কিন্তু ভ্যাপসা গরমটা ক্রমশই অসহনীয় লাগছে। ওঘরে পাখা ঘুরছে। পুরোনো কিছু খবরের কাগজ একধারে ছড়ানো। তারই একটা ভাঁজ করে নিজেকে সে হাওয়া দিতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই বিরক্ত লাগায় কাগজটা ছুড়ে ফেলল। এতে গরমবোধ যেন আরও বাড়ল। বাইরে হাওয়া আছে কি না লক্ষ করার জন্য জানালা দিয়ে তাকাল। ছাতের পাঁচিলে মেলে দেওয়া একটা শাড়ির প্রান্ত ঝুলছে ঠিক জানালা বরাবর। হাওয়া নেই তাই দুলছে না।
সে ভাবতে চেষ্টা করল শাড়িটা কার? অনুর না তার দিদি তনুর? এই শাড়িটা পরেই, যতদূর মনে পড়ে, অনু কয়েকবার তাদের ফ্ল্যাটে এসেছে আবার তনুকেও এটা পরে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। তনু কয়েকবার এসেছে, অতি লাজুক, রান্নাঘর আর ছাদের বাইরে গেলে দিশাহারা হয়। ঠিক বিপরীত প্রকৃতির অনু। দিনে বারদুয়েক তো এই ফ্ল্যাটে সকালে বা সন্ধ্যায় আসবেই।
রাহুলরা প্রথম যখন এখানে এল অনু তখনই ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরেছে। এক ছুটির দুপুরে ও রীণাকে শুনিয়েছিল সীতাংশুকে তার কতখানি ভালো লাগে আর সীতাংশুও প্রতি চিঠিতে সেই কথাই জানিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা চিঠি সে রীণাকে পড়িয়েও ছিল।
‘এইটুকু মেয়ের সঙ্গে এইসব নিয়ে কথা বলো কেন?’ রাহুল ভর্ৎসনা করেছিল।
‘ওইটুকু মেয়ে!…সীতাংশু ওকে কত পর্নো লিটারেচার পড়িয়েছে জানো?’
‘জেনে দরকার নেই…সীতাংশুটা কে?’
‘মোড়ের ব্যানার্জি মেডিকোর ছেলে। দাদার স্কুটারে চেপে মাঝে মাঝে এখান দিয়ে যায়। পয়সা আছে। অনুর দুখ্যু, সোনার বেনে না হয়ে যদি সে বামুনের ঘরে জন্মাত! একদিন জিজ্ঞেস করল, ‘বউদি আপনাদের বিয়েতে জাত নিয়ে আপত্তি ওঠেনি?’ আর একবার জানতে চেয়েছিল, ‘যদি আপত্তি উঠত তা হলে কী করতেন?’
রাহুলের মনে পড়ল একটা দৃশ্য। মাস তিনেক আগে দেখা। লুকিয়ে সীতাংশুর সঙ্গে ছবি তোলাতে যাবে বলে অনু রবিবার বিকেলে এসেছিল রীণার একটা ছাপা পলিয়েস্টার শাড়ি পরতে আর চুল বাঁধতে। সেই সময় রাহুল অফিসের এক ক্লায়েন্টকে লাঞ্চ খাইয়ে, আড্ডা দিয়ে ফেরে। ওর আসাটা অনু টের পায়নি। ঘরে ঢুকতে গিয়ে রাহুলকে থমকে পড়তে হয়। অনু দু—হাত তুলে স্লিভলেস ব্লাউজের পিঠের হুক লাগাচ্ছে। পরনে শায়া। তাকে দেখেই কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে, পিছন ফিরে অনু ড্রেসিং টেবলের উপর কুঁকড়ে ঝুঁকে পড়ল, রাহুল দ্রুত সরে যায়। রীণা তখন রান্নাঘরে পুডিং তৈরিতে ব্যস্ত।
