কথাটা রেবতীর কানে গেল কি না সে বুঝল না। রাস্তার লোকেরা ওর দিকে তাকাচ্ছে। রকে যারা বসে ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে। বারান্দা থেকে ঝুঁকে আছে কয়েকটা মুখ।
দিলীপ ভড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। ‘দেখা হল?’
‘হ্যাঁ।’
কোনো কথা না বলে ওরা গাড়িতে উঠল। স্টার্ট দিয়ে মাথা নীচু করে দিলীপ ভড় তাকাল।
‘চলি তা হলে, আবার দেখা হবে।’
ফিরে এসে অনন্ত গুম হয়ে বসে রইল। রেবতী কিছুই বলল না। ঘর নিশ্চয়ই পছন্দ হয়নি। ওর মতো ঝকঝকে মেয়ের পক্ষে এটা বসবাসের উপযুক্ত জায়গা নয়।
এই প্রথম সে তার বাসস্থানকে ঘৃণা করল। প্রত্যেকটা পরিচিত বস্তু, যেগুলোকে সে কখনো লক্ষই করত না, তার চোখে কুৎসিত হয়ে দেখা দিচ্ছে।
অনন্ত ফাঁপরে পড়েছিল বিয়ের ব্যাপারে। সে একা, বিয়ের কাজকর্ম দেখার, করার কেউ নেই। উপরের জেঠিমা, কাকিমাদের বলা যায়, কিন্তু সে রাজি নয়। অলুকে জানানোর ইচ্ছে নেই, অনু হয়তো আসতে পারবে না, মা—র পক্ষেও আসা সম্ভব নয়।
‘এই নিয়ে এত চিন্তার কী আছে, আমার ওখান থেকে হবে…আমার ক্যামাক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটটা তো খালিই পড়ে আছে। ওখান থেকেই বর যাবে, কনে নিয়ে ফিরেও আসবে।’
দিলীপ ভড় নিমেষে সমস্যাটার সমাধান করে দেয়। অনন্ত রাজি হয়। বিয়ের দিন সকালে ক্যামাক স্ট্রিটে ‘মধুবন’ বাড়ির সাততলায় অনন্তের পৌঁছনোর কথা। দালানের দরজায় তালা দিয়ে বিয়ের জন্যে কেনা জুতো, পাঞ্জাবি, ধুতিতে ভরা নতুন সুটকেসটা হাতে নিয়ে বেরোবার সময় তার মনে হল দোতলায় খবরটা দেওয়া উচিত। জন্ম থেকে ওরা তাকে দেখছে।
কাকিমা রান্নাঘরে ছিলেন, অনন্তকে দেখে কৌতূহলে বেরিয়ে এলেন খুন্তি হাতেই।
‘কাকিমা আজ আমার বিয়ে।’
‘য়্যাঁ…ওম্মা, কোথায় বিয়ে হচ্ছে? জোগাড়যন্তর কই, ও দিদি শুনে যাও অনন্তের আজ বিয়ে।…এ বাড়ি থেকে হচ্ছে না?…আজকেই!’
জেঠিমা বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। অনন্তকে লাজুক দেখাচ্ছে।
‘হঠাৎই ঠিক হয়ে গেল জেঠিমা। আপনাদের জানাবার পর্যন্ত সময় পাইনি…এক বন্ধুর বাড়ি থেকে বিয়েটা হচ্ছে। এখানে কে করবে—টরবে, তাই বন্ধুর বাড়ি থেকে।’
‘কেন রে আমরাই করতুম।’
‘আবার কেন আপনাদের ঝামেলায় ফেলব।’
‘বিয়ের কাজ কি ঝামেলার কাজ বাবা? আমাদের তুই পর ভাবলি!’
‘না না সে কী কথা। আপনাদের সাহায্য ছাড়া কি আমাদের চলত।’
‘খুব ভালো করেছিস। এই সেদিনই বলাবলি করছিলুম অনন্তর এবার বিয়ে করা উচিত। রোজগেরে ছেলে, এভাবে বাউণ্ডুলের মতো থাকবে কেন, রেঁধে দেবারও কেউ নেই।’
‘দিদি তো বলছিল জোর করে তোর বিয়ে দিয়ে দেবে। মেয়ের বাড়ি কোথায়…কে কে আছে মেয়ের, অবস্থা কেমন, বল সব।’
‘আমার মতো অবস্থা, বাবা নেই। দুই বোন এক ভাই আর মা।’
‘চাকরি করে?’
