‘তুমি কি বেরোবে এখন?’
‘হ্যাঁ, স্কুলে যাব।’
‘আজ জন্মাষ্টমী…।’
‘বন্ধ থাকলেও, গার্জিয়ান কমিটির সঙ্গে বসতে হবে। ওদের কিছু কমপ্লেন আর সাজেশানস—।’
‘কিন্তু আমার সঙ্গে যে তোমার একবার বসা দরকার। কেন, কীজন্য, কীভাবে…তোমার কি জানতে ইচ্ছে করছে না? পুলিশের কাছ থেকে, খবরের কাগজ থেকে, লোকজনের মুখ থেকে নিশ্চয় অনেক কিছু শুনেছ। কিন্তু আসল লোকটির কাছ থেকে কি—’
‘যা শুনেছি সেটাই যথেষ্ট।…আমি ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছি। আর কিছু শোনার নেই।’
রাহুল লক্ষ করল রীণার চোখমুখ কঠিন হয়ে উঠল। বেশ বোঝা যাচ্ছে, ও এখন তার কথা বিশ্বাস করবে না। ধরেই যেন রেখেছে, রাহুল বানিয়ে বানিয়ে একটা গল্প ফাঁদবে।
‘ঘরটা পরিষ্কার করা দরকার আর কুঁজোটা।’
‘রতন রোজ জল ভরে। কুঁজোটা দেখতে না পেলে জিজ্ঞাসা করবে।’
‘বলবে ভেঙে গেল, ফেলে দিয়েছি।…আমার খাওয়া—দাওয়ার ব্যবস্থাটা ভাবতে হবে। বাথরুমে যাওয়ার দরকার হলে…’ রাহুল তাকিয়ে রইল রীণার মুখের দিকে।
‘আজ স্কুলে না গেলেই নয়?’
‘হ্যাঁ, যেতেই হবে।’
রাহুলের এখন বলতে ইচ্ছে করছে, তার থেকেও জরুরি আমার জন্য তোমার আজ এখানে থাকা। বদলে তার মুখ থেকে আবেদনের মতো বেরিয়ে এল, ‘নাইবা গেলে। কী আর এমন গুরুতর কথা—।’
রীণার মুখে বিরক্তি জমে উঠেছে দেখে সে থেমে গেল।
‘তোমার ঘরটা পরিষ্কার করে দি।’ রীণা ঝাঁটা আনতে ঘরের বাইরে গেল।
তোমার ঘর! রাহুল ভাবল, তা হলে তার একটা আলাদা অস্তিত্ব তৈরি হল। দু—জনের মধ্যে ব্যবধান মনে মনে হয়তো এসে গেছে। সে ডাবল বেড খাটের দিকে তাকাল। মাথার বালিশদুটো আর পাশাপাশি নেই, এখন একটার উপর আর একটা। রীণা আলমারি থেকে বেডকভার বার করে তাকে দিয়েছে। বিছানায় পাতা প্লেইন সবুজটা দেয়নি, বালিশটাও দেয়নি। দেখতে না পেয়ে যদি রতন প্রশ্ন করে, বালিশ—বেডকভার গেল কোথায়?
এখন প্রতি পদে তাদের ভাবতে হচ্ছে রতন যেন কিছু সন্দেহ না করে। রতনের চোখে যেন না পড়ে।
রীণার ঝাঁট দেওয়া এক মিনিটেই শেষ। মেঝেয় জায়গা কোথায় যে ঝাঁটা বুলোবে। সে বালতিতে জল আর ন্যাতা নিয়ে এল। দু—তিনবার মুছল।
‘ঘরের প্রায় সব জিনিসগুলো ফেলে দেওয়া দরকার। কোনোটাই কাজে লাগে না অথচ রেখে দেওয়া হয়েছে।’ রাহুল বিরক্ত স্বরে বলল।
‘এসব তুমিই রেখেছ। তোরঙ্গটা কী দরকার ছিল রাখার। তুমিই বললে পুরোনো বই, ম্যাগাজিন ওর মধ্যে রেখে দাও। কিন্তু ওই বই—ম্যাগাজিনগুলোই বা রাখার কী দরকার? কেউ তো একবারও উলটেও দেখল না এতদিনে।… এসবই উঞ্ছ মানসিকতা।’ রীণার গলার স্বর উচ্চচগ্রামে উঠেছে। সভয়ে রাহুল হাতটা বাতাসে থাবড়ে থাবড়ে তাকে গলা নামাতে ইশারা করল।
জানালায় পর্দা ঝুলছে। অন্য বাড়ি থেকে দেখা যাবে না ঘরের মধ্যেটা। ট্রানজিস্টারটা কোথায়? টিভি কেনার পর রেডিয়ো আর শোনাই হয় না। ব্যাটারিও নিশ্চয় নিঃশেষ। তারা দু—জন কথা বলার সময় ট্রানজিস্টারটা চালিয়ে দিলে একটা ভয় থেকে রেহাই মিলবে।
‘আজই ট্রানজিস্টারের ব্যাটারি আনিয়ো, আর ধূপ।’
‘ধূপ কীজন্য?’
