সোনালির অলিম্পিক টিমে সিলেকশন পাওয়ার এবার ঝঞ্ঝাট দেখা দেবে। ওর এইভাবে দম হারিয়ে থুবড়ে পড়াটা অ্যাথলেটিক ফেডারেশন, আই ও এ—সাই—য়ের লোকেরা সন্দেহের চোখে দেখবেই। নিজেদের ডাক্তার দিয়ে মেডিক্যাল চেক—আপ করাবেই। যদি তখন কিছু গোলমাল ওর শরীরে ধরা পড়ে? কিন্তু গোলমাল কী হতে পারে অমন টগবগে, মাসল ফেটে পড়া শরীরে?
হাঁটতে হাঁটতে রাহুল দেখল সে মাহাত্ম গান্ধী রোডে এসে পড়েছে। সারি সারি দোকান রাস্তার একদিকে। চওড়া পেভমেন্ট। রাস্তার ওপারে উঁচু জমি। দেখেই বোঝা যায় অঞ্চলটা মালভূমির মতো পাহাড়ে জমি সমান করে তৈরি করা হয়েছে, রাস্তা ঢালু হয়ে আবার উঠেছে অনেক জায়গায়। কর্ণাটক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের স্টেডিয়াম দেখে রাহুল সেটা লক্ষ্য করে এগোল। ওর পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায় ওয়েস্ট এন্ড হোটেলের দিকে।
কিন্তু সে এখন যাবে কি? রাহুল দাঁড়িয়ে পড়ল। ওখানে গিয়ে কি লাভ? কনসরটিয়ামের প্রোজেক্টকে একযু আগেই সে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখেছে। সোনালিকে ঘিরেই তো ষাট লক্ষ টাকার স্বপ্ন।
ফেরার জন্য প্লেনের ওপের টিকিট তার সঙ্গে রয়েছে। যদি সিট পায় তাহলে কাল সকালের ফ্লাইটেও যেতে পারে। তারপর রাহুলের ইচ্ছে করল সোনালিকে দেখতে। ঠিক কী ব্যাপার সেটা জানার ইচ্ছাটা ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠার সে একটা অটোরিকশা ডেকে তাতে চড়ে বসল।
ওয়েস্ট এন্ড হোটেলের রিসেপশন কাউন্টারে সুরেশ, সুন্দর চেহারার দুটি পুরুষ ও মহিলা। রাহুল চাইল, অর্জুন হালদারের সঙ্গে দেখা করবে, কত নম্বরে সে আছে?
‘কবে এসেছেন?’
‘বোধ হয় দু—দিন আগে, কলকাতা থেকে।’
মোটা, বিরাটাকার রেজিস্টারটার পাতা ওলটাতে ওলটাতে মহিলা দুবার ফোন তুলে প্রশ্নের জবাব দিলেন।
‘আসার তারিখটা ঠিক করে বলতে পারেন?’
‘আপনি পরশু, এগারো তারিখের—’ রাহুলের নজর ছিল রেজিস্টারের খোলা পাতর উপর, হঠাৎ সে অর্জুনের নামটা দেখতে পেয়ে গিয়ে বলল, ‘এই যে।’
‘রুম নাম্বার টু টু নাইন।’ মহিলা পিছনে তাকিয়ে দেয়ালে আটা নম্বরলেখা কাঠের খোপগুলোর দিকে তাকালেন। খোপের নীচে সেই নম্বরের ঘরের চাবি ঝুলছে। তিনি দেখে নিয়ে বললেন ‘হ্যাঁ ঘরে আছেন।’ রাহুলও দেখল চাবি ঝুলছে না।
চমৎকার লন, তাতে বেতের চেয়ার আর টেবল পাতা। লনের ধার দিয়ে ফুলের গাছ। অনেক মেয়ে—পুরুষ চেয়ারে বসে গল্প করছে। চা, কফি বা মদ খাচ্ছে। রাহুল ২২৯ নম্বর ঘরের উদ্দেশ্যে যেতে যেতে তাকিয়ে দেখছিল। একটি লোককে একা একটা টেবল বসে সিগারেট খেতে দেখে থেমে গিয়ে লোকটির দিকে এগিয়ে গেল।
‘বিজয়বাবু একা বসে যে!’
