কথাগুলো বলে রাহুল আচমকাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সোনালি অনেকক্ষণ বন্ধ দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর বালিশের তলা থেকে ঘুমের ট্যাবলেটটা বার করে মুখে পুরল। তারপর বিছানায় শুয়ে মাথার বালিশটা বুকে জড়িয়ে হাত হয়ে চোখ বন্ধ করল।
আট
রাহুল দিল্লি ফিরে এসে আবার কাজের মধ্যে ডুবে গেল। এনডোর্সমেন্টে আগ্রহী হতে পারে এমন কয়েকটা কোম্পানিতে খোঁজ নিতে লাগল। শ্যাম্পু, মল্ট, ড্রিঙ্কস, সফট ড্রিঙ্কস, সাইকেল টুথপেস্ট, স্পের্টসওয়্যার, রিস্ট ওয়াচ, গায়েমাখা সাবান তৈরির ব্যাবসা সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে দেখা করার কাজ সেরে ফেলার জন্য বোম্বাই যাবে ঠিক করল যেদিন তার পরদিনই সে কলকাতার একটা ইংরাজি সান্ধ্য পত্রিকার প্রথম পাতায় দেখল সোনালির ছবি আর পাশে বিরাট মোটা অক্ষরে হেডিং ‘সোনালিকে খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনুমান অপহরণ করা হয়েছে।’
রাহুলের হাত থেকে কাগজটা পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। সে গোগ্রাসে খবরটা গিলতে শুরু করল: স্টাফ রিপোর্টার, কালকাতা—আসন্ন বার্সিনোলা অলিম্পিকসে পদক জেতার প্রতিশ্রুতি জাগানো মেয়ে লং ডিস্ট্যান্স অ্যাথলিট সোনালি সরকারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বল তার বাবা ডা. সারদাচরণ সরকার আজ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে জানিয়েছেন। গতকাল সোনালি তাদের ধর্মমানস্থ বাসভবন ও ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য পার্ক সার্কাসে তার পিসির বাড়ি থেকে সকালে একটি ট্যাক্সিতে রওনা হয়েছিল একাই। উদ্দেশ্য, হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে বর্ধমান যাওয়া। সেখানে তার বাবা এবং কোচ বিজয় সিনহা রয়েছেন। সোনালি না পৌঁছানোয় সারাদিন তার অপেক্ষা করেন। অবশেষে পরদিন ডা. সরকার ছুটে আসেন তার বাবা এবং কোচ বিজয় সিনহা রয়েছে। সোনালি না পৌঁছানোয় সারাদিন তারা অপেক্ষা করেন। সবশেষে পরদিন ডা. সরকার ছুটে আসেন আলিপুরে ভাবানী ভবনে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক মুখপাত্র বলেছেন, সোনালিকে সম্ভবত কিডন্যাপ করা হয়েছে বলেই তাদের অনুমান।
তিন সপ্তাহ আগে সোনালি সাই—এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ইনভিটেশ্যনাল ম্যারাথনে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিল অকল্পনীয় সময় রেখে এবং জিতেছিল এক লক্ষ টাকা। তার সময় বিশ্বের সেনা সময়ের কাছাকাছি হয়। ধূমকেতুর মতো আবির্ভূতা কুড়ি বছর বয়সি এই মেয়েটির চোখধাঁধানো পারফরমেন্স তাকে অলিম্পিক পদক জয়ের জন্য চিহ্নিত করে দেয়। ১৯৫২—এ কুস্তিগীর যাদবের ব্রোঞ্জ লাভের পর এখন পর্যন্ত