তখনই মাথার মধ্যে কে যেন ফিসফিস করে বলে উঠল: রাহুল তুমি খুনি! এখন তুমি পালাও। তারপরই সে দৌড়ল।
২
জানালা দিয়ে একফালি রোদ এসে পড়েছে। রাহুল হাত বাড়িয়ে তরল সোনার মতো রোদ তালুতে সংগ্রহ করল। হাতটা ঘুরিয়ে ধরতেই সোনায় মাখামাখি হয়ে গেল। হাতটা মেলে রেখে সে উপুড় হয়ে শুয়ে রইল।
‘এত দেরি করলে বাপু আমরা কিন্তু অন্য লোক দেখব।’
চমকে হাত সরিয়ে নিল রাহুল। জানালার উলটোদিকে সামনের বাড়ির বারান্দা। সেখানে দাঁড়িয়ে ঠিকে ঝি আর বাড়ির গিন্নি। বুকে ভর দিয়ে সরীসৃপের মতো পিছলে রাহুল পেছনে সরতেই দেওয়ালে পা ঠেকে গেল। সে ওদের দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু ওখান থেকে ওরা কি তাকে দেখতে পাচ্ছে?
বোধহয় না। ঘরটা বেশ অন্ধকার। তবু জানালাটা একসময় বন্ধ করে দিতে হবে। রাহুল অপেক্ষা করতে লাগল। কিছু পরেই বারান্দাটা ফাঁকা হয়ে গেল। কাকে যেন দাঁত মাজার জন্য তাড়া দিচ্ছে। ওদের বড়ো মেয়েটির সঙ্গে রীণার ভালোই আলাপ আছে। নাম মায়া, বছর ষোলো—সতেরো বয়স। আসা—যাওয়া করে।
রাহুল উপুড় হয়ে পড়ে রইল মেঝেয় থুতনি ঠেকিয়ে। এই ছোটোঘরের দেওয়ালের পরেই পাশের ফ্ল্যাট। চিনেমাটির বাসন ভাঙার শব্দ হল। ওপরের ঘরে কেউ চলাফেরা করছে। রাস্তায় একদল কচি গলা চিৎকার করল। সবথেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে একটা কাকের কণ্ঠস্বর। প্রচুর শব্দ একসঙ্গে নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আলাদা করে এক—একটা শব্দ বেছে নিতে গেলে বহুক্ষণ মন দিতে হয়। সে সময় কার আছে?
পা দিয়ে ভাঙা তোরঙ্গে রাহুল ধাক্কা দিল। ফাঁপা শব্দ হল। সে জানে এ শব্দটা কেউ শুনতে পাবে না। শোনার জন্য কেউ কান পেতে নেই। তার জন্য কেউ কি ওত পেতে বসে আছে? কলকাতার লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে আলাদা করে তাকে খুঁজে বার করবে পুলিশ! গোয়েন্দারা কি ওত পেতে আছে? এখানে প্রতিদিন কি তারা খোঁজ করতে আসবে, নিশ্চয় না। নজর রাখবে, কিন্তু কাল রাতে কি তারা দেখেছে এ বাড়িতে তাকে ঢুকতে? নিশ্চয় না, তা হলে এতক্ষণে ওরা নিশ্চয় এসে পড়ত।
রাহুল তোরঙ্গে আবার ধাক্কা দিল। এই শব্দটা তাকে ভরসা দিচ্ছে। অনেক কিছুর অধিকার তা হলে এখনও অটুট রয়েছে! অধিকারগুলো কী, তা অবশ্য নির্ধারণ করতে হবে। আপাতত বোঝা যাচ্ছে দিনের বেলাটা নিরাপদ।
জানালার কার্নিশ ধরে একটা বিড়াল হেঁটে গেল। একবার ঘাড় ফিরিয়েছিল, সম্ভবত বন্ধ থাকা জানালাটা হঠাৎ খোলা দেখে। তবে ভ্রূক্ষেপ না করেই চলে গেল। তার মজা লাগল। অপেক্ষায় রইল কখন আবার ও ফিরে আসে। এইভাবেই সে অপেক্ষা করত যখন সুধাংশুকে চিফ অ্যাকাউন্টেন্টের ঘরে যাবার জন্য বেয়ারা ডাকতে আসত। বলির পাঁঠার মতো সুধাংশু যেত। আর ডিপার্টমেন্টের তারা কয়েকজন মুখ লুকিয়ে হেসে অপেক্ষায় থাকত ওর ফিরে আসাটা দেখার জন্য। মত্ত ষাঁড়ের মতো সুধাংশু ছুটে আসত, ‘অসম্ভব, সন অফ এ বিচ, চাকরি ছেড়ে দোব।’
রাহুল ডান পা—টা পাশের দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। পায়ে শক্ত কিছু একটা ঠেকতেই উঠে বসল। একটা হাতুড়ি। এই ফ্ল্যাটে প্রথম আসার দিন ঠেলাগাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে টেবলের পায়াটা খুলে যায়। গৌতমের চাকর সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিল। ওর কাছ থেকে সে হাতুড়িটা চেয়ে নিয়েছিল। ফেরত দিতে ভুলে গেছে, ওরাও চেয়ে নিতে ভুলে গেছে। এত তুচ্ছ জিনিসটা!