বিজয় সিনহা সিগারেট ধরা হাতটা দ্রুত টেবলের তলায় চালান করে, তারপর রাহুলকে দেখে হাতটা আবার টেবলের উপর আনল।
‘আমায় চিনতে পারছেন? মনে আছে আছে ম্যারাথনের স্টার্টিংয়ের আগে আমি সোনালির সঙ্গে কথা বলছিলাম। তখন আপনি আপত্তি—’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে।’
‘বসব?’
‘নিশ্চয় নিশ্চয়।’ বিজয় পরে জেনেছে লোকটি কে এবং কী উদ্দেশ্যে সেদিন ম্যারাথন দেখতে গেছল। ডা. সরকার ওকে বলেছিলেন, রাহুল অরোরা নামের এই লোকটা গানবাজনা, স্পোর্টস, ফিল্ম এইসব লাইনের নামি লোকেদের এজেন্ট। তাদের জন টাকা রোজগারের ব্যবস্থা করে দেয় আর সেই টাকার একটা নির্দিষ্ট পারসেন্ট কমিশন নেয়। বিরাট ব্যাবসা, এশিয়ার নামি লোক ওর ক্লায়েন্ট। সোনালি বার্সিলোনায় দুটো সোনা জিতলে রাহুলকে ওর এজেন্ট করা হবে।
এটা শোনার পর বিজয় সিনহার মনে হয়েছিল, অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নের কোচও তো হেঁজিপেজি লোক নয়। ছাত্রী নাম করলে গুরুরও নাম হবে। তখন অনেক জায়গা থেকে তাঁর ডাক আসবে। সেগুলো ম্যানেজ করার জন্য এইরকম একজন এজেন্ট থাকলে তো ভালোই হবে।
রাহুল চেয়ারে বসে তার ডানহিলের প্যাকেটটা টেবলে রেখে বিজয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘দিশি সিগারেট খেয়ে কী হবে, এটা খান।’
বিজয় তার হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে, ডানহিল ধরাল, প্রথম টানটা দিয়ে আমেজ মৃদু মৃদু ধোঁয়া মুখ দিয়ে বার করল।
‘আপনি এখন এখানে?’ বিজয় জানতে চাইল।
‘বিজনেসের কাজে এসেছি। কাগজে দেখলাম আজ এখানে সোনালির—’।
রাহুলকে শেষ করতে না দিয়ে বিজয় হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘আমি সেই কবে ডা. সরকারকে বলেছিলাম, একবার ওকে ভালো করে পরীক্ষা করা দরকার। ট্রেনিংয়ের পর মাঝে মাঝে বলত পা দুটো কেমন ভার হয়ে যাচ্ছে। সোনালিকে দেখাশোনা করে যে মেয়েছেলেটা তার নাম শৈলবালা। শৈলকে মাসাজ করতেও শেখানো হয়েছে। ও যখন বলত, পা আড়ষ্ট লাগছে তখন শৈলকে দিয়ে মালিশ করাতাম। ডা. সরকার বললেন, এটা সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার থেকে হচ্ছে, এটার কারণ উদবেগ। অলিম্পিকসের কথা ভেবে উত্তেজিত হচ্ছে, চিন্তা বাড়ছে। ভালো ঘুম দরকার। উনি ওকে রাতে খাবার জন্য ট্যাবলেট দিলেন।’
‘ব্যাপার কী? আজ রেসে সোনালি জিতেছে?’
‘আরে জিতবে কি। আপনি জানেন মেয়েটা এখন ঘরে বিছানায় শুয়ে। দৌড় শেষই করতে পারেনি। আমি জানতাম এ রকম একটা কিছু হবে। আজও গাড়ি থেকে নেমে স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় চুপিচুপি বলল, ‘বিজয়দা কি যেন একটা হচ্ছে, শরীরটা কেমন ভার ভার লাগছে। আমি কিছু আর বলিনি। কিই বা বলব রেসের পরেরো মিনিট আগে?’
