না হওয়ার কারণ রতনের বয়স, আনুগত্যবোধ এবং পিতৃসুলভ চালচলন। ওর বয়স ষাট—পঁয়ষট্টির মধ্যে। বরখাস্ত করলে কোথাও কাজ পাবে না, ফলে সে তটস্থ হয়ে থাকে এবং প্রাণপণে হুকুম তামিলের চেষ্টা করে অথচ বয়সোচিত কারণেই সে এই সংসারের কর্তা—গিন্নির সাংসারিক বুদ্ধিশুদ্ধির অভাবগুলি বিরক্তি প্রকাশ করে শুধরে দেয়।
শেষোক্ত ব্যাপারটি রাহুলের ভালোই লাগে। বারো বছর বয়সে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে যেত টালা পার্কে। ফিরত ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণিতে, ভাড়া ফাঁকি দিয়ে। একদিন মুখোমুখি হয়ে গেল কন্ডাক্টরের। ট্রাম তখন জোরে চলেছে। এক বৃদ্ধ হাত চেপে তাকে আগলে ধরলেন,—’অ্যাঁ পালানো হচ্ছে, নামতে গেলে যে পড়ে মরবে সে খেয়ালও কি নেই? চুপটি করে দাঁড়াও।’
গলার স্বরে কিছু একটা ছিল, যাতে রাহুলের মনে হল কন্ডাক্টর ভাড়া চাইলে এই বুড়ো তার ভাড়া দিয়ে দেবে। কন্ডাক্টর চেয়েছিল। বৃদ্ধ ভাড়া দেয়নি, হেসে বলেছিল, ‘এই বয়সেই ফাঁকি দিতে শিখছে। বড়ো হলে যে পকেট মারবে!’ ট্রাম দাঁড়াতেই রাহুল লাফিয়ে নেমে পড়ে। রাগে, অপমানে কানের ডগা জ্বালা করছিল।
তাদের সঙ্গে খেলতে যেত জ্যোতি নামে একটি ছেলে। চলন্ত ট্রাম থেকে নামায় ওস্তাদ ছিল। কন্ডাক্টরের তাড়া খেয়ে একদিন সে ডান পা—টা ভাড়া হিসাবে চাকার তলায় দিয়ে দেয়। রাহুলের মনে হয়েছিল সেই বুড়োটা থাকলে জ্যোতি খোঁড়া হত না।
তার মাঝে মাঝে মনে হত রতনই সেই বুড়োটা।
মসৃণ মেঝের ওপর চেয়ার সরাবার শব্দ হল। রাহুলের মনে পড়ল, এইভাবেই রীণা তাকে বিছানা ত্যাগের শেষ সংকেত জানাত। একদিনের কথা তার মনে পড়ল—
.
‘আটটা বাজতে চলল বিছানা তুলবে কখন?’ বলতে বলতে রীণা আয়নার কাছে মুখটা এগিয়ে এনে, সাবধানে টিপ পরল। বুক, কোমর, পাছা এবং মুখটাকে ঘুরিয়ে— ফিরিয়ে নানান ভঙ্গিতে দেখল।
‘অত করে যে দেখছ, দেখবে তো সেই বুড়োটা! সেজন্য সাজাগোজার কী দরকার? বুকের কাপড়টা একটু সরিয়ে দিয়ো আর পাছাটা সুইং করিয়ে হেঁটো, তা হলেই কাজ হবে।’ এই ধরনের কথা রীণার গা—সওয়া হয়ে গেছে। শুধু চট করে একবার দেখল রতন ঘরে আছে কি না।
‘নাও, ওঠো খুব হয়েছে। ওই বুড়োটার জন্যেই অ্যাসিসটেন্ট হেডমিস্ট্রেস হয়েছি, মনে থাকে যেন।’
‘এবং হেডমিস্ট্রেসও হবে।’
রীণা গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেল। বুড়োটা অর্থাৎ সনৎপ্রসাদ কুমার যার বড়োবাজারে ঝাড়ামশলার দোকান, দেশে জমিজমা, পুকুর, দু—খানা ফ্ল্যাট বাড়ি, একটি স্ত্রী, আটটি ছেলেমেয়ে, মা—র নামে একটি স্কুল, বৃন্দাবনে বাবার নামে ধর্মশালা। কোষ্ঠকাঠিন্যের অস্বস্তি, সন্তানাদি মানুষ না হওয়ার দুঃখ এবং যুবক থাকার ইচ্ছা প্রভৃতি আছে—তিনি রীণাকে স্নেহের চোখে দেখেন।
