‘তারপর আর দেখা করলেন না কেন?’ আবার কোমলতা। এবার কণ্ঠস্বরে এবং অভিমানের ছোঁয়া লাগা।
‘করিনি কারণ,’ রাহুল ইতস্তত করল। বাঙ্গালোরের হোটেলের ঘরে হঠাৎ সোনালিকে চুম্বনের প্রতিক্রিয়া সে এবার ওর চোখে, গলার স্বরে দেখতে পাচ্ছে। ‘আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম কিছু খোঁজ খবর নেওয়ার কাজে।’
এই সময় দরজাটা খুলে গেল।
‘সেই কাজেই আপনি কি এখন এখানে?’ প্রশ্ন করলেন ডা. সরকার। তার পিছনে অর্জুনের বিপন্ন মুখটা দেখা গেল।
রাহুল চমকাল না। ডা. যোশির সঙ্গে কথা বলে সে সোনালির অসুখের পিছনে সম্ভাব্য একটা কার্যকারণ সম্পর্কের ধারণা পেয়েছিল। ডা. সুদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হবার পরসেই যম্ভাব্যতা কঠিন হয়ে সন্দেহের আকার পায়। ব্যাপারটা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যতই সে ভেবেছে সে রেগে উঠেছে। তার স্থির ধারণা হয়েছে ডা. সরকার তাচ্ছিল্যভাবেই সোনালির স্বাস্থ্য ধ্বংস করেছেন।
এখন তিনি ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে দরজায় দাঁড়িয়ে। এখন দরকার ধীর শান্ত ভঙ্গিতে, যুক্তিযুক্ত কথার মধ্য দিয়ে সত্যকে বার করে আনা।
সারদাচরণ বললেন, ‘আমাদের দু—জনের মধ্যে কথা হওয়া দরকার তবে এখানে নয়।’
তার মানে সোনালির সামনে নয়। রাহুল মাথা নেড়ে বলল, বিষয়টায় সোনালিরও স্বার্থ আছে সুতরাং শোনার অধিকারও আছে।’
‘ও কিছুই জানে না।’
‘ঠিকই। আর সেটা এবার আপনি জানিয়ে দিন।’
সোনালি কিছুই বুঝতে পারছে না জুজনের কথা। সে বিভ্রান্ত চোখে একবার সারদাচরণ, আর একবার রাহুলের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। শুধু আঁচ করতে পারল তাকে নিয়েই দুজনের মধ্যে কাঠিন্য গড়ে উঠেছে।
‘ওর শরীরের কথা আমাকে ভাবতে হবে।’ সারদাচরণ বললেন, ‘এখন ওর মনে আঘাত লাগার মতো কোনো কথা, ডাক্তার হিসাবেই আমি—’
‘ওসব কথা থাক। ওর বয়স এখন কুড়ি। গোলমালটা কোথায় এবং কেন এটা জানার অধিকার ওর হয়েছে।’ রাহুল এবার গলাটাকে কঠিন করল।
কথাগুলো যে সারদাচরণকে নাড়া দিয়েছে সেটা ওর মুখে ফুটে উঠল। গলাটা শক্ত দেখাচ্ছে। হাতের মুঠো খুলছেন আর বন্ধ করছেন।
‘আপনি বোধ হয় আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন আমি কতটা জানি।’ রাহুল বলল, ‘ভাবছেন আমি বোধ হয় ধাপ্পা দিচ্ছি। না, ডা. সরকার, আমি কিছু অনুসন্ধান করেছি। গ্রোথহরমোন, কী যেন নামটা—এইচ জি এইজ বা সোমাটোট্রোপিন দিয়েই কি শুরু করব?’
