রতন বেরিয়ে যেতেই রীণা খাটে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল ঠিক মুখোমুখি। জোড়ের ফাঁক দিয়ে রাহুল সম্পূর্ণভাবে দেখতে পাচ্ছে তাকে। আট—ন ফুট দূরে মাত্র। স্থির দৃষ্টিতে এইদিকেই তাকিয়ে। রাহুল বুঝতে পারছে না এখন ও কী ভাবছে।
উদবেগ, রাহুলের তাই মনে হচ্ছে, আবার মনে হচ্ছে ভয় কিংবা উত্তেজনা। দুই ভ্রূর মাঝে ফুলে উঠেছে চামড়া। নিশ্বাসটা গাঢ় হচ্ছে, দ্রুত হচ্ছে। কণ্ঠনালি ওঠানামা করল ঢোঁক গেলায় আর ঠোঁট দুটি যেভাবে ফাঁক হয়ে রয়েছে তাতে মনে হয় ভিতরে প্রবল আলোড়ন ঘটছে। জানালা বন্ধ করতে সরে গেল রীণা। আবার এল। ঘরের দরজা বন্ধ করে খিল এঁটে এগিয়ে আসতেই জোড়ের ফাঁক ঢেকে গেল।
শিকল খোলার সময় লোহায় লোহায় ঘষার একটা শব্দ শুনল রাহুল। দরজার কাছ থেকে সে এক পা পিছিয়ে গেল। সন্তর্পণে পাল্লাদুটো খুলে রীণা দাঁড়িয়ে। কড়িকাঠের কাছে ঘুলঘুলি দিয়ে আলো আসছে। ফলে ওর টিকালো নাক, কানের ডগা, বাম বাহু, চুলের কিয়দংশ বেশ স্পষ্টই দেখা যায়।
‘তুমি বাথরুমে যাবে না?’
রীণা এমনভাবে বলল যেন রাহুল অন্য জগতের লোক। প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন ওর দরকার হয় কিনা, সে—সম্পর্কে যথেষ্টভাবে নিশ্চিত নয়।
‘কেন যাব না?’
‘কীভাবে যাবে?’
রাহুল চিন্তিত হল। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা। ও পাশের বাড়ির তিনটে জানালা থেকে দেখা যায়। তবে বারান্দার পাঁচিলটা কোমর সমান উঁচু। হামা দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু রতন?
‘ঠিক চলে যাব তুমি বরং রতনকে দোকানে পাঠাও।’
রীণা দরজা বন্ধ করে দিতেই রাহুলের প্রথমে মনে হল, তার স্বাধীনতার একটা বিরাট ভাগ থেকে এখন সে বঞ্চিত। নিজের দেহ বা তার প্রাকৃতিক যাবতীয় ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে চিন্তামুক্ত থাকার স্বাধীনতা আর তার নেই।
এখন থেকে বাথরুমে যাবার দরকার হলে তাকে রীণার মুখাপেক্ষী হতে হবে। ঘরের জানালা বন্ধ করে, রতনকে বাইরে পাঠিয়ে, ওপাশের বাড়ির জানালায় কেউ আছে কি না দেখে রীণা তাকে সংকেত জানালে তবে সে বাথরুমে যেতে পারবে। যদি রীণা না থাকে এবং তখন যদি বেরোবার দরকার হয়? রাহুল তা ভাবতে গিয়ে ধীরে ধীরে রেগে উঠতে শুরু করল। তার মনে হল, আত্মরক্ষার জন্য এ কোন দশায় পৌঁছালাম!
