‘আমি তো দাঁড়িয়েছিলুম দোকানের সামনে’, ছেলেটি উত্তেজিত স্বরে বলল। ‘দূর থেকে পুলিশের গাড়িটা আসছে, সার্চ লাইটের আলো। আমাদের গলি থেকেই তো বোমাটা ছুড়ল।’
‘ওভাবে তখন দাঁড়িয়ে থাকে?’ রীণার আদুরে ধমক রাহুল শুনল।
‘দাঁড়াব না তো কী করব, সব বাড়ির ছাদে, বারান্দায় লোক, তা ছাড়া রাস্তার সব আলো নেভানো, সব বাড়িরও। সে যে কী অন্ধকার কী বলব, একটা হাতিও যদি তখন হেঁটে যায় তো কেউ দেখতে পেত না। আর পুলিশের গাড়িগুলো বুনো শুয়োরের মতো ঘোঁত ঘোঁত করে ছুটে যাচ্ছে আর আসছে। বোমাটা পড়তেই দাদা শব্দ শুনে আমার হাত ধরে এমন টানল যে বেটাল হয়ে পড়ে গেলুম আর সেই মুহূর্তে গুলিটা এসে দেওয়ালে লাগল। যেখানে দাঁড়িয়েছিলুম তার এক ইঞ্চি কী দু—ইঞ্চি দূরে।’
‘ইসস’ রীণা শিউরে উঠল শব্দ করে, ‘কী ছেলে বল তো! যদি দাঁড়িয়ে থাকতে তা হলে কী হত?’
ছেলেটি তাচ্ছিল্য দেখাতে ট্রাউজার্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে পা—দুটো ফাঁক করে দাঁড়াল।
রাহুল আন্দাজ করল রীণা এখন ড্রেসিং টেবলটার সামনে দাঁড়িয়ে। কী করছে ওখানে? চিরুনি? টিপ? পাউডার? এই সবের কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত? ছেলেটি খাটে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। অর্থাৎ কিছুক্ষণ থাকবে।
‘তোমায় যে চা করে দেব তারও উপায় নেই। চিনি একদম ফুরিয়েছে।’
‘রেশন আনাননি? দোকান তো খোলা দেখলুম।’
‘তাই নাকি!’
রীণাকে দেখা গেল। সবটা নয়, ডান হাঁটু, ডান বাহু ইত্যাদি। ছেলেটির থেকে দু—হাত ব্যবধান। রতনকে ডেকে রেশন কার্ড আর টাকা দিয়ে দোকানে পাঠাল।
ঘামে সপসপ করছে জাঙিয়া। আজ ছ—দিন ধরে সে এটা পরে রয়েছে। জামাটা ছাড়া আর কিছুই শরীর থেকে খোলা হয়নি। এখনি চান করে পরিষ্কার পাজামা পরতে হবে।
ট্রাউজার্সটা খুলে সে সারা শরীরের ঘাম মুছল। দেওয়ালে পিঠ দিতেই ঘামটা শুষে নিল চুনবালি। দু—হাত তুলে মুখোমুখি হয়ে সারা শরীর দিয়ে দেওয়ালটাকে আঁকড়ে ধরল। ও ঘরে কী কথা হচ্ছে শোনার আগ্রহ তার নেই। বাতাসহীন, প্রায়ান্ধকার ভ্যাপসা গন্ধওয়ালা এই ছোট্ট ঘরটা তাকে উদব্যস্ত করে তুলছে। কানের পিছন, ঘাড় এবং কণ্ঠা দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। উলঙ্গ হয়ে রাহুল মেঝেয় গড়াগড়ি দিতে থাকল।
আর কথা হচ্ছে না। রাহুল উঠে দরজার জোড়ে চোখ রাখল। ঘরে কেউ নেই। ছেলেটা বোধ হয় চলে গেছে। রতনের ফিরতে অন্তত একঘণ্টা, নখ দিয়ে সে দরজা আঁচড়াতে শুরু করল।
রীণা আসছে না। টোকা দিল। তবুও আসছে না, জোরে ধাক্কা দিল কয়েকবার। হঠাৎ একটা সবুজ রং এগিয়ে এসে কালো হয়ে চোখের সামনে দাঁড়াল। রাহুল পিছিয়ে এল।
দরজাটা খুলেই রীণা অস্ফুট শব্দ করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। রাহুল দ্রুত ট্রাউজার্সটা পরতে পরতে বলল, ‘চান করব। ভীষণ গরম, আমি আর পারছি না…আমি চান করব।’
‘রতন এসে পড়ে যদি!’
