‘ধরুন, অনেকটা দৌড়বার পর বা খুব হেভি ট্রেনিংয়ের পর হাত পায়ে ভার ভার লাগে।’
‘এতে চিন্তা করার কী আছে?’
‘গলা শুকিয়ে যায়’ রাহুল বলে চলল, ‘ক্লান্তি আসে, খুব তেষ্টা পায়, ওজনও কমে গেছে।’
‘খাচ্ছে কেমন, স্বাভাবিক।’
‘হ্যাঁ, তাই।’
‘খুব জল খাচ্ছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘পেচ্ছাপও বারবার করছে?’
‘বলতে পারছি না।’
‘এটা হার্টের ব্যাপার নয়। ডাক্তার দেখিয়ে ব্লাড শ্যুগার টেস্ট করান। শুনে মনে হচ্ছে ডায়াবিটিস।’
‘ডায়াবিটিস।’ রাহুলের স্বরে অবিশ্বাস স্পষ্ট। ‘ট্রেনিংয়ের বাড়াবাড়ির কারণে এটা হতে পারে নাকি?’
ড. যোশি মাথা নাড়লেন। ‘কারণে নয়। প্রত্যক্ষ ভাবে নয়। যদি কোনো অ্যাথলিটের রোগটা থেকে থাকে, তাহলে চাপের মধ্যের অবস্থায় এটার প্রকাশ ঘটতে পারে, ট্রেনিংয়ের মধ্যেও হতে পারে। যেকোনো ধরনের শারীরিক গলদ ট্রেইনড অ্যাথলিটদের মধ্যে তাড়াতাড়ি ধরা পড়ার একটা ঝোঁক থাকে। তার মানে এই নয় অ্যাথলেটিকসই এর কারণ। প্রচুর লোকের মৃদু ধরনের ডায়াবিটিস আছে কিন্তু তারা তা জানে না। এরা যদি খেলাধুলোর নামে তাহলে এদের রোগটা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশিই হবে।’
‘ডায়াবিটিস মানে, শরীর যখন আর চিনি শুষে নিতে পারে না?’
‘হ্যাঁ, চিনি, স্টার্চ।’ ড. যোশি মাথা নাড়লেন। ‘পাকস্থলীর নীচের অংশের তলায়, পেটের পিছন দিকে প্যানক্রিয়াস নামে যে গ্ল্যান্ড, সেখান থেকে যখন যথেষ্ট হরমোন ইনসুলিন আর তৈরি হয় না, তার ফলে তখন অত্যাধিক পরিমাণ চিনি রক্তে আর পেচ্ছাপে জমা হয়। চিকিৎসা না করালে রক্তে জমা বিষ ব্রেইনকে আক্রমণ করবে, তার ফলে কোমার অবস্থায় নিয়ে যাবে, তারপর মৃত্যু। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রনের মৃত্যু এভাবেই হয়েছিল। শুরু হয়েছিল ডায়াবিটিস থেকে। খাওয়ার নিয়ন্ত্রণ আর ওষুধের সাহায্যে, বিশেষ করে ইনসুলিনের সাহায্যে, একে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু চিরতরে সারিয়ে তোলা যায় না। বছর সত্তর আগে ইনসুলিন চিকিৎসার পূর্ববর্তী সময়ে ডায়াবিটিস ছিল মৃত্যু পরোয়ানা।’
‘আচ্ছা প্যানক্রিয়াসের কাজ বন্ধ হওয়ার কারণটা কি আমরা জানি?’
‘জেনেছি বললে ভুল বলা হবে। যতদূর মনে হয় কিছু স্ট্রেস বা চাপের অবস্থার মধ্যে এটা হওয়া সম্ভব। যদি ওখানে কিছু দুর্বলতা থেকে থাকে তাহলে বা মোটা লোকেদের ক্ষেত্রেও মনে হয় বাড়িয়ে তোলে। গর্ভাবস্থা স্টেরসের একটা কারণ, তেমনি শারীরিক বৃদ্ধি বা গ্রোথ।’
‘গ্রোথ?’ রাহুল চেয়ার থেকে অর্ধেক উঠে শূন্যেই থমকে রইল। ‘শারীরিক বৃদ্ধি?’