দরজা খুলে রীণা চাপা স্বরে ডাকল। উঁকি দিয়ে রাহুল দেখল, বারান্দার তারে ভিজে কাপড়টা মেলে দিয়ে অনেকখানি ঢেকে দিয়েছে কিন্তু সবটা ঢাকেনি। ঘর থেকেই হামাগুড়ি দিয়ে সে বারান্দায় বেরোল। সেই সময় একবার মুখটা ঘুরিয়ে রীণা তার দিকে তাকিয়েছিল। চতুষ্পদ প্রাণীর দিকে প্রবল কৌতূহলে শিশুরা হয়তো এভাবে তাকায়। রাহুল সেই মুহূর্তে নিজেকে কুকুর ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারল না। তাড়া খাওয়া, দু—পায়ের ফাঁকে লেজ ঢোকানো এবং করুণাপ্রার্থী! নিজেকে ধিক্কার দিয়েই সে বাথরুমে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ করার আগে শুনল রীণা বলছে, ‘রতন কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যেই এসে যাবে।’
রাহুলের মনে হল, এই আটত্রিশ বছরের জীবনে কখনো কোনো ইতর প্রাণীর সঙ্গে নিজেকে তুলনা করিনি। মেধা, বুদ্ধি, মহত্ত্ব, করুণা, ভালোবাসা, এমনকী ক্রোধ, আমার অধিগত বা জন্মগত কোনো গুণাবলি দেখবার কোনো সুযোগই এই চার দেওয়ালের মধ্যে নেই। আমি এখন ইচ্ছা করলেই কথা বলতে পারি না একমাত্র নিজের সঙ্গে ছাড়া। না গান, না হাসি। খাওয়া, মল—মূত্রত্যাগ এবং ঘুম ছাড়া আর কিছু করার নেই। অবশ্য বইপড়া, লেখা বা ঠোঙা তৈরির মতো কোনো কাজ করতে পারি। কিন্তু এগুলি আমার দেহকে বাঁচিয়ে রাখতে কোনো সাহায্যই করবে না। আমি পালিয়েছি শুধুই বাঁচার তাগিদে, আমার বিদ্যাবুদ্ধির নির্দেশ ছাড়াই ইতর প্রাণীর মতো। যেভাবে একটা সৈনিক পরিখা থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে মেশিনগানের প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই শত্রুর দিকে ধেয়ে যায় বীরত্ব দেখাতে নয়, এ ছাড়া তার বাঁচার আর অন্য উপায় নেই বলেই। সেইভাবেই পালিয়েছিলাম। জৈব অস্তিত্ব রক্ষার সহজাত প্রেরণায় এবং অসাড় মস্তিষ্কে। একে এখনও অস্বীকার করতে পারি না, এজন্য আমি নিজেকে কাপুরুষও ভাবতে পারছি না।
কিন্তু কুকুরের কথা ভাবছি। এই প্রাণীটি হয়তো—বা সাহসী, কর্তব্যনিষ্ঠ কিন্তু নিকৃষ্ট চরিত্র বোঝাবার জন্য একটা বিশেষণ। কুকুরের কয়েকটি বিশেষত্ব এখন আমাতে যে বর্তেছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অপরিচিত কেউ এলে আমি চিৎকার করতে পারব না, আগে দরজা খুলে যেমন বলেছি, ‘আরে পরিমল! অনেকদিন পর…ভেতরে আয়’—এখন আর বলা সম্ভব নয়।
কিংবা অপর একটা কুকুর দেখে তাকে কামড়াবার জন্য ছুটে যেতে পারব না যেমন গৌতমবাবুর ফ্ল্যাটে গিয়ে গরবাচভের গ্লাসনস্ত বা মারাদোনাই গ্রেটেস্ট, তাই নিয়ে তর্ক করতাম।…কুকুরদের বিবাহিত স্ত্রী থাকে না, কিন্তু আমার আছে। ফলে সুবিধাটা এই যে, কোনো কুকুরীর সহচর হওয়ার জন্য আর পাঁচটা কুকুরের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করতে হয় না।
রাহুলের মনে হল, শুধু এই ব্যাপারেই আমি কুকুর নই। রীণাকে শুইয়ে তার বুকের উপর উঠতে পারি (কখনো বাধা দেয়নি)। এই স্বাধীনতাটুকু এখনও দখলে আছে। শ্রম, বিশ্রাম, আনন্দ, সুখ এইসবের জন্য এই চার দেওয়ালের মধ্যে এবার থেকে রীণার দেহখানা সম্বল করা ছাড়া আর তার কিছু নেই।
