সোনালির হাসি একসময় বন্ধ হল। চুপ করে সে মেঝের দিকে তাকিয়ে গভীর কোনো ভাবনায় যেন ডুবে গেল। তারপর শান্ত গলায় একসময় বলল, ‘সবাই এবার ঘর থেকে বেরিয়ে যান। আমায় একা থাকতে দিন।’
.
সাতদিন পর রাত্রে রাহুলের শোবার ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল। তখন সে ভিডিয়োর সেল অলিম্পিকসে পুরুষদের ফাইনাল ১০০ মিটার দৌড় দেখেছিল। উঠে গিয়ে রিসিভার তুলল।
‘হ্যালো, হ্যাঁ আমি, কে অর্জুন?’
‘রাহুল, ডা. সরকার মিথ্যে করে পুলিশকে বলেছিলেন সোনালিকে পাওয়া যাচ্ছে না। আর আজ সকালে আমি সত্যি করেই নার্সিং হোম থেকে জানলাম, সোনালি ওখান থেকে কাল রাতে কোথায় চলে গেছে। কেউ জানে না। সরকার, তার বোন, বিজয় সিনহা তারাও কেউ জানে না। ওকে তো আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।’
‘খুঁজে লাভ নেই। কোনোদিনই ওকে আর পাওয়া যাবে না।’ রাহুল রিসিভার রেখে ভিডিয়োর সামনে এসে বসল।
দ্বিতীয় আততায়ী
১
খুটখুট শব্দ।
রীণার ঘুম খুব সজাগ। কান পেতে রইল আবার শোনার জন্য। ঘরের দুটো জানালাই খোলা। বাইরের দালানে রতন ঘুমোচ্ছে। সম্ভবত রান্নাঘরে বেড়াল ঢুকেছে।
শব্দটা আবার হল।
রীণার মনে হল বোধহয় উপরের গৌতমবাবু। ফেরেন অনেক রাতে। খবরের কাগজের রিপোর্টার। কিছুক্ষণ আগে অফিসের গাড়ি ওকে নামিয়ে দিয়ে গেছে গলির মুখে। তন্দ্রার ঘোরেও রীণা তা টের পেয়েছিল। লোকটির নানান বাতিক, হয়তো জুতোর তলা চেঁছে গোড়ালি ঠুকছে।
আবার শব্দ—এবার একটু জোরেই।
রীণা ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। খুটখুটুনিটা উপরে নয়, রান্নাঘরেও নয়, পাশের ছোট্ট ঘরটাতেই যেন। ও ঘরটায় আছে ভাঙা তোরঙ্গ, বেতের ঝুড়ি, ছেঁড়া লেপ, শিশি—বোতল, মাদুর, পুরোনো জুতো আর যত রাজ্যের পুরোনো পত্রপত্রিকা। দরজায় শিকল দেওয়া থাকে। দরজাটা এই ঘরের মধ্যেই।
রীণা ভয় পেল। ফ্ল্যাটে সে আর রতন। হয়তো চোর ঢুকেছে কিংবা ঢোকার চেষ্টা করছে। গৃহস্থ সজাগ এই ইঙ্গিতটুকু দিলে চোর নিশ্চয় পালাবে। রীণা গলা খাঁকাল।
খুটখুট শব্দটা হতে থাকায় ভাবল চোর নয়। রীণা ঘরের আলো জ্বালাল। চোখ পড়ল টেবলে। টেবলটা ছোটোঘরের দরজার লাগোয়া। ফুলদানিটা কিনারে সরে রয়েছে। দরজাটা খুলবে কি খুলবে না ভাবতে ভাবতে সে টেবলের মাঝখানে ফুলদানিটা সরিয়ে রাখল। রতনকে তুলে এনে একসঙ্গে ঢোকা উচিত। দিনকাল যা পড়েছে। রতন বুড়ো মানুষ তবুও যদি দাঁড়িয়ে থাকে অনেক ভরসা পাওয়া যাবে। গত পাঁচদিন হল রাহুল বাড়ি নেই। বাড়ির কেউই জানে না এখনও তার স্বামী পাঁচদিন নিরুদ্দেশ।
অকাতরে ঘুমোচ্ছে রতন। দাড়ি কামায় সাতদিন অন্তর। মুখটা হাঁ হয়ে রয়েছে। সামনের দুটো দাঁত নেই। হাতদুটো অসহায়ের মতো পাশে ছড়ানো। মায়া হল রীণার। হয়তো দেখা যাবে ইঁদুর লাফালাফি করছিল। দরকার নেই বুড়ো মানুষটার ঘুম ভাঙিয়ে। রীণা ফিরে এল।
আলো নিবিয়ে খাটে শুতে যাচ্ছে, তখন আবার শব্দ। কেউ যেন ডাকছে, শব্দটা চাপা হলেও, বাড়ির সদরে এইভাবেই আগন্তুকরা টোকা দেয়। কিন্তু ও ঘরের জানালায় তো মানুষ আসার কোনো উপায় নেই। এক, যদি পাইপ বেয়ে গলি দিয়ে কেউ উঠে আসে। কেন আসবে? চোর! তা হলে ডাকবার মতো সুর তুলে টোকা দেবে কেন? তা হলে?
