‘এইমাত্র বেরোল এক বন্ধুর সঙ্গে, কখন আসবে ঠিক নেই। আপনি কি বসবেন?’
অনন্ত কিছুক্ষণ বসে থাকে। দু—একটা কথাও বলে। চা খায়, সঙ্গে দুটি সন্দেশ।
তৃতীয় দিনে রেবতী বেশিরভাগ সময়ই অন্য ঘরে ছিল। অনন্ত ছটফট করছে ওকে দেখার জন্য। পাশের ঘর থেকে রেবতীর কণ্ঠস্বর পেয়ে সে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারছে তার মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটছে।
রেবতীর মা বিয়ের কথা তুললেন। ‘রেবতীর বাবা মারা গেলেন তখন ও বিএ পড়ছিল, আর পড়া হয়নি। আমরা কিন্তু কিছুই দিতে—থুতে পারব না শাঁখা সিঁদুর ছাড়া।’
অনন্তের মনে পড়ল অনুর বিয়ের কথা। সে বলল, ‘দিলেও আমি কিছু নোব না। আপনারা আমার সম্পর্কে খোঁজখবর নিন। আমি কোথায় থাকি, ঘরদোর কেমন সেটাও তো একবার দেখবেন।’
ঠিক হয় রেবতীকে নিয়ে গিয়ে অনন্ত তার একার সংসার দেখিয়ে আসবে। সন্ধ্যা নাগাদ সে রেবতীদের বাড়ি যায়। তখন ঘরের তক্তাপোশে বালিশ বগলে রেখে কাত হয়ে শুয়ে একটি লোক সিগারেট খাচ্ছিল। রেবতীর বোন শাশ্বতী আদুরে ভঙ্গিতে লোকটির পায়ের ওপর হাত রেখে বসে। রেবতী জানলার ধাপে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে হাসছিল।
অনন্ত ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছিল। ওকে দেখেই ঘরের সবাই চুপ করে তাকিয়ে রইল। অবশেষে শাশ্বতী বলল, ‘আসুন।’
‘আজ দেখতে যাবার কথা ছিল।’
রেবতীর পায়ের দিকে তাকিয়ে অনন্ত বলল।
‘আজকেই, কিন্তু আজ যে…’
অনন্তর বুক কেঁপে উঠল। রেবতী কি যাবে না? সকালে সে ঘর—দালান জল দিয়ে ধুয়েছে, কাচানো ওয়াড় বালিশে পরিয়েছে, ঝুল ঝেড়েছে, তাকের জিনিসপত্র গুছিয়েছে, স্টোভে কেরোসিন ভরে রেখেছে, যদি চা খেতে চায়! ভেবে রেখেছে ট্যাক্সিতে রেবতীকে আনবে এবং পৌঁছে দেবে।
‘যাও না, কতক্ষণ আর সময় লাগবে।’ লোকটি অনুমতি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল।
‘আপনি বসুন, আমি কাপড়টা বদলে আসি…ওহ পরিচয় করিয়ে দিই, এই হচ্ছে দিলীপদা, অনেক উপকার করেছে আমাদের, দিলীপদা না থাকলে আমাদের পরিবারটা ভেসে যেত…আর ইনি হচ্ছেন সেই ভদ্রলোক কাগজে পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন।’
‘ওহ আপনি।’
অনন্ত নমস্কার করল, লোকটি প্রতি নমস্কার না করে সিগারেটের প্যাকেটটা তার দিকে এগিয়ে ধরে।
‘মাফ করবেন, খাই না।’
তক্তাপোশের নীচ থেকে একটা মোড়া বার করে দিল শাশ্বতী। অনন্ত দেওয়াল ঘেঁষে বসল। তার ভিতরে অস্বস্তি। কয়েকবারই সে দিলীপদা নামটা ওদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় উচ্চচারিত হতে শুনেছে। আজ সে চোখে দেখল। মাঝারি আকৃতি, ফরসা, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, বুশশার্ট ও প্যান্টটা দামি কাপড়ের। এদের আত্মীয় নয়, তাহলে কে? উপকারী বন্ধু। কী উপকার করেছে যাতে ভেসে যাওয়া বন্ধ হয়!
‘কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন কেন?’