কোনো ভারতীয় অ্যাথলিট যা অর্জন করতে পারেনি। সবথেকে বিস্ময়কর, সোনালি সরকার সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত কেউ কিছুই জানে না, এমনকী বাংলার অ্যাথলেটিক্স সংস্থার লোকেরাও তার বিষয়ে অন্ধকারে রয়েছেন। ম্যারাথনে সে কোনো ক্লাব, জেলা বা রাজ্যের তরফ থেকে নয় ‘অসংশ্লিষ্ট’ হিসাবে সরাসরি সাই—এর কাছে নাম পাঠিয়েছেন। ঠিকানা ছিল পার্কসার্কাসে নাসিরুদ্দীন রোডে তার পিসির বাড়ির। সোনালি আগামী মাসে সল্টলেক স্টেডিয়ামে অলিম্পিক ট্রায়ালে দশ হাজার মিটার দৌড়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে ঠিক করেছে। বাঙ্গালোরে সদ্য অনুষ্ঠিত ইন্দো—সোভিয়েত মিটে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করার সময় ফিনিশিং লাইনের কাছে পড়ে যাওয়ার দশ হাজার মিটার রেসটি শেষ করতে পারেনি। পতনের আগে পর্যন্ত তার যা সময় হয়েছিল তাতেও অলিম্পিক পদক জয়ের মতো আশা রাখা যায়। আগামী সপ্তাহে সল্টলেক এনআইএস—এ সোনালির পতনের কারণ সম্পর্কে তার মেডিক্যাল পরীক্ষার কথা।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সিআইডি, আই জি, গোপাল সিং বলেছেন, ‘এখনই নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে সোনালিকে কিডন্যাপ করার কথাটাই আমরা প্রথমে ভাবছি। মেয়েটির পদক জয়ের সম্ভাবনা যথেষ্টই, অলিম্পিকসও এসে পড়েছে। সুতরাং তার অপহরণকারীরা ভেবে থাকতে পারে বহু টাকার মুক্তিমূল্য তারা এখন আদায় করতে পারবে। বহু অর্থবান দেশপ্রেমী যারা ভারতের অলিম্পিক সাফল্য দেখতে চান, তারা হয়তো সোনালির মুক্তির জন্য টাকা নিয়ে এগিয়ে আসবেন যাতে সে বার্সিলোনায় যেতে পারে।’
এরপর যা লেখা আছে রাহুলের তা পড়ার আর দরকার নেই। সোনালির মেডিক্যাল পরীক্ষা কয়েকদিনের মধ্যেই। তা ছাড়া গেমসের জন্য ওর প্রস্তুতিও বাধা পেল। আর কিনা এখন—’
হঠাৎ তার মনে হল, সোনালি নিজেই কোথাও পালিয়ে যায়নি তো? কোনো বন্ধুর বাড়ি, আত্মীয়ের বাড়ি? কিন্তু যেভাবে ও মানুষ হয়েছে তাতে ওর কোনো বন্ধু থাকার কথা নয়। আত্মীয়দের বাড়িতে গেলে ধরা পড়ে যাবে। তা ছাড়া পিসি ছাড়া আর কোনো আত্মীয়কে কি চেনে?
পুলিশ বলছে, কিডন্যাপিং সত্যিই যদি তাই হয় তাহলে ভাবনার কথা। মাত্র একলাখ টাকা সোনালি জিতেছে। তা ছাড়া ডা. সরকারের নিজের কোনো অর্থ নেই। তবে কনসরটিয়ামের টাকা তার কাছে এবং তিনিই তা নাড়াচাড়া করেন। কিন্তু তার ফান্ডেই বা এখন কত টাকা আছে? কিডন্যাপাররা কী এটা ভেবে দেখবে না, টাকা তারা পাবে কোথা থেকে? দেশপ্রেমী ভারতীয়? কিংবা এমনও হতে পারে, স্বর্ণকুমারী প্রোজেক্টের সঙ্গে জড়িত ৬০ লক্ষ টাকার কথাটা, কোনোভাবে হয়তো বাইরের কেউ জেনে গেছে। তারা জানে সোনালিকে ফিরে পাবার জন্য কনসরটিয়াম মুক্তিমূল্য দেবেই দশ লক্ষ টাকা চাইলেও দেবে।
