লোকটি অবাক হয়ে তাকাল রাহুলের দিকে।
‘কতক্ষণ এসেছেন’
‘এই তো, এইমাত্র।’
‘অ। ওই তিনটে মেয়ে পাল্লা দেবে কী, ওরা তো সবে এ উনিশ পাক শেষ করল।’
রাহুল অপ্রতিভ হয়েও হেসে ফেলল। সে মন দিল সোনালির উপর। জোঁকের মতো লেগে আছে রুশিদের সঙ্গে পেশিতে ঠাসা দুটি পা, পাঁচ ফুটের কাছাকাছি, কোঁকড়া চুল, সাদা ব্লাউজ পরা মেয়েটি হঠাৎ গতি বাড়াল, লাল হাতকাটা গেঞ্জি পরা রুগণ চেহারার, ছেলেদের মতো ছাঁটা চুল অন্য মেয়েটিও তার পিছু নিল, সঙ্গে সঙ্গে সোনালিও। দুশো মিটার এইভাবে দৌড়ে সাদা ব্লাউজ মন্থর হতেই লাল গেঞ্জি গতি বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল। সোনালি সাদা ব্লাউজকে ধরে রইল। এই রকম আচমকা গতির হেরফের তিনবার হল।
যখন ওরা তার সামনে দিয়ে যাচ্ছে, রাহুলের মনে হল সোনালির মুখে সহজাত স্বাচ্ছন্দ্যটা যেন নেই। তার পা ফেলার মধ্যে ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠছে। রুশিরা ওর ফুসফুসকে নিংড়ে নিংড়ে দম বার করে দেওয়ার কৌশল শুরু করেছে।
পিছিয়ে পড়ছে সোনালি। দু—জনের অন্তত পনেরো মিটার পিছনে। স্টেডিয়ামের এধার—ওধার থেকে তাকে চাঙ্গা করার জন্য কিছু উৎসাহ বাক্য চেঁচিয়ে বলা হল।
আবার ওরা রাহুলের সামনে আসছে। ভালো করে দেখার জন্য সে গ্যালারি থেকে উঠে ফেন্সিংয়ের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। চোখের নজর বাড়িয়ে সে সোনালির মুখের দিকে তাকাল। মুখটা লাল হয়ে উঠেছে, মাখানো তেলের মতো সারা শরীর ঘামে চকচক করছে। ঠোঁট ফাঁক হয়ে দাঁত দেখা যাচ্ছে। এর আগে যখন রাহুল লক্ষ করেছিল তখন ঠোঁট বন্ধ ছিল। এখন চিবুক ঝুলে পড়েছে। পা দুটো জমি থেকে আগের মতো উঠছে না।
রাহুলের মনে হল সোনালি যে একবার একটুখানি মুখটা ফেরাল। কিন্তু তাকে দেখতে পায়নি। মনে হল, ওর গতি যেন বাড়ল।
শেষ পাকের ঘণ্টা বেজে উঠল। শেষ হবে রাহুলের ডান দিকে প্রায় একশো মিটার দূরে। পাঁচ—দশ হাজার মিটারে এখন তো শেষ দু—তিনশো মিটার স্প্রিন্ট করে ফিনিশ করে। স্পোর্টস টেকনোলজি অ্যাথলিটদের শরীরের ক্ষমতা কত দূর বাড়িয়ে দিয়েছে দু—চারটে প্রবন্ধ থেকে রাহুল তা জেনে রেখেছে।
রুশিরা ফিনিশিংয়ের ধাক্কাটা দিয়েছে। ওরা দু—জন এখন নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেছে। ওদের কুড়ি মিটার পিছনে সোনালি, সেও গতি বাড়াল।
ওরা এবার তার সামনে আসছে। প্রথমে রয়েছে রুগণ চেহারার লাল গেঞ্জির মেয়েটি। তার এক মিটার পিছনে সাদা ব্লাউজ। কোথায় সোনালি? সেই কুড়ি মিটার পিছনেই। এই ব্যবধানটা বজায় রাখার চেষ্টা করে কোনোক্রমে সে দৌড়চ্ছে।
‘স্বর্ণকুমারী… হেরে যাচ্ছ।’
রাহুল চিৎকার করল। সোনালি তাকাবার কোনো চেষ্টাই করল না। তার চোখ বেয়ে জলের ধারা নামল। রুমাল বার করে সে মুছে নিল।
ফিনিশিং লাইনে চারমিটার আগে সোনালি মুখ থুবড়ে পড়ল নিজের পায়ে পা জড়িয়ে। রাহুল দেখল, বিজয় সিনহা ছুটে গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে চলে গেল। তার পিছনে ডা. সরকার আর অর্জুন।