‘তা ছাড়া উপায় ছিল না।’
‘সম্বন্ধ করে বিয়ে দেবার মতো কেউ নেই?’
‘না।’
‘কোথায় চাকরি করেন?’
‘জমিদারের এস্টেটে, সম্পত্তি দেখাশোনার কাজ।’
‘অ।’
দিলীপদা নিস্পৃহ হয়ে শাশ্বতীর দিকে মনোযোগ দিল।
‘মাসিমা কোথায় রে?’
‘ও ঘরে শুয়ে আছে, মাথা যন্ত্রণা হচ্ছে। ডাকব?’
‘থাক। তাঁতিকে পাঠিয়ে দেব তা হলে, কখন আসবে?’
‘দুপুরে পাঠিয়ো।’
‘ভাস্বতী এই শনিবার আসবে?’
‘মেজদির কোনো কথার ঠিক নেই। আসতেও পারে।’
দিলীপদা উঠে বসল রেবতী ঘরে ঢুকতেই। হালকা টিয়া পাখি রঙের সিল্কের শাড়িটা ওর শরীরের উঁচু—নীচু জায়গাগুলোর উপর আলতো করে বিছানো। লিপস্টিকের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, হাতকাটা ব্লাউজে বাহুর ডৌল বড়ো সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু অনন্ত চোখ নামিয়ে নিল।
‘আমার সঙ্গেই চলো, ওদিকে একটা কাজ আছে সেরে নেব।’
বাদামি অ্যাম্বাসাডারটা অনন্ত গলিতে ঢোকার সময় দেখেছিল। সেটা যে এই লোকটিরই বুঝতে পারল যখন চাবি দিয়ে দরজা খুলে ড্রাইভারের সিটে বসল। রেবতী পিছনের দরজা খুলে দাঁড়াল।
‘উঠুন।’
‘আপনি উঠুন।’
‘উঠব।’
অনন্ত গাড়িতে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে রেবতী সামনের দরজা খুলে দিলীপের পাশে বসল। অনন্ত আশা করেছিল অন্যরকম।
তাদের গলির মধ্যে গাড়ি ঢুকিয়ে বার করা কঠিন। তাই অনন্ত ঢোকাতে বারণ করল।
‘আমি এখানেই থাকছি, তুমি দেখে এসো।’
দিলীপদা সিগারেট ধরাল। রেবতীকে নিয়ে গলি দিয়ে হেঁটে আসার সময় সে সন্তর্পণে জিজ্ঞাসা করল, ‘উনি কে হন?’
‘দিলীপদা? উনি ফ্যামিলি ফ্রেন্ড, ওর নাম দিলীপ ভড়। বিরাট বিল্ডিং কন্ট্রাক্টর।’
আর প্রশ্ন না করে অনন্ত বাড়িতে ঢুকল, তালা খুলে রেবতীর দিকে তাকাল। কিছু বুঝতে পারল না। দালানের আলো জ্বালল।
চোখ ঘুরিয়ে মুখ তুলে রেবতী দেওয়াল, মেঝে, কড়িকাঠ দেখছে। অনন্ত প্রাণপণে বুঝতে চেষ্টা করছে ওর প্রতিক্রিয়া।
‘রান্নাঘরটা দেখুন।’
প্রায় ছুটে গিয়ে সে রান্নাঘরের দরজা খুলল।
‘মা এই জায়গাটা বসে রাঁধত।’
রেবতী দূর থেকে দেখে ফিকে হাসল।
‘দুটো ঘর।’
অনন্ত দরজা খুলে আলো জ্বালল। রেবতী দরজার কাছ থেকে উঁকি দিল।
‘চলি এবার।’
‘চা খাবেন?’
‘না, না, চা নয়।’
রেবতী সদরের দিকে এগোচ্ছে, অনন্ত পিছু নিল।
‘খুব পুরোনো বাড়ি।’
‘হ্যাঁ, শুনেছি আশি—নব্বুই বছরের। পাড়াটা খুব বনেদি।’
‘ভ্যাপসা একটা গন্ধ রয়েছে। জানলাগুলো ঠিকমতো বন্ধ হয়?’
‘হয়। মেঝেটা নতুন করে করাব ভাবছি, দেওয়ালের পলেস্তরাও…এসব করবার দরকার এতকাল হয়নি তো।’