‘মেজোবোন স্কুলে পড়ায় বাইরে থাকে। এরা থাকে সিমলেয়। কাউকে নেমন্তন্ন করিনি, বউভাতে করব।’
‘আগে যদি বলতিস, আমরাই সব ব্যবস্থা করে দিতুম।’
দু—জনকে প্রণাম করে সে বেরিয়ে পড়ল। ট্যাক্সি থেকে নেমে, মধুবনের সাততলায় পৌঁছে যখন সে কলিংবেল টিপল তখন বেলা প্রায় এগারোটা। পাজামা শার্ট পরা এক ছোকরা দরজা খুলে হেসে তাকে ভিতরে আসতে বলল।
‘আপনার নামই তো অনন্ত দাস?’
‘হ্যাঁ।’
‘বাবু সকালে টেলিফোনে বলে দিলেন, আপনার গায়ে হলুদ ছুঁইয়ে মেয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে। ড্রাইভার হলুদ দিয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি জামা খুলুন।’
বড়ো দালানের মতো বসার জায়গায় মোটা কার্পেটে মেঝে ঢাকা, সাদা দেয়াল, এককোণে দুটো বড়ো সোফা তার বাঁ দিকে বারান্দা। দেয়ালের ধারে একটা শূন্য টেবল ছাড়া আর কোনো আসবাব নেই। তিনটে বন্ধ দরজা সে দেখতে পাচ্ছে, বোধহয় শোবার ঘরের। অনন্ত কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেল। এমন একটা নির্জন পরিবেশ সে আশা করেনি। সুটকেস টেবলে রেখে সে জামা খুলল। ছোকরা তার শরীরের যত্রতত্র হলুদ ছুঁইয়ে পেতলের রেকাবিটা নিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় বলল, ‘আপনি কি উপোস দিচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিচেনে বিস্কুট আছে, বাদাম আছে, খেতে ইচ্ছে করলে খাবেন। বেডরুম খোলা আছে। আমি গায়ে হলুদ পৌঁছে দিয়ে টোপর, মালাটালা কিনে নাপিত, পুরুত সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসব।’
অনন্ত সোফায় বসে রইল অনেকক্ষণ। একবার বারান্দায় গিয়ে নীচের রাস্তা দেখল। তিনটে দরজার একটা রান্নাঘরের। জলতেষ্টা পেয়ে যাচ্ছে। বেসিনের কল থেকে গ্লাসে জল নিয়ে খেল। মেঝেয় একধারে চারটে মদের খালি বোতল। ফ্রিজের পাল্লা খুলে দেখল একদমই ফাঁকা।
সে শোবার ঘরে এল। দেওয়াল ঘেঁষে চওড়া খাট। ছোটো নীচু টেবলের উপর টেলিফোন। দেওয়াল আলমারি ছাড়াও রয়েছে ছোটো একটা স্টিল আলমারি, ছোটো দুটি চেয়ার, মেঝেয় কার্পেট, লাগোয়া বাথরুমের দরজা। বিপরীত দেওয়ালে মদের রঙিন ক্যালেন্ডারে আলস্য ভাঙছে আড়মোড়া দিচ্ছে এক নগ্ন বিদেশিনী। ছবিটা দেখেই ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল তার দুটো কান। পেটের মধ্যে যাবতীয় বস্তু কুঁকড়ে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে সে টানটান হয়ে সোফায় শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নের মধ্যে কাটাতে কাটাতে অনন্ত বিয়ের রাত পেরিয়ে এল। সকালেও তার মনে হল অবাস্তব এক জগতের মধ্যে সে বাস করছে। সন্ধ্যার সময় বর—বউ দিলীপ ভড়ের মোটরেই মধুবনের ফ্ল্যাটে এসে উঠল। রাতটা সে কাটাল সোফায়, রেবতী ঘরে শুয়েছিল দরজায় চাবি দিয়ে।
দশ
অদ্ভুত সময়, অদ্ভুত জীবনের মধ্যে অনন্ত নেমে যাচ্ছে যেভাবে মানুষ চোরাবালিতে নামে। শেষবারের মতো দুটো হাত বার বার মুঠো করে একটা শক্ত অবলম্বন পাবার জন্য যেমন আঁকুপাঁকু করে, রেবতীকে আঁকড়ে অনন্ত তেমনি চেষ্টা শুরু করল। সে জানে তার দেরি হয়ে গেছে, তার গলা মুখ চোখ ডুবে গেছে, বাকি আছে উঁচু করে তোলা হাতদুটো। সে জানে জীবনকে শুষে নিতে যত বেশি ব্যগ্র হবে তত দ্রুত তলিয়ে যাবে। রেবতীকে তাই সে সমীহ করে।