দৃশ্যটা—কুঁজো হওয়া একটা সতেরো—আঠারো বছরের ডাঁটো দেহ, ব্লাউজ ও শায়ার মাঝে কোমর বেড় দিয়ে বাদামি রেশমের মতো মসৃণ কোমল ত্বক, নিতম্বের উপর আধময়লা সাদা শায়ার মাঝ দিয়ে একটা ভাঁজ—সে বহুদিনই মনে মনে চোখের সামনে পুঙ্খানুপুঙ্খ ফুটিয়ে তুলেছে। যতই দিন গেছে বরং সে যেন এর সঙ্গে আরও কিছু যুক্ত করেছে নিজের অজান্তেই।
প্রায়শই সে দেখে, অনু পিছন ফিরে ঝুঁকে পড়ছে না, শুধু চোখের পাতা নামিয়ে থরথর কাঁপছে বা যখন সে হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়াল তখনও ব্লাউজটা অনুর গায়ে দেওয়াই হয়নি। সে আরও আবিষ্কার করেছিল, এইরকম ভাবনায় রীণা তখন আর রান্নাঘরে নয়, স্কুলের কাজে আটকে পড়ে বাড়ি ফিরতে দেরি করছে। পরে রাহুল এই ধরনের দৃশ্য রচনার জন্য একটা কারণ খুঁজে পায়। সে ভেবেছিল, অনু নিশ্চয় রীণাকে তার অপ্রতিভ হওয়ার খবরটা জানাবে আর রীণা তাকে সেটা বলবে একটু সন্দিগ্ধ গলায়। কিন্তু রীণা কিছুই তাকে বলেনি অর্থাৎ অনু এটা চেপে গেছে।
এসব কল্পনা রুচিবিগর্হিত, অন্তত আমার পক্ষে শোভা পায় না, এইভাবে রাহুল বহুবার নিজেকে ধমকেছে, ভয়ও দেখিয়েছে, বিকৃত চিন্তা করতে করতে কখন কী করে ফেলবে আর মানইজ্জত নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। তবুও সে লক্ষ করেছে, অবৈধ অশ্লীল ছবি ফোটাবার মানসিক যন্ত্রটি তার আয়ত্তাধীন নয়। এই অক্ষমতা তাকে বার বার নিজের উপর রাগিয়ে তুলেছে।
কে যেন শাড়িটা তুলে নিল। কে তুলল দেখার জন্য রাহুল বুক চেপে জানালার দিকে এগোতে গিয়ে থমকে পড়ল। পুরুষের গলা শোনা যাচ্ছে ভিতর থেকে। দরজায় চোখ রাখল। ঘরে কেউ নেই। রীণা দালানে কথা বলছে কার সঙ্গে? পুলিশ? রাহুল মুহূর্তে বিদ্যুৎপৃষ্ট মৃতদেহের মতো কঠিন হয়ে গেল। মাত্র শ্রবণ ক্ষমতার দ্বারা এখন সে জীবিত। পুরুষ কণ্ঠটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ধীর লয়ে কর্তব্য সম্পাদনের পেশাদারি ভঙ্গিতে নয়, লঘু কখনো বা দ্রুত, কণ্ঠে পূর্ণমাত্রায় বন্ধুত্বের প্রকাশ।
রাহুল ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করল। এখন সে দেখছে ঘরের মধ্যে ধূম্রবর্ণ আলো, অনুভব করছে দেহের ধাবমান রক্ত, স্বেদবিন্দুতে পিছল গাত্রত্বক এবং মুখের মধ্যে অম্ল স্বাদ। কার কণ্ঠস্বর, এ তথ্য জানার কৌতূহল তার হচ্ছে না। একবার শুধু সে ভাবল, মিথ্যেই ভয় পেয়েছিলাম।
পাশের ঘরেই এবার কথা হচ্ছে। রাহুল দেখতে পেল না রীণাকে। তার বদলে একটি যুবককে দেখল যাকে সে আগে এই পাড়াতেই দেখেছে বলে মনে হল। থুতনি কর্কশ, গালে দু—একটি মরা ব্রণের গর্ত, ছিপছিপে, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, লঘু ছেলেমানুষি ওর দাঁড়াবার ভঙ্গিতে। ভালো দরজির হাতে তৈরি ট্রাউজার্স। এই কি তবে অনুর সীতাংশু? তা ছাড়া আর কে হতে পারে! কিংবা রীণার বাপের বাড়ির কেউ?
