‘এসব কথা কে আপনাকে বলেছে?’ সারদাচরণ খরখরে স্বরে বললেন।
‘যেই বলে থাকুক, তাতে কী আসে যায়। আপনি তো ধরেই রেখেছিলেন আপনিই যথার্থ। কিন্তু প্রমাণ দিতে হবে। কীভাবে দেবেন? একবিংশ শতাব্দীর গড়পড়তা উচ্চচতর মানুষকে হাজির করে।’
সোনালি ভীত চোখে রাহূলের দিকে তাকাল। চোখে বিস্ময় এবং ভয়ও। আরও কী যে এরপর সে বলবে এবং সে সব কথায় কী ভয়ংকরতা যে লুকিয়ে আছে তা সে জানে না। আর সেজন্যই ভয়। ওর করুণ মুখ দেখে রাহূল একটু বিচলিত হল। এইভাবে এইসব কথা সবার সামনে সে বলতে চায়নি। সে চেয়েছিল একান্তে ধীরে ধীরে সোনালিকে জানাতে। কিন্তু সে বিশ্বাস করত না। সারদাচরণের সামনে এসব বলা দরকার। সে চাহনি বিশ্বাস করত না। সারদাচরণের সামনে এসব বলা দরকার। সে চাহনি দিয়ে চেষ্টা করল সোনালিকে ভরসা জানাতে। তারপর আবার শুরু করল।
‘বছর তিরিশ আগে এইচ জি এইচ এবং তাই দিয়ে মানুষের শরীরের বৃদ্ধি সংক্রান্ত গবেষণার কথা আপনি শোনেন। তখনি আপনি দেখেতে পেলেন এটাকে আপনার রিসার্চে কাজে লাগতে পারবেন। আপনি সপ্তাহে সপ্তাহে সোনালির বাড় মাপছেন, আপনি জানেন যখন ও সাবালিকা হবে তখন কতটা লম্বা হবে। কিন্তু এইচ জি এইচ দিয়ে বাড়টা অনেক আগেই করিয়ে ফেলা যাবে। তিন প্রজন্ম পরে, আপনার বিশ্বাসমতো, মানুষ যতটা লম্বা হবে সেটা সোনালিকে দিয়ে আপনি এখনই করে দেখাতে পারেন।’
সোনালি দাঁড়িয়ে উঠল। ‘আমাকে যে ইঞ্জেকশনগুলো দিতে? সেগুলো কী ছিল?’ ঠকঠক করে কেঁপে উঠে সে ছুটে গিয়ে সারদাচরণের কাছ ধরে ঝাঁকানি দিল। ‘তুমি আমাকে হরমোন ইঞ্জেকশন দিতে। বলো, বলো!’
সারদাচরণ ধীরে ধীরে সোনালির মাথায় হাত রাখলেন। ‘বিশ্বাস করো এত হালকাভাবে আমি কিছু করিনি। শরীরের বাড় সম্পর্কে যা কিছু পড়াশুনো, যা কিছু জানার সব আমি করেছি। এইচ জি এইচ আর তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গভীর স্টাডি করেছি।’
‘তাই বুঝি আমি এত লম্বা। তুমি হিসেব করে আমার এই হাইট করিয়েছ।’ সোনালির মুখে আতঙ্কের আঁচড়ানি পড়ল।
‘হ্যাঁ, হিসেব করেই এটা আমি করিয়েছি। পরের শতাব্দীতে মেয়েরা যতটা লম্বা হবে ততটাই।’
‘তোমার থিয়োরি প্রমাণের জন্য তাই আমাকে একসারসাইজ করাতে, ফিজিওথেরাপি করতে, নিখুঁত শারীরিক নমুনা লোককে দেখাবার জন্য?’