স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এল রাহুল। তার মনের মধ্যে এখন প্রচণ্ড সাইক্লোনের পরের অবস্থা। সে ঠিক করতে পারছে না এখন সে কোনখান থেকে তার চিন্তাটা শুরু করবে।
কিছু একটা গোলমাল ঘটেছে। সেটা কোথায়? মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে? দুই বিদেশির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে গিয়ে কি নার্ভাস হয়েছে? জীবনে এটা ওর দ্বিতীয় প্রকাশ্য রেস। কিন্তু প্রথমবারও তো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল এক অস্ট্রেলিয়ান, নামি ম্যারাথনার। অলিম্পিকসে এগারো স্থান পাওয়া। তাকে হারিয়ে সোনালি পৃথিবীর সেরা সময়গুলোর কাছাকাছি এসেছে। ওয়ার্ল্ড বেস্ট থেকে তিন—চার মিনিট দূরে। প্রচণ্ড গরমে, হিউমিড কন্ডিশনের মধ্যে দৌড়ে শেষ করেছে। শেষ হাজার মিটারে অস্ট্রেলিয়ান মেয়ের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ানোর দৃশ্যটা রাহুলের চোখে ঝলসে উঠল। কী সবল দুটো পা! ঋজু নমনীয় দেহ। মুখে পাতলা হাসি। ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। এখুনি আবার আর একটা রেসে নামার মতো ক্ষমতা ওর পদক্ষেপে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল।
আর সেই মেয়ে, কী বিশ্রীভাবে শুধু দৌড়লই না, শেষ করল কী অমর্যদাকরভাবে! যদি স্বাভাবিকভাবে দৌড়ে একঘণ্টা সময় নিয়েও শেষ করত তাহলে এত কষ্ট হত না। ম্যারাথনে সোনালির সময় ভারতের সব কাগজেই বেরিয়েছে, দিল্লিতে এসে রাহুল তার অফিসে রাখা আঠারোটা প্রধান ও মাতৃভাষার কাগজের ফাইল থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবর বিশ্লেষণ করে তার প্রচারের ধরন কী হবে, সেটা ঠিক করেছে।
আর এখন? কাল কী বেরোবে কাগজগুলোয়? বলবে ম্যারাথনের টাইম ধরায় গোলমাল ছিল। বলবে, ডোপ করে ম্যারাথন দৌড়েছিল। বলবে ম্যারাথন রুটের ডিসট্যান্সের মাপে গোলমাল আছে, নিশ্চয় ২৬ মাইলের কম।
কিন্তু ৬০ লক্ষ টাকার ব্যাপারটা কী হবে? এরপর সোনালির দুটো সোনা জেতার কী হবে?
রাহুল কালা—বোবা—অন্ধ হয়ে হাঁটছে, শুধুই হাঁটছে। এই টাকার একটা অংশ মাত্র সে পাবে। না পেলেও তার কিছু আসে যায় না। তার সুনাম, তার ব্যাবসা, তার বুদ্ধি ভবিষ্যতে তাকে কোটি টাকার এনে দেবে। বহু মেয়েকে, পুরুষকে সে ক্লায়েন্ট করেছে, কিন্তু তার অর্ধেকও প্রতিশ্রুতিমতো পূর্ণতা পায়নি। তাতে সে ভেঙে পড়েনি, মাথাও চাপড়ায়নি। কিন্তু এই মেয়েটি তার শরীরে—মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি জাগিয়েছে। কোথায় যে আকর্ষণ করেছে, সেটাই সে ধরতে পারছে না। ওর সঙ্গে কথা বলার পর রাহুল হঠাৎই এক বিচিত্র শূন্যতা বোধের মধ্যে কয়েকটা দিন কাটিয়েছে। সোনালির সৌন্দর্য স্বাস্থ্য, অকপটতা, সোনা জেতার স্থির বিশ্বাস, জড়তাহীন আচরণ আর যৌন বাসনা জাগানোর ক্ষমতা, সব মিলিয়ে তার কাছে একটা আবেগ হয়ে উঠেছে মেয়েটি। ওর কাঠিন্যের মধ্যে কোথায় যেন একটা অরক্ষিত জায়গা আছে যেখানে থেকে সোনালির দুর্বলতা বেরিয়ে এসে তাকে ধ্বংস করবে বলে তার মনে হয়েছে। মেয়েটিকে রক্ষা করা দরকার।
