ভাবতে ভাবতে রাহুলের মনে পড়ল গত পাঁচদিনে সে স্ত্রীলোক বিষয়ে বিন্দুমাত্রও চিন্তা করেনি। কী করে বাঁচব, কী করলে ধরা পড়ব না, শুধু এই ভাবনাতেই সে আচ্ছন্ন ছিল। আর যেইমাত্র এই ঘরের নিরাপত্তাটা পেল আর অমনি তার মন ব্যালান্স হারাতে শুরু করেছে। এটা হওয়া উচিত নয়। এখন সে বিপদের মধ্যগগনে। সামান্য অসাবধান হলে ধরা পড়ে যেতে পারে।
নিজেকে সংহত করতে, অনুভূতিগুলোকে প্রখর করতে গভীর কোনো বিষয়ের ভাবনার মধ্যে ঢুকতে পারলে ভালো হয়। রাহুলের মনে হল, আদিম মানব আর আমার মধ্যে নৈকট্য কতটা সে বিষয়ে তো ভেবে দেখা যেতে পারে!
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকনমিকস অনার্স পাওয়া ইউনাইটেড কেমিক্যালসের অ্যাসিসট্যান্ট পাবলিক রিলেশনস ম্যানেজার এবং পাঁচ হাজার বছর আগের মানুষ কিংবা কুকুর এই শিরোনামে সন্দর্ভ রচনার কথা যদি ভাবা যায়, তা হলে কেমন হয়!
.
একটা চিনেমাটির প্লেটে চারখণ্ড টোস্ট আর এক গ্লাস চা, রীণা দরজার একটা পাল্লা খুলে মেঝেয় রেখেই আবার দরজা বন্ধ করে দিল। রাহুল শিকল তুলে দেওয়ার শব্দ শুনতে পেল। গোগ্রাসে টোস্টগুলো শেষ করে তারিয়ে তারিয়ে চা—টুকু খেল। দেখে নিয়েছিল আজকের খবরের কাগজটা খাটের উপর। দেখে একবার ইচ্ছে হয়েছিল জানতে কলকাতায় কোথাও নারী ধর্ষণ হয়েছে কি না আর ভিভ রিচার্ডস ছিয়াশি নট—আউট ছিল, শেষ পর্যন্ত কত করল! জন্মাষ্টমী আজ। রীণার স্কুল নিশ্চয় বন্ধ। সারাক্ষণ বাড়িতে থাকলে ভালোই। কোনো কিছুর দরকার হলেই ডেকে বলা যাবে। কিন্তু কীভাবে ডাকব? রাহুল বিভ্রান্ত বোধ করল। এত তুচ্ছ অথচ বিপজ্জনক একটা সমস্যার আবির্ভাব ঘটতে পারে তা ধারণা করতে পারেনি। গলা থেকে কোনো স্বর বার করা যাবে না। কুকুর অন্তত কুঁইকুঁইও করতে পারে। দরজায় টোকা দেওয়া যায়। কিন্তু রতন যদি ঘরে থাকে আর শুনতে পায়!
