‘বোধহয় নার্ভাস হয়ে এটা হয়েছে।’
‘প্রত্যেক অ্যাথলিটেরই এটা হয়। না আমার মনে হয়নি নার্ভাসনেস থেকে এ সব হয়েছে।’
‘বেশ বলুন তাহলে আপনার কী মনে হচ্ছে?’
অযথাই বিজয় সিনহা চট করে চারপাশ দেখে নিয়ে বলল, ‘শরীরে কিছু হয়েছে। মনে হয় কোনো ভাইরাসঘটিত ব্যাপার। অবশ্য আমি ডাক্তার নই, হয়তো আমার ভুল হতে পারে।’
‘তাহলে ডা. সরকারের ওকে পরীক্ষা করা উচিত ছিল, করেছেন কি?’
‘করবেন বলেছিলেন কিন্তু করেননি। এটাই আমার কাছে অবাক লাগছে মি. অরোরা এত পরিশ্রম, এত খুঁটিনাটি যত্ন, এত চিন্তাভাবনা উনি করেছেন, আমিও করেছি, এত টাকা খরচ হয়েছে অথচ এই ব্যাপারটায় ওনার কীরকম যেন একটা এড়ানো এড়ানো ভাব। এই নিয়ে সেদিনও বর্ধমানে কথা কাটাকাটি হয়েছে ওর সঙ্গে। দুবছর ধরে আমি মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করেছি মেয়েটার জন্য। আহা, কী দারুণ যে রানার মি. অরোরা, কী খাটিয়ে আর কী যে ট্যালেন্টেড আপনাকে কী বলব। দুনিয়াকে দেখবার মতো একটা জিনিস ভারত পেয়েছে। আর তার কোচ, বলুন আমার কী জানার অধিকার নেই ওর শরীরে কী হয়েছে? মেয়ে কি শুধু একলা ওনারই, আমারও কি নয়?’
বিজয় সিগারেট ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে আবার চেয়ারে বসল। ‘একটু আগে ওনার সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেছে। উনি রাজি হয়েছেন সোনালিকে চেক—আপ করতে। কলকাতায় ফিরে গিয়েই করাবেন।’
‘আপনি কিছু বূঝতে পারছে না, ভাইরাস ছাড়া অন্য কিছু?’
‘সত্যিই আমি বুঝছি না।’ অসহায় মুখে বিজয় তাকাল। রাহুল উঠল। ‘আমি একবার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আসি।’
রাহুল যাবার সময় সিগারেটের প্যাকেট টেবলেই রেখে গেল।
ডা. সরকার আর তার সঙ্গে দুটি লোক এগিয়ে আসছে। একটি তরুণী বছর দুয়েকের বাচ্চচার হাত ধরে রাহুলের বাঁ—পাশে গিফট স্টোর থেকে বেরোচ্ছে। বাচ্চচটি বার বার দোকানের ভিতরে তাকাচ্ছে। বোধ হয় কিছু একটা চেয়েছিল, মা কিনে দেয়নি। রাহুল চট করে বাচ্চচাটিকে কোলে তুলে নিয়ে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে ওর মাকে বলল, ‘আমি বাচ্চচাদের ভালোবাসি, ওর জন্য কিছু কি কিনে দিতে পারি?’
