‘আমি বাইরে থেকে ফোন করছি। তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। জানতে চাই কেন এমন হল। কুড়ি মিনিটের মধ্যেই যাচ্ছি। ডা. সরকার তো বেরিয়েছেন তাই না!’
‘হ্যাঁ। ফেডারেশন থেকে দু—জন লোক এসেছিলেন। ওরা আজকের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে চায়। বাবা এন আই এস অফিসে গেছেন।’
‘আমি আসছি।’
ফোন রেখে রাহুল বাথরুমে ঢুকল। বেরিয়ে এসে দেখল স্যান্ডুইচ, কফি টেবলে রাখা। অর্জুন আর তার গড়ন একই সুতরাং টি—শার্ট ও প্যান্ট ঠিকই শরীরে লেগে গেল। সে দ্রুত খেতে শুরু করে দিল।
‘রাহুল খুব সাবধানে কথা বোলো ওর সঙ্গে। কাল যখন ওকে তুলে আনা হল ট্র্যাক থেকে তখন হিস্টিরিয়ার মতো ওর হাবভাব দেখেছি। মনে হচ্ছিল মেন্টাল ব্যালন্স হারিয়ে ফেলেছে।’
রাহুল জবাব না দিয়ে খেয়ে চলল। সে তখন সোনালির ঝুলেপড়া চোয়াল, বিস্ফারিত চোখ আর শ্রান্ত পদক্ষেপ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।
২৩১ নম্বর ঘরের দরজা পিছনে বন্ধ করে রাহুল তাকাল সোনালির দিকে । তারপর ঘরের চারধার। ঘরটা একা ওর জন্যই। পাশের ঘরে ডা. সরকার ও বিজয়। টিভি বন্ধ করে সোনালি উঠে দাঁড়াল। ওর পরনে ঢলঢলে ম্যাক্সি গাউন।
‘আমি কিন্তু এখন ভালোই আছি। শুধু গলায় একটু ব্যথা আর জলতেষ্টা পাওয়া ছাড়া আর কোনো অসুবিধে নেই। প্রায় এক কলসি জল খেয়ে ফেলেছি।’ সোনালি হেসে উঠল। ‘এখনও তেষ্টা পাচ্ছে। গলার জন্য বাবা ট্যাবলেট দিয়েছেন, সেটা খেয়েছি।’
‘তোমার শরীরে ভারভার লাগা, আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া এসব তো আগে থেকেই হত। বিজয়বাবু তাই বললেন। কলকাতায় ম্যারাথনের পরও হয়েছে।’
‘কিন্তু ম্যারাথন আমি জিতেছি, আমার টাইমও ওয়ার্ল্ড বেস্ট থেকে বেশি পিছনে নয়। বার্সিলোনায় আমি ইনগ্রিড ক্রিস্টিয়েনসেনের সাত বছরের পুরোনো বেস্ট টাইমটা ভাঙবই। সেদিন অত গরমের জন্য পথে একটু বেশি জল খেয়ে ফেলেছিলাম। ৩১ জুলাই বার্সিলোনায়, ভূমধ্যসাগরের ধারে, ওয়েদার খুব ভালো থাকবে। তা ছাড়া রাস্তাও খুব ভালো পাব।’
রাহুলের মনে হল, নিজেকে চাঙ্গা করার জন্যই এইসব কথা বলছে। কিন্তু ওর কটা চোখের পিছনে ভয়ের একটা ছাড়া থেকে থেকেই ভেসে উঠছে।
‘আপনি কি খুব চিন্তায় পড়ে গেছেন? তাই তো, ষাট লাখ টাকা কামাবার প্ল্যানটা বোধ হয় ভেস্তে গেল?’
‘না। টাকার কথা ভাবছি না।’
‘তা না আর কী ভাববেন, আপনি ব্যবসায়ী।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আমি মানুষও তো বটে।’
‘মানুষ তো সবাই, কিন্তু কীরকম মানুষ আপনি?’
