রাহুল যখন ভেবে কিছুই ঠিক করতে পারল না তখন সে সেক্রেটারিকে বলল কলকাতায় অর্জুনের অফিসে ফোন করতে। সে কথা বলবে।
দু—মিনিট পরই ‘হ্যালো, অর্জুন? গতকালের একটা কলকাতার কাগজে খবর দেখলাম একটা, সত্যি?’
‘সোনালি এখন ঠাকুরপুকুরের কাছে একটা প্রাইভেট নার্সিং হোমে রয়েছে।’
‘হিডন্যাপ হয়নি?’
‘না।’
‘তাহলে পুলিশে খবর দিয়ে এসব কী কথা হচ্ছে?’ বিস্ময় থেকে রাহুল এবার রাগে চলে গেল।
‘কী করা হচ্ছে বলতে পারব না তবে ওকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।’
‘কার ব্যবস্থা এটা, ডা. সরকারের?’
‘তা না হলে আবার কার। সোনালির পা ভারী হওয়া আড়ষ্ট হওয়ার কথা তো জান।’
‘হ্যাঁ, ভাইরাস থেকে। গলাও শুকিয়ে যাচ্ছে। তা সেটা এখনও সারেনি?’
‘না। বাঙ্গালোর থেকে ফেরার সময় প্লেনে বারবার জল চাইছিল। কলকাতায় নেমে দেখা গেল ও বেশ অসুস্থ। ভীষণ ঘামছে আর বলল দুর্বল লাগছে। দমদম থেকে ওদের সবাইকে নিয়ে আমি সোজা আমার বাড়িতে আনি। পরদিন ডা. সরকার ওকে পরীক্ষা করে সিনহাকে বললেন অনন্ত সাতদিন ট্রেনিং বন্ধ রাখতে হবে। শুনে তো সিনহা ক্ষেপে উঠল, চেঁচিয়ে বলল, আপনিই দায়ী সোনালির এই অসুস্থতার জন্য। একেই বেশি সময় হাতে নেই, তার উপর কিনা এক সপ্তাহ বাদ। ডা. সরকার বললেন, তার থেকেও জরুরি ব্যাপার, আর আটদিন পরই সোনালির মেডিক্যাল টেস্ট। তারমধ্যে ওকে তৈরি করে ফেলতে হবে। টেস্টে উতরোতে না পারলে গোটা প্রোজেক্টই চুরমার হয়ে যাবে।’
‘অর্জুন আমি বুঝতে পারছি না, অসুস্থ যদি হয়ে থাকে তাহলে সেরে ওঠার যথেষ্ট সময় এখনও হাতে রয়েছে। ওর তো এইডস বা ওইরকম কিছু তো হয়নি।’
‘কেউ জানে না ওর কী হয়েছে একমাত্র ডা. সরকার ছাড়া। একটা ব্যাপারে উনি প্রচণ্ড জেদি—ফিট না হওয়া পর্যন্ত সোনালির মেডিক্যাল টেস্টে কিছুতেই অ্যাপিয়ার হওয়া চলবে না। আমার মনে হল রাহুল, হার্টের কোনো ব্যাপার। যেভাবে ওরা ওকে গরুমোষ তাড়ানোর মতো করে অমানুষিক ট্রেনিং করিয়েছে, তাতে হার্ট জখম হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। উনি ভয় পাচ্ছেন, কার্ডিওগ্রামে এটা ধরা পড়ে যাবে।’
‘অবস্থা এখন এমনই যে প্রাইভেট নার্সিং হোমে রাখার মতো?’