রাহুল শুনতে পেল না কথাটা, হামা দিয়ে ততক্ষণে বাথরুমের দিকে যেতে শুরু করেছে। রীণা তার পিছনে পিছনে এল। বাথরুমে ঢুকেই রাহুল বলল, ‘আমার পাজামাটা দাও, শিগগিরি।’
রীণা দ্রুত ঘরে এল। সময় এখন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। রতনই নয় অন্য কেউও এখন এসে পড়তে পারে। লন্ড্রিতে কাচা পাজামাটা রীণার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে রাহুল বাথরুমের দরজা বন্ধ করল। ছোটো মগে বার বার জল ঢালার ধৈর্য এখন তার নেই। ট্রাউজার্স সমেত সে চৌবাচ্চচায় নেমে পড়ল।
মিনিট পাঁচেক পর দরজায় টোকা পড়তে রাহুল চৌবাচ্চচা থেকে উঠল।
‘কে?’
‘আমি, তাড়াতাড়ি নাও।’
‘হ্যাঁ, নিচ্ছি।’
‘প্যান্টটা কী করবে?’
রাহুল প্রথমে বুঝতে পারল না। জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে খেয়াল হল, ভিজে ট্রাউজার্সটা প্রকাশ্যে শুকোতে দিলে রতনের কৌতূহলী প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। অবশ্য ছোটো ঘরটায় নিয়ে গিয়ে তোরঙ্গটার উপর মেলে দিলে কোনো সমস্যা দেখা দেবে না। রাহুল এই প্রথম একটা জটিল অসুবিধার পাশ কাটাতে পেরে হালকা বোধ করল।
বাথরুমের ব্র্যাকেটে সাবান, মাজন এবং দাড়ি কামাবার সরঞ্জামগুলোয় তার চোখ পড়তেই সে অবাক হয়ে ভাবল, এগুলো ছাড়াই সে কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফেলল কী করে? নিশ্চয় তার মুখে দুর্গন্ধ, শরীরে দুর্গন্ধ। গালে তালু ঘষল। কিন্তু এখন নিজেকে পরিষ্কার করার মতো সময় তার হাতে নেই।
রীণা আবার দরজায় টোকা দিল। রাহুল চৌবাচ্চচার খোলা জলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হয়ে গেছে। যাচ্ছি।’
ফিরে আসার সময় তার মনে হল, চার হাত—পায়ে চলাটা তো বেশ সহজই। যেন দু—পায়েই হাঁটছি। এটায় যেন শৈশবে ফিরে যাওয়ার মজা রয়েছে। আর একটু বাড়িয়ে ভাবলে, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ হওয়ার অভিজ্ঞতা পাওয়া যাচ্ছে। দাঁত মাজা নেই, দাড়ি কামানো নেই, চুল আঁচড়ানো নেই…আছে অতর্কিত ভয়ের আক্রমণ।
বিষণ্ণ, করুণ চোখে রীণা তাকিয়ে দেখছে। ভিজে ট্রাউজার্সটা কাঁধে রেখে হামা দিয়ে যেতে যেতে রাহুল ঘাড় তুলে তাকাল, হাসল। জীবনটাকে নিছকই মুক্ত রাখার জন্য চার—পেয়ে হওয়া, এতে দুঃখ পাবার কী আছে! শোবার ঘরে পাখা ঘুরছে। রাহুল হাওয়ার নীচে বসল।
‘রতন ফেরার আগেই আমাকে চাট্টি ভাত দিয়ো।’
‘এখনও তো কিছু রান্নাই হয়নি।’
‘এই ছেলেটাই কি অনুর সীতাংশু?’
‘হ্যাঁ।’
‘এসেছিল কেন?’
‘যদি অনুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়! অনুও তো সকালে একবার ঘুরে গেছে। শোবার ঘরে ঢোকেনি বলে তুমি জানতে পারোনি।’