‘নিশ্চয়। কৈশোরে ধকধক করে বেড়ে ওঠার সময় প্রায়ই তো ডায়াবিটিস ধরা পড়ে। যে সব অল্পবয়সিদের এটা হয়েছে গবেষণা থেকে দেখা গেছে, শরীরের বাড়ের সময়টায় তারা গড়পড়তা সমবয়সিদের থেকে কমপক্ষে অন্তত একবছর এগিয়ে। অরোরা সাব একটা কথা কিন্তু বলে রাখি, ঠিকমতো ডায়াগনোসিস না করে আগেভাগেই কিছু ধরে নিলে কিন্তু ভুল করা হবে। আপনি যেসব লক্ষণের কথা বললেন তার ভিত্তিতে আমার ব্যাখ্যা ভুলও হতে পারে। সেজন্য দরকার ব্লাড শ্যুগার টেস্ট।’
‘ধন্যবাদ ডক্টর। ওটাই যাতে হয় সেটা আমি দেখছি। আপনার পরামর্শের জন্য সত্যিই কৃতজ্ঞ রইলাম।’
নেহরু স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের অফিসে এসেই রাহুল তার ব্রিফ কেস ঘেঁটে ড. সুদের দেওয়া কার্ডটা বার করল। এককোণে চণ্ডীগড়ের ফোন নাম্বারটা রয়েছে। এস টি ডি ডায়াল করে সে পেয়ে গেল।
‘ড. সুদ। হু ইজ দিস?’
‘রাহুল অরোরা। ডক্টর সেদিন প্লেনে আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় আপনি গ্রোথ হরমোন নিয়ে একটু বলেছিলেন। ওটার নাম কী যেন—’
‘এইচ জি এইচ, হিউম্যান গ্রোথ হরমোন—সোমাটোট্রোপিন। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে হয়।’
‘আপনার মনে আছে কি, আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম, স্বাভাবিক শিশুদের ওপর এই জি এইচের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? তাইতে আপনি বলেছিলেন এমন কাজ লোকে কেন করবে সেটা আপনি বুঝে উঠতে পারছেন না।’
‘মনে পড়ছে।’
‘ব্যাপারটা আবার একটু জেনে নেওয়ার জন্য ফোন করছি। খুব জরুরি না হলে আপনাকে বিরক্ত করতাম না। শুধু একটা প্রশ্ন। এর উত্তরের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।’
‘বলুন।’ ড. সুদের শান্ত গলা।
‘এইচ জি এইচ প্রয়োগ সম্পর্কে আপনার আপত্তির কারণ কি এটাই যে এর সঙ্গে ডায়াবিটিসের সম্পর্ক আছে?’
‘আপনি যদি বেশ কিছু কাল ধরে বেশি পরিমাণে এইচ জি এইচ দিয়ে যান তাহলে যে অবস্থাটা তৈরি হবে তাকে হাইপারগ্লিসেমিয়া বলে। তার ফলে কতকগুলো ব্যাপার প্যানক্রিয়াসে ঘটে শেষ পর্যন্ত ক্রনিক ডায়াবিটিস দাঁড়াবে। মি. অরোরা, যারা এটা ব্যবহার করে তারা এটা জানে।’
নয়
‘বলছ কী তুমি?’
অর্জুনকে যদি কেউ বলত এইবার তোমার টেবিলে পরমাণু বিস্ফোরণের পরীক্ষাটা করে দেখানো হবে তাহলেও সে বোধ হয় এত অবাক এত সন্ত্রস্ত হত না।
‘আমি ঠিক কী ভুল সেটা জানতেই দিল্লি থেকে উড়ে এসেছি। বড়ো বড়ো কোম্পানির সঙ্গে এনডোর্সমেন্ট চুক্তি করে তারপর বোকা বনে আমার নাম খোয়াতে আমি রাজি নই। তা ছাড়া এটা যদি সত্যি হয় তাহলে একটা জীবনও নষ্ট হয়ে যাবে। আমি এখনি সোনালিকে দেখতে যাব, তারপর ডা. সরকারের সঙ্গে কথা বলব। অর্জুন এখন তুমি আমায় সেই নার্সিং হোমে নিয়ে চলো। তুমি এটাও বুঝতে চেষ্টা করো, এই প্রোজেক্টের সঙ্গে তোমারও স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তুমি অলরেডি লাখ টাকা ঢেলেছ।’