রাহুলের ধারণা, বুড়োটাকে যৌন ক্ষমতা হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে, তাই রীণার সান্নিধ্যে চাঙ্গা হতে চায় এবং নিশ্চয় রীণা এজন্য তাকে সচেতনভাবে সাহায্য করে। একবার এসে ঘণ্টা দুয়েক ছিল, তার মধ্যে চারবার অন্তত উল্লেখ করেছিল, ‘আপনাদের ছেলেপুলে হয়নি কেন? অ্যাঁ?’ রাহুল মুচকি হেসে প্রসঙ্গটার পাশ কাটাতে চেয়েছিল কিন্তু বুড়োটা জোঁকের মতো লেগেছিল।
‘আমার বে—র প্রথম তিন বছরেই তিন ছেলে। আমার বড়ো ছেলের দু—বছরে দুটি। বড়ো মেয়ের চার বছরে তিনটি। প্রথমদিকেই তো ছেলেপুলে হওয়া ভালো। তবে আপনারা শিক্ষিত, আজকাল আবার কত ওষুধবিসুদ বেরিয়েছে। কিন্তু বেশি বয়সে বাপ হলে ছেলেকে মানুষ করে তুলতে তুলতেই দেখবেন বুড়ো হয়ে গেছেন। আর অল্পবয়সে হলে, বয়স যখন পঞ্চাশ তখনই ছেলে রোজগার শুরু করে দেবে। ব্যস, বসে বসে তখন বুড়ো—বুড়িতে শুধু খাও আর ঘুমোও। এই দেখুন না উনসত্তর চলছে, দেখে বুঝতে পারবেন? কোনো টেনশান নেই, ছেলেরাই সব দেখাশোনা করছে।’
সনৎকুমারের মতে এই হল সংসার—ধর্মের সার কথা। আর দু—ঘণ্টা ধরে এই আলোচনাটা রীণার সঙ্গেই হয়েছিল। রাহুল খাটের এককোণে কাত হয়ে শুয়ে বাসি খবরের কাগজটা তখন পড়ার ভান করছিল। পাঁচ বছর চাকরি করে রীণা কীভাবে অ্যাসিসটেন্ট হেডমিস্ট্রেস হল, রাহুল সেটা জানার দরকার বোধ করেনি বা জানতে ইচ্ছা হয়নি। শুধু এক—আধবার মনে হয়েছিল যাদের ন্যায্য দাবি ডিঙিয়ে ও ওপরে উঠল, তারা মনে মনে ওর সম্পর্কে কী ভাবে!
কিন্তু রীণার ভাবনা, সনৎকুমার কীসে সন্তুষ্ট হয়। ফাউন্ডার—প্রেসিডেন্টের প্রত্যেকটা কথাতেই সে সায় দিল। ‘কত সামান্য থেকে আজ এইখানে উঠেছি,’ সেই কাহিনি শুনতে শুনতে নানাভাবে বিস্মিত হয়ে বুড়োকে খুশি করল। সেই রাতেই রীণা পিল খেতে প্রথম অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিল। রাগে আপাদমস্তক জ্বালা করে উঠলেও রাহুল ওর ইচ্ছায় আপত্তি করেনি, তর্কও নয়। কিন্তু তিন মাস পরও কোনো ফল না ফলায়, সে ডাক্তারের কাছে হাজির হয়েছিল।
.
‘কতক্ষণ লাগে একটা ঘর ঝাঁট দিতে? ভাত নামিয়ে নাও তাড়াতাড়ি।’
রাহুল দরজার জোড়ে চোখ রাখল। রীণা স্নান করে এসেছে, ভিজে কাপড়গুলো হাতে। বারান্দায় নিজেই মেলবে। রতন তা হলে বাজার থেকে ফিরে ঝাঁট দিচ্ছিল। এবার রান্নাঘরে যাবে। রীণা জোড়ের ফাঁক থেকে সরে গেছে। বালিশগুলো থাবড়ে ফুলিয়ে রাখতে রাখতে রতন বিছানা গোছগাছ করছে। রীণা ঘরে ঢোকামাত্র চুপ করল। এখন রীণা স্কুলে যাবার সাজ করবে। সাধারণত এই সময় আমি থাকি বাথরুমে, রাহুল জোড়ে চোখ রেখে ভাবল, তখন শায়া আর ব্রেসিয়ারটা বদলে নেয়। এটা কোনোদিন দেখা হয়নি।
