রাহুল বিব্রত হয়ে এপাশ—ওপাশ চাইল। দরজা—জানালা সবই বন্ধ। ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এগিয়ে এল। ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ‘খুব খিদে পেয়েছে, আছে কিছু?’
‘না বোধহয়। দেখি রান্নাঘরে কিছু আছে নাকি।’
উঠে দাঁড়াল রীণা। কোনোদিকে না তাকিয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছিল, রাহুল হাত টেনে ধরল।
‘কোথায় যাচ্ছ?’
‘রান্নাঘরে।’
‘তাই বলে এত শব্দ করে। আগে আলো নেবাও, সাবধানে দরজা খুলে পা টিপে যাও।’
রীণা অবাক হয়ে রাহুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। ধীরে ধীরে তার বোধশক্তি ফিরে এল। আস্তে দরজা খুলল। অন্ধকারে রতন ঘুমোচ্ছে। আন্দাজে পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। রান্নাঘরে বালতিটা দরজার ধারেই ছিল, ঢোকামাত্র পায়ে লাগল।
‘কে?’
রতনের ঘুম ভেঙে গেছে। কাঠের মতো রীণা দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘আমি।’
‘বউদি।’
‘হ্যাঁ।’
‘কী কচ্ছো?’
রতন উঠে রান্নাঘরের দরজায় এল। রীণা আলো জ্বালল।
‘লেবু খুঁজতে এসেছি। কীরকম চোঁয়া ঢেকুর উঠছে। জল দিয়ে খাব।’
‘দাঁড়াও আমি কেটে দি।’
বুড়ো মানুষটি গত পাঁচ বছরে একবারও নিজেকে রাঁধুনি বা চাকর ভাবতে পারেনি। রীণা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তার লেবু কাটা। রস নিংড়ে, মিশিয়ে গেলাসটা এগিয়ে দিল। রীণা এক চুমুকে শেষ করল। মনে হল সত্যিই তার তেষ্টা পেয়েছিল।
‘আর লাগবে?’
‘না থাক, তুমি ঘুমোও।’
শোবার ঘরে এসেই রীণা অবাক। রাহুল নেই। খাটের তলা দেখল, আলমারির পাশটাও। নজরে পড়ল ছোটোঘরের দরজাটা বন্ধ। ওটা তো খোলাই ছিল এতক্ষণ। ঠেলতেই খুলে গেল। দেওয়ালে পিঠ দিয়ে রাহুল দাঁড়িয়ে। রীণাকে দেখে সে এগিয়ে এল। ইশারায় জানায় এই ঘরেই সে থাকবে।
‘বালিশ আর বেডকভার দাও।’
রীণা জিনিসগুলো দিয়ে দিল রাহুলকে।
‘বাইরে যেমন শেকল দেওয়া ছিল দিয়ে দাও।’
ঘর থেকে বেরিয়ে রীণা দরজা বন্ধ করল। আলো নিবনো। বিছানায় বসে ভাবল এবার সে কী করবে?
.
জায়গা নেই পাশ ফেরার মতো। রাহুল কোনোরকমে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। ঘরের মধ্যে যত রাজ্যের জঞ্জাল আর বাজে জিনিস। গুমোট ভ্যাপসা গন্ধ। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালাটা খোলা। বন্ধ করা উচিত। উঠতে গিয়েও সে উঠল না। স্নায়ুগুলো টানটান, যেন প্রত্যেকটিতে পাথর বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। জানালাটা বন্ধ করে দিলে হাওয়া যেটুকু আসছে, তাও আসবে না, খোলাই থাক, রাত্রে বাইরে থেকে কেউ তাকে দেখতে পাবে না।
উত্তেজিত ক্লান্ত শরীরে ঘুম আসে না। তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো ছুটে বেড়াতে হয়েছে এই ক—টা দিন। ক—দিন? এক সপ্তাহ…এক মাস…এক বছর? আজীবন?