‘সোনালি আমি তোমার ভালোমন্দর কথা ভাবি। তুমি কী ভাবো না, সোনা জেতার বাইরেও একটা জীবন আছে।’
ওর মুখের উপর দিয়ে দিশেহার একটা মেঘ ভেসে গিয়েই আবার রোদ ফুটে উঠল।
‘আগের কথা আগে। আগে বার্সিলোনার ভাবনা তারপর অন্য জীবনের ভাবনা।’
‘তুমি কি জান, কত্ত লোকের আশা—আকাঙ্ক্ষা তোমার উপর নির্ভর করছে? তোমার ওই দুটো পায়ের উপর?’
‘জানতাম না সেটা। কিন্তু সেদিন ম্যারাথনে আমি খানিকটা বুঝেছি। জানেন, ডেবির সঙ্গে ছোটার সময় বুঝতে পারছিলাম আমি ওকে হারাতে পারব। তাই ইচ্ছে করেই ওকে একটু এগিয়ে যেতে দিয়েছিলাম। ইঁদুর—বেড়াল খেলার মতো। কিন্তু জানতাম আমি জিতব, আমি জানতাম শেষ কিলোমিটারে ওকে আমি গড়াগড়ি খাওয়াব। তখন এটা মনে হতেই আমারমধ্যে অদ্ভুত একটা ভাব জেগে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল আমি কে, সেটা যেন কিছুটা টের পাচ্ছি। নিজেকে যেন খুঁজে পাচ্ছি। পুরো খুঁজে পাব যখন বার্সিলোনায় গিয়ে পৃথিবীকে হারাব।’
‘তুমি কি ঠিক জান, নিজেকে তুমি খুঁজে পাচ্ছ?’
‘তার মানে?’
রাহুল একটু সাবধানে বলল, ‘তোমার ম্যারাথনের অভিজ্ঞতা থেকে তুমি নিজের আসল প্রকৃতিটা টের পেয়েছ। তাই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘না। জীবনে ওটা তোমার প্রথম সুযোগ ছিল ভিতরের উদবেগ উত্তেজনা বার করে দেবার। তুমি ইঁদুর—বেড়াল খেলার মেয়ে নও?’
‘তাহলে আমি কী?’
‘আমি জানি না। তবে এখন তুমি আমার কাছে একটি মেয়েই। দুটো সোনা জেতার জন্য কঠোর ট্রেনিংয়ের চাপে যন্ত্র হয়ে যাওয়া, স্বাধীন তেতনা হারানো রোবোট নও, যে শুধু নিজেকে জাগিয়ে তোলার জন্য তোতাপাখির মতো শেখানো বুলি আওড়ায়।’
কথা বলতে বলতে রাহুল এগিয়ে এসে সোনালির সামনে দাঁড়িয়েছিল। এইবার সে অদ্ভুত একটা কাজ করল। দু—হাত দিয়ে জড়িয়ে ওকে বুকে টেনে এনে আচমকা ঠোঁটে চুমু খেল। সেইসঙ্গে অনুভব করল মৃদু একটা কম্পন সোনালির বুক থেকে ঝলকে নেমে গেল। ওর দেহ ক্রমশ আলগা, ভারী হয়ে যাচ্ছে বাহুর বন্ধনে। যেন তারিয়ে উপভোগ করছে নতুন একটা ব্যাপার। আর নয়, রাহুল হাত খুলে দিয়ে দু—পা পিছিয়ে এল।
হতভম্ব চোখে সোনালি তাকিয়ে। মুখ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। পিছিয়ে গিয়ে সে খাটে বসে পড়ল।
‘নিজেকে আর খোঁজার চেষ্টা নাই বা করলে সোনালি। এ খোঁজার শেষ কোথাও নেই।’ রাহুলের গলায় মিনতি। ‘তোমার বেঁচে থাকাটা এখন বড় কথা। লক্ষ লক্ষ লোকের উচ্ছ্বাস, আরাধনা, বন্দনা, কাগজে কাগজে ছবি আর প্রশস্তি। এ সবই এক বছর বড়োজোর দু—বছরের জন্য। তারপর দেখবে বিরাট শূন্যতা তোমায় গিলে খাচ্ছে। বহু সুপারস্টারের জীবনে এটা ঘটতে দেখেছি। সে বড়ো ভয়ংকর অবস্থা। তোমার ফেভারিট গায়ক ইমদাদ ক্রমশ ওই অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তুমিও যাবে। ভেবে দ্যাখো।’