ভাবতে গিয়ে রীণার হাত—পা জমে যাবার মতো অবস্থা হল এই গরমেও।
সাবধানে দরজাটার কাছে এসে শিকল খুলল। পাল্লাদুটো এঁটে রয়েছে। যাতে শব্দ না হয় তাই যথেষ্ট সময় নিয়ে চাপ দিয়ে দিয়ে খুলে ফেলল। সুইচ টিপে খেয়াল হল বালব নেই।
মেঝেয় জায়গা খুব অল্প। ধুলোয় কিচকিচ করছে। ভ্যাপসা বাসি গন্ধ। শোবার ঘরের আলো খোলা দরজা দিয়ে যতটুকু এসেছে, তাতে একমাত্র জানালাটা ঠাওর করে রীণা এগিয়ে গেল ভয়ে ভয়ে। ঘষা কাচের পাল্লা। চেষ্টা করেও রীণা ওধারে অন্ধকার থাকার জন্য কিছুই দেখতে পেল না। চাপা সুরে সে বলল, ‘কে?’
উত্তর নেই।
ওধার থেকে নখ দিয়ে যেন কেউ কাচে আঁচড় কাটল। জানালার কড়া ধরে রীণা সজোরে টানল। দীর্ঘদিন খোলা হয় না। একটুখানি কেঁপে পাল্লাদুটো আগের মতোই রয়ে গেল। বাঁ হাতে একটা পাল্লা চেপে আবার টানল, মনে হল ওধার থেকেও কেউ যেন তাকে সাহায্য করছে। একটা ক্যাঁচ শব্দ করে জানালা খুলে গেল। ছোট্ট জানালাটা জুড়ে কোমর পর্যন্ত একটা মানুষের ছায়া।
থরথর করে কেঁপে উঠল রীণা। অস্ফুটে বলল, ‘কে?’
‘আমি। আমি রাহুল।’ ফিসফিসে গলাটা ভরাট, উত্তেজিত। ‘রতন কি ঘুমোচ্ছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আলো নিবিয়ে বারান্দার দরজাটা খুলে রাখ, রতন যেন না জাগে, তাড়াতাড়ি।’ দমচাপা দ্রুত নির্দেশ দিল ছায়ামূর্তি।
রীণা শোবার ঘরে এল। আলো জ্বলছে, জানালা খোলা, পর্দা গুটিয়ে তুলে রাখা। পর্দা ফেলে সে জানালা বন্ধ করে আলো নিবিয়ে দিল। রতনের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে সাবধানে খিলটা খুলে দাঁড়িয়ে থাকল।
ছায়ার মতো মানুষটার ছায়া ঝুল বারান্দার পাঁচিল টপকে ঢুকে এল। নিজেই খিল দিল। নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিচ্ছিল। রীণা ফিসফিস করে বলল, ‘রতন দেওয়াল ঘেঁষে শুয়ে।’
‘তা হলে তুমি আগে যাও।’
রীণাকে অনুসরণ করে শোবার ঘরে এসে, দরজা বন্ধ করে আলো জ্বালল।
যেন আগে থেকেই তৈরি ছিল রীণা। খাটে হেলান দিয়ে দু—হাতে চোখ ঢাকল। পিছন ফিরল এবং উপুড় হয়ে বালিশে মুখ চেপে ধরল।
