‘নিশ্চয় আমার স্বার্থ রয়েছে।’ অর্জুন উঠে দাঁড়াল। ‘তুমি চান করে নাও। সোজা দমদম থেকে আসছ তো?’
‘চান না করলেও চলবে। চলো বেরিয়ে পড়ি।’
ডায়মন্ডহারবার রোড থেকে রাস্তাটা পশ্চিমদিকে গেছে একটা সাজানো কলোনির দিকে। চমৎকার সব একতলা বাড়ি। অনেক বাড়ি তৈরি হওয়ার পথে। পার্ক, পুকুর, খেলার মাঠ, পেরিয়ে মারুতি থামল একটা দোতলা বাড়ির সামনে।
গেট থেকে সিমেন্টের পথ ঘুরে গেছে গাড়ি বারান্দার নীচে। মারুতিকে দরজার কাছে থামিয়ে দু—জনে নামল। দারোয়ানের মতো একজন টুলে বসেছিল। উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল কাকে চাই।
‘মেট্রনকে।’
‘অফিসে যান ওই ডানদিকে।’ হলঘরে দোতলায় যাবার সিঁড়ির পাশের ঘরটা সে দেখিয়ে দিল।
রাহুল দাঁড়িয়েই রইল। ‘তুমি গিয়ে কথা বল, আমি অপেক্ষা করছি এখানে।’
মাঝবয়সি, সুশ্রী মেট্রন হাসিমুখে তাকাল অর্জুনের দিকে। তিনি অর্জুনকে আগেও দেখেছেন, জানেনও এই লোকটি নার্সিং হোমের মালিক, ডা. দাশগুপ্তর বন্ধু।
‘আমি একবার সোনালি সরকারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘কিন্তু স্ট্রিক্ট, নির্দেশ আছে কারুর সঙ্গে দেখা করতে না দেবার।’
‘কার নির্দেশ?’
‘ডা. দাশগুপ্তর। খবরের কাগজের লোকজন আসতে পারে বলেই এই বারণ।’
‘কিন্তু আমি তো রিপোর্টার নই। আচ্ছা আপনি ওকে একটা ফোন করে বরং বলুন অর্জুন হালদার সোনালির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।’
‘আমাদের ফোনটা দু—দিন হল ডেড। তবে আমি পাশের বাড়ি থেকে করছি। আপনি কাইন্ডলি একটু বসুন।’
মেট্রন ব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বেরোলেন। অর্জুন না বসে বেরিয়ে এসে রাহুলকে দেখতে পেল না। চারধারে তাকাল। হলঘরেই তো ছিল, গেল কোথায়? নির্জন, শান্ত বাড়িটা। তকতকে পরিষ্কার। আমেরিকায় এগারো বছর প্র্যাকটিস করে ফিরে এসে দাশগুপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি আর নিয়মশৃঙ্খলা দিয়ে এই নার্সিং হোমটা তৈরি করেছে। অর্জুন দরজার কাছে সিগারেট ধরাল।
অর্জুন যখন মেট্রনের সঙ্গে কথা বলতে গেছে তখনই রাহুল চারদিক দেখে নিয়েছিল কেউ তাকে দেখছে কি না। লোকটা টুল বসে এবং সেখান থেকে সিঁড়িটা দেখা যায় না।
রাহুল তিনলাফে সিঁড়ির মাঝের ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছে ঘুরে গিয়েই আবার তিনলাফে দোতলার করিডোরে পৌঁছল। সার সার কেবিন একদিকে, অন্যদিকে বারান্দার রেলিং, নীচে সবুজ ঘাসের উঠোন। করিডরটা সোজা গিয়ে ডাইনে বেঁকেছে ‘এল’ অক্ষরের মতো। অন্তত পনেরোটা কেবিন, সবগুলোর দরজায় পর্দা। দরজার পাশে দেয়ালে নম্বর।
কোন কেবিনে সোনালি? নম্বরটা অর্জুন জানে। যদি সে একবার জিজ্ঞাসা করেও রাখত। এখন নীচে গিয়ে জেনে আসতে গেলে ধরা পড়ে যাবে।
ডানদিকে দরজা খোলার শব্দ হতেই রাহুল একপা পিছিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। হালকা সবুজ রঙের গোড়ালিপর্যন্ত ঢোলা রোগীর গাউন পরা মাঝবয়সি এক মহিলা একটা বই হাতে বেরোচ্ছেন। রাহুল দরজা দিয়ে ভিতরে তাকিয়ে কয়েকটা বই ভরা আলমারি দেখতে পেল। নিশ্চয় লাইব্রেরি।
‘শুনছেন।’ মৃদু গলায় রাহুল বলল। ‘খুব লম্বা, ফর্সা, গোলমুখ একটি মেয়ে এখানে পেশেন্ট। তার কেবিন কোনটে দয়া করে বলবেন?’ রাহুল তার সর্বোত্তম বিগলিত হাসিটা মুখে ফোটাল।
‘আপনি কে হন।’
‘দাদা। দিল্লি থেকে আসছি খবর পেয়ে। সোজা এয়ারপোর্ট থেকে এখানে।’
‘কী হয়েছে ওর?’