‘সরকার তো বললেন আরও রেস্ট, আরও অবজারভেশনে রেখে আবার টেস্ট না করে উনি মেডিক্যালে পাঠাবেন না। তারপর সিনহার সঙ্গে আলাদা কী সব কথাটথা বলে আমাকে জানালেন, সোনালিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এই কথাটা তিনি রটাতে চান। এটা তিনি চান, ওর সেরে ওঠার জন্য খানিকটা সময় যাতে পাওয়া যায়। সোনালি সেরে উঠলে ওকে পাঠাবেন এন আই এস ডাক্তারদের কাছে।’
‘পাগলামি স্রেফ পাগলামি।’
‘তা বলতে পার, কিন্তু আমার কাছে এটাই এই মুহূর্তে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। তাই আমিই আমার এক বন্ধুর নার্সিং হোমে ওকে রাখার ব্যবস্থা করেছি। কলকাতার একটু বাইরে নির্জন বাড়ি কেউ টের পাবে না। ওখানে কর্মচারী, নার্সরা সোনালিকে কেউ চিনলেও চেপে থাকবে খবরটা, চাকরি যাবার ভয় আছে তো।’
‘পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে, এটা মনে রেখো।’
‘পুলিশ এ ক্ষেত্রে কী করবে? তারা বাবার কথাই তো সত্যি বলে ধরবে। মিসিং পার্সন বলে গণ্য করে এবার মুক্তিমূল্যের জন্য টেলিফোন বা চিঠির অপেক্ষা করা ছাড়া আর কী করতে পারে?’
‘খোঁজখবর তো করবে।’
‘ডা. সরকারের দেওয়া খবর থেকে যতটা পারে রুটিনসাফিক খোঁজ করবে।’
‘এরপর সোনালি ফিরে এসে কী বলবে?’
‘বলবে একদল লোক তাকে ট্যাক্সি থেকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছল। ডা. সরকার বললেন, তার কয়েকজন ব্যবসায়ী বন্ধু মুক্তিমূল্যের টাকাটা দিয়েছেন। কিডন্যাপররা সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলে আর জানিয়েও দেয় পুলিশকে কিছু বললে সোনালির লাশ গঙ্গায় ভাসবে। তাই ভয়ে তিনি পুলিশকে জানাননি। রাহুল, গেমসের পর কমার্শিয়াল কনট্রাক্টে ওর সই করার কারণ হিসাবেও এটা ভালো কাজ দেবে। সোনালি বলবে, যারা তার মুক্তিমূল্যের টাকা দিয়েছিল তাদের ঋণ সে শোধ করতে চায়?’
অর্জুনের কথা শুনে রাহুল বিন্দুমাত্র উল্লসিত হল না। ‘সরকারের সঙ্গে আমি সোজাসুজি কয়েকটা কথা বলতে চাই অর্জুন। সোনালির ট্রেনিং যদি এইসব কারণে বন্ধ থাকে তাহলে কিন্তু আমি গভীর জলে পড়ে যাব। আমি স্পষ্ট জানতে চাই নার্সিং হোমে হচ্ছেটা কি? সরকার এখন কোথায়?’
‘বর্ধমানে কিংবা পার্কসার্কাসে বোনের বাড়িতে, ঠিক জানি না।’
বিরক্ত মুখে রাহুল রিসিভার রেখে দিল। পরদিন সকালেই সে নেহরু স্টেডিয়ামে সাই—এর নতুন মেডিক্যাল ডিরেক্টর ড. যোশির সঙ্গে দেখা করল, তার অফিসের একটি ছেলের ভগ্নিপতি ড. যোশি। গোলগাল ছোটোখাটো, বছর তিরিশের যুবক। পরিচয় দিয়ে রাহুল সরাসরি প্রশ্ন করল, ‘একজন অ্যাথলিটের উপর খুব বেশি ট্রেনিংয়ের চাপ পড়লে কী কী লক্ষণ ফুটে উঠবে?’
‘আপনি আর একটু নির্দিষ্ট করে বলুন। রানার কি?’
‘হ্যাঁ। লং ডিস্টানস।’
‘মাসকুলার ইনজুরির কথা বলছেন কি?’
‘না। মনে হয় হার্টের ব্যাপার।’
‘দেখুন আধুনিক যেসব জ্ঞানের ভিত্তিতে এখন ট্রেনিং পদ্ধতি গড়ে উঠছে তাতে হার্টের জখম আর হয় না। অজ্ঞদেরই এটা হতে পারে।’
‘কিন্তু লক্ষণগুলো কী?’
‘শরীরের উপর প্রচণ্ড ধকল হলে নানাভাবেই তার প্রকাশ হতে পারে। ধরুন সাধারণভাবে বমি, মাথাঘোরা, রক্তচাপ নেমে যাওয়া, হার্টেও—দেখুন অরোরাসাব আমাদের সময়টা অনেক বেঁচে যাবে যদি বলেন আপনার অ্যাথলিটের মধ্যে কি ধরনের লক্ষণ দেখা গেছে।’