‘দোহাই, সোনালির সামনে এসব কিছু বলবেন না।’ সারদাচরণ করুণ স্বরে প্রায় মিনতি করলেন।
‘বাবা আমাকে নিয়ে যদি কথা হয় তাহলে আমি শুনতে চাই।’ সোনালি এগিয়ে এসে সারদাচরণের হাত চেপে ধরল। সারদাচরণ ধীরে এগিয়ে এসে খাটের রেলিং চেপে ধরলেন। অর্জুন ধরের মধ্যে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিল। সোনালি খাটে বসল। রাহুল দেওয়ালে ঠেশ দিয়ে রইল।
‘আপনার হামবুর্গ রিসার্চ নিয়ে বেশি কথা বলার কোনো দরকার এখন নেই।’ রাহুল শুরু করল।
পরের প্রজন্ম যদি আগেরটির থেকে লম্বা হয় তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেন অনির্দিষ্টভাবে আরও লম্বা হবে না? আপনার সমালোচকরা বল মানুষের কঙ্কাল গঠনগতভাবেই তার বেশি বৃদ্ধি সইতে পারবে না। ঠিক বলছি কি?’
সারদাচরণের চোয়াল শক্ত হয়ে বসে গেছে। শুধু একটু কাঁধ নাড়ালেন।
‘কিন্তু মুশকিলটা হল আপনার থিয়োরির সমর্থনে আপনি কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি। যেজন্য কেউ আপনাকে গ্রাহ্য করেনি। কোথাও আপনি পাত্তা পাননি।’
প্রতিবাদ করার জন্য সারদাচরণ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই রাহুল বলল, ‘পঁচাত্তর সালে আপনি কার্শিয়াংয়ে সোনালিকে পান এক বুড়ো ইংরেজ কর্নেলের বাড়িতে। সোনালির বোধহয় সেসব মনে নেই।’
‘আছে। আমাকে একটা জিপে করে দার্জিলিংয়ে আনা হয়। সেখানে আমার হাত—পা এত জোরে টিপেটিপে দেখেছিলেন যে ব্যথায় আমি কেঁদে উঠেছিলাম।’
সারদাচরণ মাথা ঝুঁকিয়ে সমর্থন করলেন তবে সোনালির মুখের দিকে তাকালেন না।
‘বাচ্চচাটিকে যখন দেখন তখনই আপনি বুঝতে পারেন আপনার থিয়োরিকে প্রমাণ করার, একটা সম্ভাবনা এর মধ্যে রয়েছে। যদি আপনি নির্ভুল হন তাহলে সোনালি তার মা আর দিদিমার থেকেও লম্বা হতে বাধ্য। কী দারুণ সুযোগ আপনার থিয়োরি প্রমাণের জন্য। একটা অনাথ শিশু, তাকে পালন করে তার পরিণত বয়সে পৌঁছানো পর্যন্ত সপ্তাহে সপ্তাহে তার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করার, খুঁটিনাটি সব লিখে রাখার এমন সুযোগ আর কোথায় পাবেন। আর সেই সব থেকে সিদ্ধান্তে এসে ছাপিয়ে, আপনি আপনার থিসিসকে সমর্থনও করতে পারবেন।
‘তাহলে আমি একটা গিনিপিগ ছিলাম?’ সোনালি তীব্রস্বরে, ভর্ৎসনা মাখিয়ে বলল।
‘বাজে কথা।’ সারদাচরণ রেগে উঠলেন। ‘তোমাকে আমরা আর পাঁচটা বাচ্চচার মতোই মানুষ করেছি।’
‘তাহলে সব বাচ্চচার মতো আমাকে স্কুলে পাঠাওনি কেন?’
প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া গেল না।
‘সোনালিকে নানাভাবে পরীক্ষা করে আপনি দেখতে পান, বয়সের পক্ষে ওর দেহের ক্ষমতা অস্বাভাবিক রকমের বেশি। আর তখনই বোধ হয় অলিম্পিকসের চিন্তাটা মাথায় আসে। আপনার রিসার্চ পেপারকে চড়চড় করে বিখ্যাত করে দেবে যদি সোনালি সোনার মেডেল জেতে। মাত্র একজনকে দিয়ে অবশ্য থিয়োরির যথার্থতা প্রমাণ করা যায় না কিন্তু আপনার ধারণাটাকে তো প্রচণ্ড পাবলিসিটি দেওয়াতে পারবে। যেটা তখন আপনার খুব দরকার ছিল, কেন—না আপনার পেপার আর তখন ছাপা হয় না, আপনি কোনো নতুন কথাও বলতে পারছেন না। খুব হতাশার মধ্যেই ছিলেন।’