‘ঘরে বিশ্রী ভ্যাপসা একটা গন্ধ। ধূপ জ্বালালে তবু কিছুটা কমবে।’
‘ধূপের গন্ধ আর ধোঁয়া দরজার ফাঁক দিয়ে যখন এঘরে আসবে আর রতন ধরে নেবে নিশ্চয় আগুন—টাগুন ধরে গেছে আর তাই ভেবে তাড়াতাড়ি দরজা ঠেলে যখন ঢুকবে তখন তো ভূত দেখার মতো চিৎকার শুরু করবে।’
রাহুল অপ্রতিভ হয়ে প্রসঙ্গটা ঘোরাবার জন্য বলল, ‘ন্যাপথলিন কিনে এনো, গন্ধ হবে পোকামাকড়ও পালাবে।’
‘তুমি কি ওই ঘরে পাকাপোক্তভাবে বাস করার কথা ভাবছ নাকি!’ রীণা জিজ্ঞাসা করল না, শুধু সারাজীবনে যত বিস্ময় সে সঞ্চয় করেছে, সেগুলো একসঙ্গে প্রকাশ করল তার গলা দিয়ে।
রাহুল জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রইল। কারণ সে নিজেও এখন পর্যন্ত জানে না, সে কী করবে। শুধু জানে, তাকে বাঁচতে হবে।
‘এভাবে কতদিন লুকিয়ে থাকবে?’
‘যতদিন সম্ভব…যতদিন—’
সদর দরজার কলিং বেল বেজে উঠল। কথা অসমাপ্ত রেখে, রাহুল ছিটকে তার কুঠুরিতে ঢুকে দরজা বন্ধ করল, ভিতর থেকে খিল বা ছিটকিনি নেই। সে দরজায় পিঠ দিয়ে পা ছড়িয়ে বসল।
৩
খবরের কাগজে যা কিছু বেরিয়েছে রাহুল তা পড়েছে। মেয়েটার বাড়ি রানাঘাটে। রোজই কলকাতায় আসত ‘দেহ বিক্রয় করে’ রোজগারের জন্য। বয়স পঁচিশ। নাম ছবি। তাকে নিয়ে রাত আটটা নাগাদ জনা চারেক লোককে অন্ধকার মাঠের দিকে হেঁটে যেতে দেখা গেছিল বলে এক স্থানীয় চা—ওয়ালা জানায়। ওই মাঠে লোকগুলি ছবিকে পরপর ধর্ষণ করার পর তাকে গলা টিপে মারে। ছবির দেহে অলংকার বা তার হাতব্যাগে টাকা পাওয়া যায়নি। মনে হয় গহনা বা টাকার জন্যই তাকে খুন করা হয়েছে। ধর্ষণকারীদের মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় কাছেই পাওয়া যায়।
তাকে বাঁশ দিয়ে মাথায় মেরে খুন করা হয়। পুলিশের অনুমান এই খুন গহনা বা টাকার ভাগ নিয়ে বিবাদেরই ফল। নিহত ব্যক্তির নাম শ্যামল, সে ঘটনাস্থলের আধমাইল দূরের শীতলাতলার বাসিন্দা। তার নামে কয়েকটি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা আছে। আততায়ীরা কেউ ধরা পড়েনি, তবে পুলিশ জোর তল্লাশ চালাচ্ছে। তাদের ধরার মতো সূত্র পুলিশ পেয়েছে।
রাহুলকে ভাবিয়েছে ওই ‘ধরার মতো সূত্র’ কথাটা। সে কিছু কি ফেলে এসেছে মাঠে? কলম, রুমাল, ঘড়ি, জুতো, মানিব্যাগ, কাপড়ের টুকরো, মাথার চুল?…হাতের ছাপ, পায়ের ছাপ? হ্যাঁ বাঁশের খোঁটাটায় হাতের ছাপ থাকতে পারে, কিন্তু তারপরই তো জোরে বৃষ্টি নেমেছিল। হাতের বা পায়ের ছাপটাপ কি আর তাতে ধুয়ে যায়নি? তা ছাড়া কিছুই তো সে ফেলে আসেনি?