রাহুল ভেবে দেখল, প্রথমেই এই সমস্যাটা মেটানো দরকার। তার কাছে এখন সবথেকে জরুরি বিষয়, রীণাকে ডেকে প্রয়োজন জানাবার উপায় আবিষ্কার করা। কিন্তু শূন্য চিনেমাটির প্লেট আর গ্লাসটা চোখের পক্ষে পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। প্রোডাকশান ম্যানেজার কৃষ্ণমূর্তির বাড়ির বারান্দায় এইরকম প্লেট, অবশ্য কলাইয়ের, সে দেখেছে। আলসেশিয়ানটা সেখানেই বাঁধা। প্লেটটা তার পাশে থাকে আর একটা বাটিতে জল। রাহুলের মনে হল, জল তেষ্টা পেলে সে কী করবে! ঘরের কুঁজোটা এনে রাখা ছাড়া উপায় নেই। রোজ তাতে জল ভরার কাজটা রীণাকেই করতে হবে।
ঘরের বাইরে রীণার ক্রুদ্ধ স্বর শোনা যাচ্ছে। জোড়ের ফাঁকে চোখ রেখে সে দেখতে পেল না। নখ দিয়ে দরজা আঁচড়াতে লাগল যদি শুনতে পায়। রীণা ঘরে ঢুকল, পিছনে রতন। রাহুল আঁচড়কাটা বন্ধ করল।
‘পই পই করে বলেছিলুম গোলমাল হতে পারে, কাপড়গুলো এনে রাখ, এনে রাখ। এখন আমি এই ময়লা শাড়ি পরে থাকব? একটা বুড়ো ভূত কোথাকার। কথা বললে শোন না কেন? অন্য কোনো বাড়িতে এমন কর্তামি করলে দূর করে দিত।’
রতনের জবাব শোনা গেল না। এখন ওর মুখ দেখা যাচ্ছে না, সেটা ভালোই। যন্ত্রণাকাতর বৃদ্ধমুখ অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
‘দাঁড়িয়ে থেকে আর কাজ বাড়িয়ো না, ওদিকে ভাতের তলা ধরে গেল হয়তো! তবে এই বলে রাখছি এবার যদি কথামতো কাজ না কর, তা হলে অন্য জায়গায় কাজ খুঁজে নিতে হবে।’
রাহুল চিন্তায় পড়ল। রতন কোথাও যাবে না বা ওর কোথাও যাবার জায়গা নেই। কিন্তু বলা যায় না, যেসব ভাইপোর কথা প্রায়ই বলত, হাতে করে মানুষ করেছি, এখন ভালো রোজগার করে, যারা প্রায়ই নাকি বলে, ‘কাকা আমাদের কাছে এসে থাক, দরকার কী বুড়ো বয়সে কষ্ট করে’—তাদের কেউ এসে যদি রতনকে এখন নিয়ে যায় তা হলে নতুন একটা লোক রাখতেই হবে। নিশ্চয় কোনো মেয়েমানুষ এবং রীণার অনুপস্থিতিতে কৌতূহলবশতই হয়তো একদিন, এ ঘরটা বন্ধ থাকে কেন জানতে শিকল খুলে উঁকি দিতে পারে।
ব্যাপারটা রীণাকে বুঝিয়ে বলতে হবে। রতনের সঙ্গে কোনোরকম খারাপ ব্যবহার করা তার চলবে না। ওর অনাবশ্যক কোনো কৌতূহল নেই, অন্তত এ ঘরটা সম্পর্কে নেই। নিজের মতো করে কাজগুলো করতে দিলেই ও খুশি থাকে। তাই দেওয়া হোক, রীণা যেন কর্তৃত্ব ফলাবার চেষ্টা না করে। এখন এই সংসারে বা এই ফ্ল্যাটে কোনো রকমের পরিবর্তন ঘটানো চলবে না, পুলিশ নিশ্চয় এখনও ওয়াচ রাখছে।
রতন ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। রীণা ঘরেই আছে তবে দেখা যাচ্ছে না। রাহুল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসল। এখন তার কিছু করার নেই। জানালার খোলা পাল্লাটা দিয়ে আলো আসছে বটে, কিন্তু হাওয়া নেই। ওটা বন্ধ করলে আলো এবং হাওয়াহীন এই ঘরে কয়েক ঘণ্টার বেশি বাঁচা যাবে না। সুতরাং ঝুঁকি নিয়ে পাল্লাটা খুলে রাখতেই হবে। উপায় নেই। যারা মুক্ত সংসারে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদেরও তো ঝুঁকি নিতে হয়। যেমন রীণা। একটা খুনিকে ঘরে লুকিয়ে রাখার রিসক, হোক না স্বামী,…নিয়েছে তো! পুলিশ ঠিক কী কী প্রশ্ন করেছিল সেটা জেনে নিতে হবে। এখন পর্যন্ত নার্ভ শান্ত রেখেছে, হাউমাউ করে কান্না জোড়েনি বা প্রশ্নের পর প্রশ্ন শুরু করেনি। আচরণে, কথায় অচঞ্চল শান্ত ভাবটা বজায় রাখা সহজ ব্যাপার নয়! তার শ্রদ্ধা জাগল রীণার প্রতি।