‘ডায়াবিটিস।’
‘ওহঃ, এই বয়সেই! সোজা যান সবশেষে বাঁ দিকেরটা।’
‘ধন্যবাদ।’
রাহুল পারলে দৌড়ত। কিন্তু সেটা সন্দেহজনক হবে বলে স্বাভাবিক ভাবেই হেঁটে গেল। পর্দা সরিয়ে দেখল দরজা বন্ধ। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ঠেলতেই খুলে গেল।
সোনালি ঢিলে গাউন পরে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। পাশে একটা বই খোলা অবস্থায়। তাকে দেখে ধড়মড়িয়ে সোনালি উঠে বসল। মুখটা বসে গেছে। বাঙ্গালোরে যেমন দেখেছিল তার থেকেও চোপসান মুখ।
‘তোমার কী অসুখ হয়েছে? এরা বলেছে কিছু।’
সোনালির চোখ হঠাৎ ছলছল করে উঠল। হাসবার চেষ্টা করে বলল, ‘কিছুই হয়নি আমার। খাওয়ার গোলমালে এটা হয়েছে। যা খেলে অ্যালার্জি হয় তাই খেয়েই শরীর খারাপ।’
‘চিনি বোধ হয়।’
‘হয়তো। আমাকে চায়ের সঙ্গে চিনি দেওয়া হয় না। বাবা বলেছেন ভবিষ্যতে খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান হতে হবে।’
‘তুমি কি কাগজ পড়েছ?’
‘না। এখানে কাগজ দেওয়া হয় না, কেন, কিছু কি বেরিয়েছে? আচ্ছা ফেডারেশন কি আমার মেডিক্যাল টেস্টে না যেতে পাবার জন্য খুব রেগে যাবে? সিলেকশন আটকে দেবে? আমার অসুখের কথাটা তো বাবা ওদের জানিয়েই দিয়েছেন।’
‘তুমি কি এখনো বার্সিলোনা যাওয়ার কথা ভাবছ?’
সোনালির মুখে উদবেগ ফুটল। ‘কেন ভাবন না? ম্যারাথনে তো সিলেক্ট হয়েই গেছি। আর দশ হাজারে—ওহ বাঙ্গালোরে তো প্রায় শেষ করেই এনেছিলাম যদি না—।’
‘কীভাবে শেষ করেছিলে? হুমড়ি খেয়ে। কেন?’
‘ওটা অ্যাকসিডেন্ট।’
‘না সোনালি। আমি দেখেছি তুমি অসুস্থ ছিলে।’
‘না আমি ফিট ছিলাম।’
‘ছিলে না। আমি ট্রাকের পাশে ফেন্সিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে তোমার মুখ দেখেছি, তোমার পা ফেলার ধরন দেখেছি। টেকনিকের আমি কিছুই বুঝি না কিন্তু কোনো জিনিস স্বাভাবিক না হলে সেটা বুঝতে পারি।’
‘কে যেন স্বর্ণকুমারী বলে ডেকেছিল। সেটা তাহলে—’
সোনালি একদৃষ্টে রাহুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত ধরনের একটা কোমলতা রাহুল ওর চোখে দেখতে পেল। যেটা কৃতজ্ঞতার কিনার ঘেঁষে যায়।