ঘরটা এত গরম! রীণার দেওয়া বেডকভারটায় সে শুয়ে। সেটা এত মোটা বলেই বোধহয় গরমটা বেশি লাগছে। মেঝের ধুলোয় কিচকিচ করছে। ভ্যাপসা বাসি গন্ধ। ভাঙা কাঠের চেয়ারে জড়ো করে রাখা ছেঁড়া তোশকটা থেকে আরশোলার চলাফেরার মতো শব্দ হচ্ছে। এইসব জঞ্জাল, আরশোলা, ইঁদুর, পোকামাকড় নিয়েই তাকে থাকতে হবে। রাহুল ভাবল, বেঁচে আছি। এখনও ধরা পড়িনি। হয়তো বেঁচে যাব…বেঁচে থাকব।
রীণাকে ব্যাপারটা বোঝাতে হবে। আবেগসর্বস্ব অল্পবুদ্ধির মেয়েমানুষ। একটু নাটক করতে হবে, এই যা। রাহুলের ঠোঁট মুচড়ে গেল। রতন সর্বক্ষণই বাড়িতে, দিনের বেলায় হয়তো সুযোগ হবে না। রাত্রে এই ঘরে রীণাকে ডেকে একসময় সে ওকে বুঝিয়ে দেবে।
কী বুঝিয়ে দেবে? কেন সে এমন একটা কাজ করে বসল? কিন্তু সেটা কি খুব সহজে কয়েকটা কথার জাল বুনে স্ত্রীকে বোঝানো যাবে?
সে মনে করার চেষ্টা করল সেই রাতের ঘটনাটাকে। একটা উপন্যাসে বর্ণিত কয়েকটা পাতার মতন সে ব্যাপারটা পড়তে শুরু করল চোখ বুজে—
.
সকাল থেকে মেঘ, দুপুরে বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে। সন্ধ্যার পরই রাস্তা নির্জন। রাত তখন প্রায় আটটা। বাসস্টপ থেকে হেঁটে শর্টকাট করতে প্লাইউড কারখানার টিনের পাঁচিলের পাশ দিয়ে সে দ্রুত চলেছিল ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে। সরু রাস্তাটায় আলো নেই। কারখানার ভিতরে একটা বালব জ্বলছিল কিন্তু তার যৎসামান্যই পাঁচিল ডিঙিয়ে বাইরে আসতে পেরেছে। তার ডানদিকে মাঠ, যেটা প্লট করে বিক্রি হয়ে গেছে কিন্তু এখনও বাড়ি ওঠেনি। মাঠের মধ্যে আগাছার ঝোপগুলো চাপড়া চাপড়া অন্ধকার হয়ে রয়েছে। মাঠের ওপাশে অ্যাপার্টমেন্ট বাড়িতে আলো জ্বলছে।
একটা কাতর আর্তনাদ, আর ঝোপের আন্দোলনের শব্দ। সে থমকে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘কে?’ কাতরানি আর শব্দ থেমে গেল। সেই সময় তার মনে হল দুটো লোক অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। সে চারধারে তাকিয়ে পাঁচিলের গা ঘেঁষে মাটিতে পোঁতা একটা দু—হাত লম্বা খোঁটা দেখতে পেল।
মাঠ থেকে একজন ছুটে আসছিল। তার চিৎকার শুনে সে বুঝতে পেরেছিল মেয়ে।
‘বাঁচাও বাঁচাও—।’ তারপরই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। মেয়েটির পিছনে ছিল একজন, সেও ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর।
শুধু এইটুকু ঘটনা। কিন্তু তার মাথায় কেন যে রক্ত উঠে এল, রাহুল গত চারদিনে বার কয়েক তার কারণ খুঁজেছে, পায়নি। বাঁশের খোঁটাটা ধরে ষোলো ইঞ্চি বাইসেপসের বাহু টান দিতেই, বৃষ্টিভেজা নরম জমি থেকে সেটা উঠে আসে। যে লোকদুটো এগিয়ে আসছিল তারা হঠাৎই ঘুরে গিয়ে ছুটে পালায়।
সে মাঠের মধ্যে ছুটে গেছিল। লোকটা তখন সবেমাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে। চাপা গলায় বলেছিল, ‘এক পা এগিয়েছিস কী চাকু চালিয়ে দোব।’ এই শুনেই সে বাঁশের খোঁটাটা বসিয়েছিল লোকটার মাথায়। এরপরও লোকটা দৌড়েছিল অন্তত তিরিশ গজ। তারপর চিৎকার করে পড়ে গেল। আর কী এক অন্ধ আবেগে সে লোকটার মাথায় পর পর ক্ষ্যাপার মতো আঘাত করে গেছিল। তারপরই সংবিৎ ফিরে পেয়ে সে নিথর দেহটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আবছা আলো, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, স্তব্ধ নির্জন চরাচর আর একটা মানুষের উপুড় হয়ে থাকা। দেখে সে ভয় পেয়ে যায়। সে বুঝতে পেরেছিল, ওটা একটা মৃতদেহ।
