু ওটা বার করে দিতে হবে। রীণা ভাত খেতে বসে রতনকে বাথরুমে পাঠিয়েছিল, সাবানজলে ভিজিয়ে রাখা বালিশের ওয়াড়গুলো কাচতে। ডাইনিং স্পেশ অর্থাৎ দালান থেকে শোবার ঘরের দরজায় ভাতের প্লেট, তাতে ডাল—তরকারি—মাছ ঢেলে একটা অদ্ভুত খাদ্য বানিয়ে, রীণার পৌঁছতে দশ সেকেন্ডও লাগেনি।
শিকল খুলে দরজার পাল্লা ফাঁক করে, প্লেটটা মেঝেয় রেখে ঠেলে দিয়েছিল। কোনো কথা না বলে দ্রুত দরজা বন্ধ করে শিকলটা আবার তুলে দেয়। রাহুল খুব তৃপ্তিভরে প্লেটটা শেষ করেছিল। ঘোঁট পাকানো খাদ্য খেতে তার কোনো অসুবিধা হয়নি।
রীণা খাটে বালিশে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে। স্কুলের শাড়িটা বদলায়নি। একদৃষ্টে সে ছোটো ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে কী ভাবছে। রতন বাইরে থেকে কী জিজ্ঞাসা করল, রীণা মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘টেবিলেই থাক, দরকারি জিনিস। তুমি হাত দিয়ো না।’ তারপর কী ভেবে উঠে ঘরের বাইরে গেল আর ফিরে এল খবরের কাগজে মোড়া দড়িবাঁধা একটা প্যাকেট হাতে। সেটা ছোটো টেবিলের উপর রেখে লেখার প্যাড আর কলম নিয়ে খাটে উপুড় হয়ে লিখতে শুরু করল।
জোড়ের ফাঁক দিয়ে রাহুলের মনে হল সে যেন থিয়েটার দেখছে। রীণা জানে সে এই ঘরে যা কিছু করুক বা বলুক, সবসময়ই তার একজন দর্শক আছে। হোক না স্বামী, আড়াল থেকে কেউ সদাসর্বদা লক্ষ করতে থাকলে সেও আড়ষ্ট হয়ে যাবে। এক ধরনের নজরবন্দি দশার মধ্যে থাকতে থাকতে ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। রাহুল এটা অনুভব করতে পারলেও, নিরুপায়।
যদি রতন না থাকত, তা হলে কত স্বচ্ছন্দে রীণা এই দরজাটা খুলে রেখে তার কাজকর্ম করতে পারত! রতনকে বিদায় করা দরকার।
একটা চিঠি লিখল রীণা। কাগজটা ভাঁজ করে সে ঘরের বাইরে গেল। রতনের সঙ্গে কথা বলছে। কী চিঠি? কাকে চিঠি?
‘চা আমি করে নিচ্ছি। তুমি আগে এটা দিয়ে এসো।’