মহিলা থতমত হয়ে আমতা আমতা করছেন। সেই সময় ডা. সরকার এবং দু—জন তার পাশ দিয়ে চলে গেল। রাহুল হাঁফ ছাড়ল। তাকে চিনতে পারেননি। মুখ নামিয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে ডা. সরকার হাঁটছেন। এভাবে হাঁটলে একটু দূরের লোককে দেখা যায় না।
‘না বলবেবেন না প্লিজ। আমি আসছি।’
রাহুল হতভম্ব মহিলাকে দাঁড় করিয়ে গিফট স্টোরে ঢুকল বাচ্চচাটিকে কোলে নিয় এবং মিনিট চারেক পরই বেরিয়ে এল। একটা একফুট লম্বা ভাল্লুক বাচ্চচার হাতে আর তার নিজের পকেটে দুটো চকোলেট বার।
‘এত সুন্দর আপনার বাচ্চচা যে আমি কিছু প্রেজেন্ট করার লোভ সামলাতে পারলাম না। না না, ধন্যবাদ দেবার দরকার নেই। আচ্ছ—’ বাচ্চচার গাল টিপে দিয়ে রাহুল এবার দ্রুত ২২৯ নম্বর ঘরের দিকে ছুটল। শ—খানেক টাকা বেরিয়ে গেল যাক। ডা. সরকারকে এখন সে এড়িয়ে যেতে চায়।
দরজার টোকা দিয়ে ‘কাম ইন প্লিজ’ শুনে রাহুল ভিতরে ঢুকল। অর্জুন টিভি—র দিকে তাকিয়ে বিছানায় পা ছড়িয়ে আধশোয়া। রাহুলকে দেখে অবাক হয়ে উঠে বসে বলল, ‘কখন এলে?’
‘ঠিক সময়ে। আমি দেখেছি স্টেডিয়ামে কী ঘটল। সোনালি কোথায়?’
‘পাশেই ২৩১ নম্বর ঘরে।’
‘ব্যাপারটা কী জানতে হবে। ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই। বিজয় সিনহার সঙ্গে কথা বলেছি। ডা. সরকারের সঙ্গেও বলব কেননা পুরো প্রোজেক্ট এখন বিপদের মুখে এসে গেছে। সোনালির সিলেকশনই আটকে যেতে পারে আজকের এই ঘটনার পর। তাহলে কী হবে ভেবে দেখেছ?’
‘ঠিক এই কথাটা আমারও মনে হয়েছে।’ অর্জুন উঠে বসল। ‘কখন খেয়েছ? আনাব কিছু?’
‘কয়েকটা চিজ স্যান্ডুইচ আনাও আর কফি। আমি এখনো হোটেলে চেন—ইন করিনি। সঙ্গে একটা ব্রিফকেস পর্যন্ত নেই। রাতটা কাটিয়েই চলে যাব। নীচে ট্রাভেল এজেন্টের অফিস রয়েছে। তুমি আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করো কাল সকালেই। এই নাও টিকিট, ওর সিট পাইতে দিতে পারে। জরুরি কাজ ফেলে শুধু এই রেসটা দেখব বলেই এসেছি। আমাকে ফোন করে জানানোর জন্য তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ অর্জুন। এখানে উড়ে না এলে, ঘটনাটা দেখলে আমি অন্ধকারেই থেকে যেতাম।’
বলতে বলতে রাহুল শার্ট খুলতে শুরু করল।
‘আমার সুটকেশটা দেখো। ফ্রেশ শার্ট—প্যান্ট পাবে। আর অন্য ব্যবস্থাগুলো রিসেপশনে কথা বলে করে দিচ্ছি।’ অর্জুন টেলিফোন তুলে রুম সার্ভিস চাইবার আগে বলল।
প্যান্ট খুলে, নগ্নদেহে তোয়ালে জনিয়ে রাহুল স্নান করার জন্য বাথরুমে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিরে এসে টেলিফোন তুলল। অর্জুন জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
‘৩৩১ নম্বর ঘর আমাকে দিন, প্লিজ।’
অর্জুন চাপা গলায় বলল, ‘সোনালিকে সিডেটিভ দিয়েছেন ডা. সরকার, ওর এখন রেস্ট দরকার।’
ফোন বেজে যাচ্ছে। সাত—আটবার রিং হবার পর রিসিভার তোলার শব্দ হল।’
‘হ্যালো, কে বলছেন?’
সোনালির গলা।
‘আমি রাহুল অরোরা। তুমি কি ঘুমোচ্ছিলে?’
‘না। টিভি দেখছিলাম। বাবা ট্যাবলেট দিয়েছিলেন। খাইনি। আমার এখন ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না। আপনি কোথা থেকে বলছেন? আজ স্টেডিয়ামে ছিলেন? আমি কী বিশ্রীভাবে দৌড়লাম, পড়ে গেলাম। কেন যে—’
রাহুলের মনে হল সে যেন কান্না চাপার মতো আওয়াজ পেল।