‘সোনালি তুমি স্বর্ণকুমারী। আমি বলছি তুমি কী কী অর্জন করবে। খ্যাতি, গরিমা, খরচ করে উঠতে পারবে না, এতটাকা।’
‘কে পাবে ওইসব?’ দু—হাত ঝাঁকিয়ে সোনালি চিৎকার করে উঠল। ‘কে পাবে? কার্শিয়াং থেকে যে বাচ্চচাটাকে এনেছিলে? আমিই কি সেই? খ্যাতি গরিমা কি আলি মায়াকং পাবে না মড়ার শরীর থেকে বার করা হরমোনগুলো পাবে? জবাব দাও।’
‘তুমি জন্ম অ্যাথলিট।’ সারদাচরণ কেন সোনালির কথাগুলো শুনতে পাননি এমনভাবে বলতে লাগলেন। ‘তোমার বাবা ব্রোঞ্জ পাওয়া জার্মান অলিম্পিক রোয়িং টিমে ছিল। তোমার দিদিমা কঠিন পার্বত্য জঙ্গলের মেয়ে। ক্ষমতাটা তুমি জন্মসূত্রেই পেয়েছ। চ্যাম্পিয়ান রানার করার জন্য তোমার ইঞ্জেকশন দিইনি, তা দিয়ে করা যায় না। তোমাকে লম্বা করার, বিরাট করার জন্য দিয়েছি। দৌড়ের মধ্য দিয়ে তুমি প্রমাণ করছ যে তোমার কাঠামো বাড়তি বৃদ্ধিটাকে মানিয়ে নিতে পেরেছ। এর কোনো দুর্বলতা নেই। ওটাই আমার সারাজীবনের কাজের চূড়ান্ত জয়।’
‘ডা. সরকার, এই জয় কিন্তু একদমই নিরর্থক, ফাঁপা। কারণ এটা আপনি প্রকাশ করতে পারবেন না।’
রাহুলের মুখের দিকে সবাই তাকাল বিস্ময়ভরে।
‘সোনালিকে কি এবার আপনি বলবেন, কেন ওকে ওখানে রেখেছেন?’
ভীত চোখে সোনালি তাকাল রাহুলের দিকে। ‘তার মানে? কেন আমি এখানে?’
‘সেটা উনিই বলবেন।’
সারদাচরণ ধীরে ধীরে মাথা নাড়তে লাগলেন মুখ নীচু করে। ‘বলতেই হবে?’
‘হ্যাঁ।’ সোনালি দাবি জানাল।
‘যখন তোমায় হরমোন দিচ্ছিলাম তখন জানতাম এর একটা ঝুঁকি আছে। তোমার শরীরের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু জানতাম না ঝুঁকিটা কতটা। এটা জানতাম দীর্ঘদিন ইঞ্জেকশন চালিয়ে গেলে চিরকালের জন্য প্যানক্রিয়াস গ্ল্যান্ডটার ক্ষতি হতে পারে। আর সেটাই হয়ে গেছে। কেন তুমি বাঙ্গালোরে পড়ে গেছলে, ছুটতে পারছিলে না, পা ভার হয়ে যাচ্ছিল জান? তোমার ডায়াবিটিস হয়েছে। ইঞ্জেকশনই এর জন্য দায়ী।’
‘না, দায়ী নয়।’ সোনালি হিংস্র চোখে তাকাল, কথা বলল শান্ত গলায়, ‘দায়ী তুমি।’
ওকে স্পর্শ করার জন্য সারদাচরণ হাতটা বাড়ালেন কিন্তু স্পর্শ না করে সেটা ঝুলে পড়তে দিলেন, সোনালির চোখে ঘৃণা দেখে। ‘আমি ফাটকা খেলেছিলাম। এত তাড়াতাড়ি যে ঘটে যাবে ভাবিনি। চেয়েছিলাম প্রথমে তোমার সোনার মেডেল জেতাটা হয়ে যাক। তারপর তোমাকে বলতাম কেন এসব করেছি। ওলিম্পিকসের সাফল্য তোমার সব ক্ষতি পুষিয়ে দিত তাহলে। যশ, খ্যাতি, অর্থ, জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে সান্ত্বনা দিত। এজন্যই আমি তোমাকে স্বর্ণকুমারী করে তোলার সবরকম চেষ্টা করেছি। টাকার আমার দরকার নেই। আমিও চাইও না। তোমার স্বাস্থ্যের বিনিময়ে আমি টাকা চাইনি, সোনালি, আমি শুধু একযা বৈজ্ঞানিক সত্যকে দেখাতে চেয়েছি।’
হঠাৎ পাগলের মতো সোনালি হাসতে শুরু করল। তীক্ষ্ন গলায় কান্নার মতো একটা শব্দ। কুঁজো হয়ে সে হেসে যাচ্ছে আর পিঠটা ফুলে ফুলে উঠছে। মাথাটা তুলে সে একবার বিছানায় চিৎ হয়ে গড়িয়ে পড়ল। আর সেই সঙ্গে হাসিটাও বেড়ে গেল। ঘরের সবাই চোখ সরিয়ে অস্বস্তিভরে অন্যত্র তাকাতে লাগল।