হাতুড়িটা রাখতে গিয়ে রাহুলের কী খেয়াল হল নিজের মাথায় সেটা বার কতক ঠুকল। ব্যথা লাগে, অথচ আরামও বোধ হল। রেখে দিল। বেড়ালটা আর ফিরছে না। আর তখনই তার মনে হল পাশের ঘরে কেউ যেন চলাফেরা করছে। কেউ যেন হঠাৎ গলা টিপে ধরল তার। অসহায়ের মতো আত্মরক্ষার জন্যই যেন সে হাতুড়িটা শক্ত করে চেপে, কাঠ হয়ে বসে রইল। উৎকর্ণ হয়ে থাকল, কোনো শব্দ নেই। বোধহয় ভুল হয়েছে। হামাগুড়ি দিয়ে দরজার পাল্লার জোড়ে চোখ রাখল।
জোড়ের মাঝে পোস্টকার্ড গলে যায় এমন ফাঁক। সেখানে ভ্রূ লাগিয়ে তাকালে শোবার ঘরের এক—চতুর্থাংশ দেখা যায়। এই অংশটির মধ্যে পড়ে টেবলের বাঁ ধার, খাটের উপরের দিক অর্থাৎ যেখানে বালিশগুলো রয়েছে, দেওয়ালের সাদা অংশ যেটুকুতে ছবি, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি নেই, ইজিচেয়ারের দুই হাঁটু, আর মাঝে মাঝে দরজার পর্দা, যখন হাওয়ায় নৌকোর পালের মতো ফুলে ওঠে।
ঘরে কেউ রয়েছে। রাহুল কতকগুলো ব্যাপার এখন বুঝতে পারে। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে কি না, কেউ কাছেপিঠে রয়েছে কি না, নড়াচড়া কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, চলাফেরার শব্দে কীসের ইঙ্গিত ইত্যাদি।
ওর মনে হল ঘরে কেউ রয়েছে। কে থাকতে পারে? নিশ্বাস বন্ধ করে শব্দ শোনার চেষ্টা করল। তারপরই মনে হল, এত মনোযোগ দিয়ে মানুষটাকে আবিষ্কারের কী দরকার, এ তো রতন! এইভাবেই তো শব্দ হয় তার ঝাঁট দেবার। হাঁটুর কাছে কাপড় গুটিয়ে উবু হয়ে বসে। মসৃণ মেঝেয় সাবধানে ফুলঝাঁটা টানে। কারণ রাহুল বিছানায়, সরকারিভাবে তখনও তার ঘুম ভাঙেনি। ঝাঁট দেবার ছপছপ শব্দটা সে পছন্দ করে না মোটেই।
রাহুলকে ভয় করে রতন, ভালোও বাসে। বরং রীণাকে যেন সে কিছুটা অপছন্দ করে। হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তোলায় রীণা একদিন আপত্তি করেছিল। রীণাও বিশেষ পছন্দ করে না ওকে। রোজই রাহুলের কাছে ওর সম্পর্কে কিছু—না—কিছু বলত। বুড়ো মানুষ, নিড়বিড়ে, এক মিনিটের কাজ দশ মিনিট লাগায় ইত্যাদি শুনে শুনেও রাহুল দ্বিতীয় কোনো লোক নিয়োগের জন্য ব্যস্ত হয়নি।
